ক্রীড়াঙ্গনে তিনি ছিলেন নির্ভরতার প্রতীক

আফজালুর রহমান সিনহা
কিছু মানুষকে একটি শব্দে বাঁধা যায় না। তারা যেন বিশাল বটবৃক্ষ, যার ছায়ায় আশ্রয় পায় মানুষ, যার শিকড়ে থাকে মূল্যবোধ আর ডালপালায় ফুটে থাকে কর্মের অসংখ্য ফুল। আফজালুর রহমান সিনহা সেরকমই এক বিরল ব্যক্তিত্ব।
এই প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী নিজেকে ব্যবসার সীমানায় আটকে রাখেননি। ক্রীড়াঙ্গনে তিনি ছিলেন একজন দুর্দান্ত সংগঠক, অসংখ্য মানুষের কাছে নির্ভরতার প্রতীক। তার পরোপকার ছিল নিঃশব্দ নদীর মতো— প্রচারবিমুখ অথচ অবিরাম।
তার কীর্তির প্রচারক ক্রীড়াঙ্গনের মানুষগুলো। বাংলাদেশ ক্রিকেটের সাবেক তারকা মিনহাজুল আবেদীন নান্নুর চোখে অাফজালুর রহমান সিনহা সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা মানুষ, ‘বছরের নির্দিষ্ট সময় হাতেগোনা কিছু দল নিয়ে হতো করপোরেট ক্রিকেট। সেখানে আমি একমির দলে খেলতাম। আকরাম-দুর্জয়সহ সেটা প্রায় জাতীয় দল ছিল। তবে অমন সিরিয়াস ক্রিকেটও খেলতাম না, কিন্তু এ অাসরের জন্যই কায়সার চাচা ১৫ ক্রিকেটারকে সারা বছর বেতন দিতেন একমি থেকে। মাস শেষে একদিনই একমিতে যেতাম স্বাক্ষর করে বেতন নেওয়ার জন্য। তাই বলি, আমার কাছে উনি সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা একজন সংগঠক।’ নান্নুর মতো অনেক ক্রিকেটারের কাছে তিনি কায়সার চাচা, যিনি বিশেষ করে ক্রিকেটার ও হকি খেলোয়াড়দের কাছে খুব কাছের মানুষ ছিলেন।
ক্রীড়াঙ্গনে আফজালুর রহমান সিনহার উপস্থিতি ছিল এক নীরব স্থপতির মতো। আবাহনীর হকির জৌলুশ তার হাত ধরেই। তার দূরদৃষ্টি, নিষ্ঠা ও অকুণ্ঠ ভালোবাসায় ঐতিহ্যবাহী দলটি বারবার তারাখচিত হয়ে উঠেছে, যারা শুধু ট্রফিই জেতেনি, ক্রীড়াপ্রেমীদের হৃদয়ও জিতেছে। ক্রিকেটে সূর্যতরুণ ক্লাব তার পৃষ্ঠপোষকতায় পেয়েছিল এগিয়ে চলার শক্তি। আজাদ বয়েজসহ অনেক ক্লাব পেয়েছে তার উষ্ণ স্পর্শ। তিনি ছিলেন আসলে ক্রীড়ার অভিভাবক। কোনো ক্লাব অর্থসংকটে পড়ে দিশাহারা হলে, তার দরজায় কড়া নাড়াই ছিল শেষ ভরসা। তার উদারতা ছিল বর্ষার মেঘের মতো— যেখানে প্রয়োজন, সেখানেই নিঃস্বার্থভাবে ঝরে পড়েছে। তাই তিনি শুধু দলের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন না; ছিলেন অসংখ্য ক্রীড়াবিদের স্বপ্নের নেপথ্য কারিগর, ক্রীড়াঙ্গনের এক নীরব মহীরুহ।
আসলেই নীরব। কারও দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার কথা দ্বিতীয়জনকে বলেছেন, এমন নজিরও নেই। তার উপস্থিতি কখনো উচ্চকণ্ঠে নয়, বরং নীরব কর্মে অনুভূত হতো। প্রচারের আলো থেকে দূরে থেকেও মানুষ অসাধারণ নিষ্ঠা আর দক্ষতায় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের বড় বড় দায়িত্ব সামলেছেন। বোর্ডের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন হয়েছে তার সহায়তায়, যেখানে ব্যক্তিগত লাভের কোনো হিসাব ছিল না— ছিল শুধু দায়িত্ববোধ আর ক্রিকেটের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা।
আজকের দিনে বিপিএল অর্থাৎ বিসিবির টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট ঘিরে অনিয়ম, আর্থিক অসংগতি কিংবা দুর্নীতির অভিযোগ প্রায়ই সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয়। কিন্তু আফজালুর রহমান সিনহা যখন বিপিএল গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান ছিলেন, তখন পুরো আয়োজন পরিচালিত হয়েছে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সুশাসনের ভিত্তিতে। এটাই ছিল তার সংগঠক জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয়। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত শক্তি তার জৌলুশে নয়, তার সততায়। তাই ক্ষমতার চেয়ারকে তিনি কখনো ব্যক্তিস্বার্থের হাতিয়ার বানাননি; বরং দায়িত্বকে দেখেছেন আমানত হিসেবে।
কিছু অর্জন ট্রফিতে মাপা যায়, কিছু অর্জন ইতিহাসে লেখা থাকে। আর কিছু অর্জন মানুষের অটুট বিশ্বাসে বেঁচে থাকে। বিপিএলে তার নির্ভেজাল সততার উত্তরাধিকার সেই বিরল অর্জনগুলোরই একটি।
তার সম্পর্কে আরেকটি ব্যাপার বিস্ময় জাগানিয়া। এমন একজন মানুষকে খুঁজে পাওয়া কঠিন, যিনি তাকে অপছন্দ করতেন, কিংবা তার আচরণে কখনো আহত হয়েছেন। মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়া সহজ, কিন্তু সবার শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা অর্জন করা শুধু মহৎ চরিত্রের পক্ষেই সম্ভব।
আজ এই প্রজ্ঞাবান ব্যবসায়ী, ক্রীড়াপ্রেমী, মানবিক মানুষ আফজালুর রহমান সিনহার চলে যাওয়ার অষ্টম বার্ষিকী। সময়ের ক্যালেন্ডারে আটটি বছর পেরিয়ে গেছে কিন্তু কিছু মানুষ সময়ের পাতায় নয়, মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকেন। তিনি
তাদেরই একজন।




