আদ্যোপান্ত - ব্যালন ডি’অর
একটি সোনালি বলের ৭০ বছরের গল্প

তিনি বিশ্বের সেরা ফুটবলার। কথাটা শুনতে যতটা সহজ, কাজটা কিন্তু আসলে ততটাই কঠিন। গোল গোনা যায়, ট্রফি গোনা যায়, অ্যাসিস্টের হিসাবও রাখা যায়। কিন্তু একজন খেলোয়াড়ের পুরো মৌসুমের প্রভাব কি সংখ্যায় ধরা যায়? আর ‘সেরা’ শব্দটির কি আদৌ কোনো নির্ভুল সংজ্ঞা আছে? সাত দশক ধরে ব্যালন ডি’অর সেই অসম্ভব প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজে চলেছে।
১৯৫৬ সালে যখন প্রথমবার সোনালি বল তুলে দেওয়া হয়েছিল ইংল্যান্ডের স্ট্যানলি ম্যাথিউসের হাতে, তখন কেউ হয়তো ভাবেননি একদিন এ পুরস্কার ঘিরে ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় আয়োজন হবে, চারদিকে মাতামাতি হবে। আজ ব্যালন ডি’অর শুধু একটি পুরস্কারের নাম নয়, এটি ফুটবল ইতিহাসের এক মাপকাঠিও বটে। কারও ক্যারিয়ারের মাহাত্ম্য বোঝাতে তার ট্রফি, গোল বা চ্যাম্পিয়নস লিগের পাশাপাশি বলা হয় তিনি কতবার ব্যালন ডি’অর জিতেছেন! কিন্তু এ পুরস্কারের শুরুটা ছিল একেবারেই অন্যরকম।
একটি প্রশ্ন থেকেই এর জন্ম
গল্পের শুরুটা ফ্রান্সে, ১৯৫০-এর দশকে। তখন ইউরোপীয় ফুটবল দ্রুত বদলে যাচ্ছিল। বিভিন্ন দেশের সেরা ক্লাবগুলোকে নিয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার ধারণা তৈরি হচ্ছিল। ফরাসি ফুটবল সাংবাদিক গাব্রিয়েল আনো ছিলেন সেই পরিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠ। আনো ও তার সহকর্মীদের উদ্যোগে ১৯৫৫ সালে শুরু হয় ইউরোপিয়ান কাপ, এখনকার চ্যাম্পিয়নস লিগ। দল নিয়ে প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলেও আরেকটি প্রশ্ন তখনো রয়ে যায়— ইউরোপের সেরা খেলোয়াড় কে? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই ‘ফ্রান্স ফুটবল’ ১৯৫৬ সালে চালু করে ব্যালন ডি’অর বা সোনালি বল।
প্রতীকী শুরু
প্রথম ব্যালন ডি’অর জেতেন ইংল্যান্ডের স্ট্যানলি ম্যাথিউস। এখানে ইতিহাসের একটি চমৎকার বৈপরীত্য আছে। আজকের ফুটবলে যেখানে তরুণ তারকারাই ব্যক্তিগত পুরস্কারের আলোচনায় থাকেন, ম্যাথিউস তখন ৪১ বছর বয়সী। কিন্তু সেই জয় শুধু বয়সের কারণে ঐতিহাসিক নয়।
স্ট্যানলি ম্যাথিউস ডানে
ম্যাথিউসের হাতে ব্যালন ডি’অর ওঠার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল একটি নতুন ঐতিহ্যের। এরপর আলফ্রেদো দি স্তেফানো, রেমন্ড কোপা, ইউসেবিও, ববি চার্লটন, জর্জ বেস্ট, ইয়োহান ক্রুইফ, ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার, মিশেল প্লাতিনি, মার্কো ফন বাস্তেন, রোনালদো, জিদান, ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো, লিওনেল মেসি... এক এক করে ফুটবল ইতিহাসের মহাতারকারা ঢুকে পড়েছেন এ তালিকায়। এই পুরস্কার সর্বোচ্চ ৮ বার জিতেছেন লিওনেল মেসি।
আজ সেই তালিকা আরও দীর্ঘ। ২০২৫ সালের সর্বশেষ বিজয়ী উসমান দেম্বেলে। কয়েক দিন পরেই জানা যাবে ২০২৬ সালের বিজয়ীর নাম। দিনে দিনে সময় গড়িয়েছে অনেক, এবার ৭০ বছর পূর্তি হচ্ছে ‘ফ্রান্স ফুটবল’-এর পুরস্কারটি। এ উপলক্ষে এবার ফ্রান্সের বাইরে ইংল্যান্ডে বসতে যাচ্ছে ব্যালন ডি’অর। সেটা ওই ইংরেজ ম্যাথিউসের কারণে।
সেই ব্যালন ডি’অর এই ব্যালন ডি’অর
এখানেই ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। আজ আমরা ব্যালন ডি’অরকে বলি বিশ্বের সেরা ফুটবলারের পুরস্কার। কিন্তু ১৯৫৬ সালে সেটি ছিল মূলত ‘ইউরোপীয় ফুটবলারের পুরস্কার’। অর্থাৎ সেই সময় বিশ্বের অন্য প্রান্তের কোনো অসাধারণ খেলোয়াড়ের পক্ষে ব্যালন ডি’অর জেতার সুযোগই ছিল না।
ফলে পেলে কিংবা ম্যারাডোনার মতো কিংবদন্তিরা তাদের সেরা সময়ে ব্যালন ডি’অরের মূল প্রতিযোগিতায় থাকতে পারেননি। পরে ‘ফ্রান্স ফুটবল’ তাদের ক্যারিয়ারের স্বীকৃতি হিসেবে দেয় সম্মানসূচক ব্যালন ডি’অর।
১৯৯৫: দরজা খুলল বিশ্বের জন্য
ব্যালন ডি’অরের ইতিহাসে ১৯৯৫ হলো বিপ্লবী বছর। তখন থেকে ইউরোপের ক্লাবে খেলা যেকোনো জাতীয়তার ফুটবলার পুরস্কারটির জন্য যোগ্য। আর সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতীক হয়ে ওঠেন একজন আফ্রিকান— জর্জ উইয়াহ। লাইবেরিয়ার এ ফরোয়ার্ড ১৯৯৫ সালে ব্যালন ডি’অর জিতে গড়েন ইতিহাস।
জর্জ উইয়াহ
এটা শুধু একজন খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত অর্জন নয়, ছিল পুরস্কারটির ভৌগোলিক সীমা ভাঙার মুহূর্ত। ব্যালন ডি’অর যেন ঘোষণা করল— সেরা ফুটবল প্রতিভার কোনো মহাদেশ নেই। এরপর ১৯৯৭ সালে ব্রাজিলের রোনালদোর জয় সেই পরিবর্তন করে আরও দৃঢ়।
২০০৭: সত্যিকার অর্থে বিশ্বজনীন
১৯৯৫ সালের পরিবর্তনের পরও ইউরোপের ক্লাবে খেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ছিল। ২০০৭ সালে সেই সীমাবদ্ধতাও উঠে যায়। এর ফলে বিশ্বের যেকোনো দেশের, যেকোনো ক্লাবে খেলা ফুটবলার ব্যালন ডি’অরের জন্য যোগ্য হয়ে ওঠেন।
অর্থাৎ, সাত দশকের ইতিহাসকে কয়েকটি শব্দে তুলে ধরলে ব্যাপারটা এমন দাঁড়ায়— ১৯৫৬: ইউরোপীয় খেলোয়াড়। ১৯৯৫: ইউরোপে খেলা যেকোনো জাতীয়তার খেলোয়াড়। ২০০৭: বিশ্বের যেকোনো খেলোয়াড়। এই বিবর্তন আসলে ফুটবলের বিশ্বায়নের গল্পও।
এরপর ফিফা অধ্যায়
২০১০ সালে ব্যালন ডি’অরের ইতিহাসে আরেকটি বড় পরিবর্তন। ‘ফ্রান্স ফুটবল’-এর ব্যালন ডি’অর ও ফিফা বর্ষসেরা খেলোয়াড় একীভূত হয়ে তৈরি হয় ‘ফিফা ব্যালন ডি’অর’। চলে ২০১০ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত। এরপর ২০১৬ সালে ‘ফ্রান্স ফুটবল’ ও ফিফা আবার আলাদা পথে হাঁটে।
ফিফা চালু করে ‘দ্য বেস্ট’ আর ব্যালন ডি’অর ফিরে যায় তার ‘ফ্রান্স ফুটবল’-এর কাঠামোয়। গ্রুপ আমরির মালিকানায় ‘ফ্রান্স ফুটবল’ ও লেকিপ ব্যালন ডি’অর ব্র্যান্ডের মালিক। ২০২৪ সাল থেকে উয়েফা অনুষ্ঠানটির সহ-আয়োজক হলেও ভোটিং ব্যবস্থা পরিচালিত হয় গ্রুপ আমরির তত্ত্বাবধানেই।
সর্বোচ্চ ৮বার জেতেন মেসি
কারা ঠিক করেন বিজয়ী
ফিফা সভাপতি কিংবা উয়েফা সভাপতি ঠিক করেন না বিজয়ী। ঠিক করেন না জাতীয় দলের কোচেরা। এমনকি ফুটবলাররাও সরাসরি ভোট দেন না। ব্যালন ডি’অরের মূল ভোটার হলেন আন্তর্জাতিক ফুটবল সাংবাদিকরা।
পুরুষদের ব্যালন ডি’অরের ক্ষেত্রে ফিফা র্যাংকিংয়ের শীর্ষ ১০০ দেশের একজন করে সাংবাদিক ভোট দেন। নারী ব্যালন ডি’অরের ক্ষেত্রে এ সংখ্যা ৫০ দেশের একজন করে সাংবাদিক।
এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ রয়েছে। সাংবাদিকরা বিশ্বের সব ফুটবলারকে নিয়ে নিজেদের পছন্দের তালিকা বানান না। প্রথমে ফরাসি পত্রিকা লেকিপের সাংবাদিকরা মিলে একটি মনোনয়ন তালিকা তৈরি করেন। সেখান থেকে চূড়ান্ত ৩০ জনের সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি হয়। তারপর ভোটাররা এই ৩০ জনের মধ্য থেকে নিজেদের সেরা ১০ জনকে বেছে নেন।
ব্যালন ডি’অরের ফলাফলে আসলে দুটি স্তরের বিচারকাজ করে। প্রথম ধাপ— কে ৩০ জনের তালিকায় ঢুকবেন; দ্বিতীয় ধাপ— সেই ৩০ জনের মধ্যে কে সবার ওপরে থাকবেন।
ব্যালন ডি’অরে ভোট হয় কীভাবে
ভোটিং হয় কয়েকটি ধাপে। প্রত্যেক সাংবাদিক ৩০ জনের তালিকা থেকে নিজের পছন্দের ১০ জন ফুটবলারকে বেছে নেন। তবে শুধু ১০ জনের নাম দিলেই হয় না। সাংবাদিককে তাদের ১ থেকে ১০ নম্বর পর্যন্ত সাজাতে হয়। যাকে তিনি সবচেয়ে যোগ্য মনে করবেন, তাকে রাখবেন ১ নম্বরে। দ্বিতীয় পছন্দকে ২ নম্বরে... এভাবে দশম পছন্দকে রাখবেন ১০ নম্বরে।
এরপর শুরু হবে পয়েন্টের হিসাব। ১ নম্বরে থাকা খেলোয়াড় পাবেন ১৫ পয়েন্ট। ২ নম্বরে থাকা খেলোয়াড় পাবেন ১২ পয়েন্ট। ৩ নম্বরে ১০ পয়েন্ট। ৪ নম্বরে ৮ পয়েন্ট। ৫ নম্বরে ৭ পয়েন্ট। ৬ নম্বরে ৫ পয়েন্ট। ৭ নম্বরে ৪ পয়েন্ট। ৮ নম্বরে ৩ পয়েন্ট। ৯ নম্বরে ২ পয়েন্ট। ১০ নম্বরে ১ পয়েন্ট।
অর্থাৎ, একজন সাংবাদিকের ভোটে কোনো খেলোয়াড় যত ওপরে থাকবেন, তিনি তত বেশি পয়েন্ট পাবেন।
ব্যালন ডি’অর জিততে হলে কোনো খেলোয়াড়কে সবার ভোটে ১ নম্বরে থাকতে হবে— এমন কোনো নিয়ম নেই। বরং ১০০ জন সাংবাদিকের ভোট থেকে সব মিলিয়ে সবচেয়ে বেশি পয়েন্ট পেলেই তিনি বিজয়ী।
পয়েন্ট সমান হলে কী হবে
ধরা যাক, দুই খেলোয়াড়ের মোট পয়েন্টই সমান। তখন দেখা হবে, কে বেশি সংখ্যক সাংবাদিকের ভোটে ১ নম্বরে ছিলেন। সেখানেও সমতা থাকলে দেখা হবে কে বেশিবার ২ নম্বরে ছিলেন। তারপর ৩ নম্বর, ৪ নম্বর— এভাবে প্রয়োজন অনুযায়ী পরের অবস্থানগুলোর ভোটও দেখা হবে।
সাংবাদিকরা কী দেখে ভোট দেন
শুধু গোল বা অ্যাসিস্ট দেখে ভোট দেন না নির্বাচিত সাংবাদিকরা। ভোট দেওয়ার সময় মূলত তিনটি বিষয় বিবেচনা করা হয়—
১. ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স: খেলোয়াড় কতটা ভালো খেলেছেন এবং দলের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন।
২. দলীয় সাফল্য: তার দল কী কী জিতেছে এবং সেই সাফল্যে তার অবদান কতটা ছিল।
৩. খেলোয়াড়ের সামগ্রিক মান ও ফেয়ার প্লে: তার ফুটবলীয় শ্রেষ্ঠত্ব, আচরণ ও ক্রীড়াসুলভ মানসিকতা।
রোনালদো জিতেছেন ৫বার
বছর নয়, মৌসুম
ব্যালন ডি’অরের পুরনো যুগে ক্যালেন্ডার বছরকে মূল্যায়ন করা হতো। কিন্তু ২০২২ থেকে বড় পরিবর্তন আসে। মূল্যায়নের সময়কাল এখন পূর্ণ ফুটবল মৌসুম। অর্থাৎ, আগস্ট থেকে পরের আগস্ট পর্যন্ত সময়কে কেন্দ্র করে পারফরম্যান্স বিচার করা হয়; সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতাও এর মধ্যে পড়ে।
বিতর্কও হাত ধরে হাঁটছে
মর্যাদার বিপরীতে বিতর্কও সঙ্গী হয়েছে। যখন মেসি জেতেন, প্রশ্ন উঠত— রোনালদো কি বেশি প্রাপ্য ছিলেন? যখন রোনালদো জেতেন, প্রশ্ন উঠত— অন্য কেউ কি আরও ভালো মৌসুম কাটাননি? যখন একজন মিডফিল্ডার জেতেন, প্রশ্ন ওঠে— গোলের হিসাব কোথায়? এ বিতর্কের কোনো শেষ নেই। কারণ ব্যালন ডি’অর মূলত ফুটবলের সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটির উত্তর দিতে চায়— ‘সেরা’ বলতে আসলে কী বোঝায়?
সোনালি বলের আসল মূল্য
ব্যালন ডি’অরের ইতিহাস আসলে একটি পুরস্কারের ইতিহাসের চেয়ে অনেক বড়। এটি ইউরোপীয় ফুটবলের বিশ্বায়নের ইতিহাস। এটি সাংবাদিকতার প্রভাবের ইতিহাস। এটি ফুটবলে ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বকে সংজ্ঞায়িত করার দীর্ঘ চেষ্টা।
কিন্তু সাত দশক পরও মূল প্রশ্নটি বদলায়নি। কে সবচেয়ে বেশি গোল করেছে, সেটি বের করা সহজ। কে সবচেয়ে বেশি ট্রফি জিতেছে, সেটিও জানা যায়। কিন্তু কে সত্যিই সবচেয়ে ভালো ছিল— এ প্রশ্নের উত্তরই ব্যালন ডি’অর খোঁজে। আর সেই উত্তর কখনো পুরোপুরি সংখ্যায় পাওয়া যায় না।
সেখানেই ব্যালন ডি’অরের সৌন্দর্য। সেখানেই তার বিতর্ক এবং সম্ভবত সেখানেই সাত দশক পরও এই সোনালি বলের এত মূল্য।









