মেসির রাজকীয় বিদায়ের পাশে রোনালদোর হাস্যকর কান্ড কীর্তি

লিওনেল মেসি বিদায় নিয়েছেন রাজার মতো। তিনি ছিলেন সবার প্রিয়, তাই সৈন্য-সামন্তরা চোখের জলে বিদায় দিয়েছেন আর্জেন্টাইন মহাতারকাকে। আরেকজনের আচরণ অত্যাচারি রাজার মতো; যাওয়ার সময় হয়ে গেলেও তিনি বুঝতে চান না। কোচের সঙ্গে ঝগড়া বিবাদ করে অনেকের চক্ষুশূল হয়েও দলে থাকতে চাইছেন ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো।
অথচ এই দুজন আধুনিক ফুটবলের দুই পরাক্রমশালী চরিত্র। দুই দশক ধরে তারা দাপিয়েছেন ফুটবল মাঠে, বিশ্ব ফুটবলকে আরো আকর্ষনীয় ও বিনোদনের মঞ্চে রূপ দিয়েছেন। প্রত্যেকেই নিজের মতো করে চড়েছেন রেকর্ডের শৃঙ্গে। কিন্তু বিদায়ের বাঁশি বাজার যখন সময় হলো, তখন দুই ফুটবল রাজার পথ গেছে বেঁকে। একজন সময়ের দাবি মেনে রাজদন্ড তুলে দিয়েছেন তরুণদের হাতে, আরেকজন ক্লান্ত শরীরে করছেন নিঃসঙ্গ লড়াই।
লিওনেল মেসির রাজকীয় বিদায়
মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে এক ফুটবল মহাকাব্যের কী রাজকীয় সমাপ্তিই না ঘটেছে। বেনিনের বিপক্ষে দুই অ্যাসিস্টের সঙ্গে এক গোল; নিজেকে এখনও আর্জেন্টিনা দলে ভীষণ প্রাসঙ্গিক রেখেই মেসি আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টেনে দিয়েছেন। তিনি জানেন, যশ থাকতেই মঞ্চ ছাড়তে হয়। এরপর মাইক হাতে নিয়ে আর্জেন্টাইন জাদুকর নানান স্মৃতি-কথা ও আবেগী বক্তব্যে ভাসিয়ে দিয়েছেন পুরো স্টেডিয়াম। আলোড়ন তুলেছেন বিশ্বের কোটি হৃদয়ে। পর্তুগীজ ফুটবল রাজার বিদায়ও তো এমন ভালোবাসার স্মারক হতে পারতো; তার ভক্ত সংখ্যাও নেহাত কম নয়। তাকে দেখে অনেক তরুণ মন দিয়েছিল ফুটবলে। সেই মনগুলোকেও এখন রোনালদো বিষিয়ে দিচ্ছেন নানা কান্ড-কীর্তি করে! এক হাজার গোলের মোহে নিজের রাজসিক উপস্থিতির বদলে মাঠে যাবতীয় অনর্থ করে বেড়াচ্ছেন।
৪১ বছর বয়সে রোনালদোর পায়ে-মাথায় নেই পুরনো ম্যাজিক। নেই সেই যৌবনের গতি। যতই নিয়ম মেনে চলুন আর ফিট থাকুন একটা সময় নিজেকে সমর্পন করতে হবে বয়সের কাছে। সেটা মানতে চাননি বলে গত বিশ্বকাপে সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন পাঁচবারের ব্যলন ডি’অর জয়ী। তিনি দলের জন্য বোঝা হয়ে উঠেছেন কিনা, এ নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। এরপরও খেলে গেছেন পর্তুগালের সাবেক কোচ রবার্তো মার্তিনেজের সৌজন্যে। নেশনস লিগে তাদের নতুন কোচ জোর্জে জেসুস এসে সেই সৌজন্যতা ভেঙে দিলেই বিপত্তি ঘটে। নরওয়ের বিপক্ষে পুরো সময় বঞ্চে বসিয়ে রাখেন আল নাসরের স্ট্রাইকারকে। পরের ম্যাচে ডেনর্মাকের সঙ্গেও থাকতে হবে একাদশের বাইরে-এমন খবর শুনেই রোনালদো ক্যাম্প ছেড়ে চলে যান। এরপর বাধে লঙ্কাকান্ড।
রোনালদো লড়ছেন নিজের সঙ্গে
ইনস্টাগ্রামে রোনালদো প্রায় দুই হাজার শব্দের এক বিবৃতিতে কাঠগড়ায় তুলেছেন কোচ জোর্জে জেসুসকে। লিখেছেন কোচ দুই বার তাকে কথা দিয়ে কথা রাখেননি। নরওয়ের বিপক্ষে তাকে মাঠে নামানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েও কোচ খেলাননি আর এটাই সি-আর সেভেনের চোখে ‘বিশ্বাসভঙ্গের অপরাধ’। এজন্য কোচকে ‘মিথ্যাবাদী’ ডেকেছেন কয়েকবার। এমন বিবৃতির পর কোচ জেসুস আবার রোনালদোর জন্য জাতীয় দলের দুয়ারও খুলে রাখার ঘোষণা দিয়েছেন। আসল ব্যাপারটা হলো, জেসুসের পর্তুগালের কোচ হওয়ার পেছনে সুপারিশ ছিল রোনালদোর। তার কথায় যখন কোচের চাকরি হয়েছে, তখন কোচের কাছেও প্রতিদান চাইতে পারেন। দলে নিজের জায়গাটা পাকা ভাবতে পারেন রোনালদো। এভাবেই তৈরি হয়েছিল দ্বিপাক্ষিক আস্থার জায়গা।
নরওয়ে ম্যাচে বদলি হিসেবে মাঠে না নামানোয় কোচের প্রতি সেই আস্থা টুঁটে গেছে রোনালদোর। ম্যাচটা আসলে কঠিনই ছিল, প্রথমে পিছিয়ে পড়া পর্তুগালকে ২-১ গোলে জিতিয়েছেন গনসালো রামোস জোড়া গোল করে। মাত্র এক গোলের লিড থাকায় রামোসকে বসিয়ে রোনালদোকে নামানোর সাহস করতে পারেননি জেসুস। ম্যাচের এমন পরিস্থিতিতে কোনো কোচই হয়তো পারতেন না।
রাজা একসময় অনেক কিছু জয় করেছেন কিন্তু সময়ের নিয়মে তার হাতের তরবারিতে পুরনো ধার নেই, এটিই মানতে নারাজ রোনালদো। কোচ এ পরিস্থিতিতে তার এক ফুটবলারের ঝলমলে অতীত আঁকড়ে থাকলে দলের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ পড়বে ঝুঁকির মুখে। আবার বাস্তবতাকে প্রাধান্য দিতে গেলে ফুটবল রাজের অহমেও লাগে। মহা বিপদেই পড়েছেন জেসুস। সম্প্রতি পর্তুগালে এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ১৫ শতাংশ পর্তুগিজ রোনালদোর পক্ষে। বাকিরা তার অবদানের জন্য কৃতজ্ঞ তবে রোনালদো নামের মধ্য গগনের সূর্যটি যে পশ্চিমে হেলে পড়েছে, সেটা তারা বুঝতে পারছেন। পর্তুগিজ ফুটবল সাংবাদিক দেলগাদো বিবিসি রেডিও ৫ লাইভকে বলেছেন, ‘পর্তুগিজ ফুটবলের জন্য রোনালদো যা করেছেন তা অনন্য ও অবিশ্বাস্য। জাতীয় দলে অবদানের জন্য অবশ্যই ধন্যবাদ জানানো উচিত। কিন্তু ৪১ বছর বয়সে তার পুর্তুগালের সেরা একাদশে জায়গা হতে পারে না।’
রোনালদো ও কোচ জোর্জে জেসুস এখন মুখোমুখি
তবে পর্তুগাল জাতীয় দলে আল-নাসর ফরোয়র্ডের অনেক অবদান। তার আছে ২৩৪ ম্যাচে ১৪৬ গোলের রেকর্ড; সঙ্গে ২০১৬ ইউরো জয় ও দুটি নেশনস লিগ শিরোপা জয়। বিশ্বকাপের আক্ষেপাটা হয়তো তাকে ভীষণ পোড়ায়। নিজের সোনালী যৌবনে পর্তুগালের জা্র্সিতে তিনি ছিলেন এক শুকতারা; সঙ্গে ছিল না পুরো ফুটবল আকাশ আলো করার মতো সারথী। তাই বিশ্বজয়ের সোনালী ট্রফিটা পর্তুগীজ রাজার অধরাই থেকে গেছে।
রোনালদোর লক্ষ্য এখন একটাই, এক হাজার গোলের মাইলস্টোনে গিয়ে থামা। বর্তমানে তার গোলসংখ্যা ৯৭৯টি। লাগবে আরো ২১টি, রিয়ালের ২৪ বছর বয়সী সিআর-সেভেন হলে হয়তো তুড়ি মেরে পৌঁছে যেতেন লক্ষ্যে। কিন্তু বয়স যখন ৪১ তখন এই ২১ গোলের পথটুকুও মহাসমুদ্র পাড়ি দেওয়ার মতো কঠিন। এক হাজার গোলের অমরাবতীর পেছনে ছুটে নানা বিতর্কে জড়িয়ে পর্তুগীজ কিংবদন্তী নিজেকে আরো হাস্যকর করে তুলছেন না তো!






