এখনও আসল ব্রাজিলের অপেক্ষায় বিশ্বকাপ

ছবি: রয়টার্স
ফিলাডেলফিয়া স্টেডিয়াম জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল ব্রাজিলের সোনালি অতীতের নানা স্মৃতি। ব্রাজিলের সর্বশেষ ২০০২ বিশ্বকাপজয়ী দলের রোনালদো, কাকা, রোনালদিনহোরা ছিলেন গ্যালারিতে। হাইতির বিপক্ষে ৩-০ গোলের জয়ের ম্যাচটা বিশ্বকাপের রেপ্লিকা ট্রফি উঁচিয়ে মাতিয়ে রেখেছিলেন দর্শকরা।
বিরতির আগেই মাথেউস কুনিয়ার জোড়া গোল আর ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের লক্ষ্যভেদে ৩-০’তে এগিয়ে যায় ব্রাজিল। ম্যাচজুড়ে তিন গোল, দারুণ ফিনিশিং, প্রথম জয়, গোল না খাওয়া, গ্যালারিতে দর্শক উন্মাদনা- সবই ছিল দেখার মতো। তবে বাস্তবতা হচ্ছে ব্রাজিল খেলছিল ফিফা র্যাংকিংয়ে তাদের চেয়ে ৮০ ধাপ পিছিয়ে থাকা হাইতির বিপক্ষে। ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে সেলেসাওরা এতটাই ধীর ছিল যে, পুরো ৪৫ মিনিটে তারা প্রতিপক্ষের গোলপোস্টে একটি শটও লক্ষ্যে নিতে পারেনি (এনদ্রিক বল জালে জড়ালেও সেটা অফসাইড ছিল)। উল্টো এই বিশ্বকাপ থেকে প্রথম দল হিসেবে বিদায় নেওয়া হাইতি দ্বিতীয়ার্ধে ব্রাজিলের পোস্টে সাতটি শট নিয়েছিল।
বিশ্বকাপে যেখানে আর্জেন্টিনা ও ফ্রান্স রাজার দাপটে খেলছে সেখানে ব্রাজিল নিজেদের চেনা ছন্দ খুঁজে পেতে লড়ছে। ফিলাডেলফিয়াতে দারুণ শুরুর পরও ম্যাচ গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তাদের ধার কমে গেছে। প্রথমার্ধের শুরুতে পাকেতা ও কাসেমিরোর সমন্বয়ের ঘাটতি ছিল দৃষ্টিকটু। বল হারানোর পর সেটা ফিরে পাওয়ার জোরালো চেষ্টাও চোখে পড়েনি।
মনে রাখতে হবে ব্রাজিলের প্রতিপক্ষ হাইতি গ্যাং সহিংসতায় জর্জরিত হওয়ায় গত প্রায় পাঁচ বছর নিজেদের দেশের মাটিতে কোনো ম্যাচই খেলতে পারেনি। বিশ্বকাপ বাছাইয়ের ম্যাচগুলোও তাদের খেলতে হয়েছে অন্য কোথাও। ব্রাজিলের মত দলের বিপক্ষে তাদের অদম্য ফুটবল হৃদয় কেড়েছে অনেকের।
তাহলে কেন আমরা এখনও সেই চিরচেনা আসল ব্রাজিলের দেখা পাচ্ছি না? কোচ আনচেলত্তি সেটা মেনে নিয়ে বলেছেন,‘প্রথমার্ধে আমরা অনেক ভালো খেলেছি। দ্বিতীয়ার্ধে তাদের নিয়ন্ত্রণ কিছুটা বেশি ছিল, তবে আমাদের আরও গোল করার সুযোগ ছিল। সব মিলিয়ে এটি একটি ভালো ম্যাচ ছিল। পরের ম্যাচে আমরা স্কটল্যান্ডকে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে দেওয়ার কথা ভাবছি না। আমরা ভালো খেলা এবং নিজেদের উন্নতি নিয়ে ভাবছি। কারণ গ্রুপ পর্বে শীর্ষে থাকলে সেটা ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে।’
আক্রমণে গতি
ইগোর থিয়াগোর জায়গায় মাথেউস কুনিয়া খেলায় গতি বেড়েছিল ব্রাজিলের আক্রমণের। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের এই ফরোয়ার্ডের সঙ্গে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ও প্রথমার্ধে চোট পেয়ে মাঠ ছাড়া রাফিনিয়ার রসায়ন ছিল অসাধারণ। এই আক্রমণভাগ হয়ত রোনালদো, রিভালদো বা রোনালদিনহোর মতো নয়, তবে প্রতিপক্ষের মনে সমীহ জাগানোর জন্য যথেষ্ট। রাফিনিয়া উঠে যাওয়ার পর অবশ্য গতি কমে যায় আক্রমণের। তাতে দায় আছে কোচ আনচেলত্তিরও। কারণ ম্যাচ জয় নিশ্চিত হয়ে যাওয়ায় তখন অতিরিক্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষাও করছিলেন তিনি।
ব্রাজিলের কি ফিট নেইমারকে প্রয়োজন?
ব্রাজিলের ফরোয়ার্ড লাইনের জন্য ম্যাচটা দারুণ ছিল। দলে আক্রমণভাগে প্রতিভার ছড়াছড়ি থাকলেও, তাদের স্কোয়াডে নেইমারের সেরা সময়ের মতো জাদুকরী কোনো খেলোয়াড় নেই। নেইমার হয়ত আর কখনোই আগের সেই ফর্মে ফিরতে পারবেন না, তবে আনচেলত্তি যদি তার সেরা ফুটবলটা বের করে নিতে পারেন, তখনই ব্রাজিলের পক্ষে ষষ্ঠবারের মতো বিশ্বকাপ জেতা সম্ভব। এজন্য আনচেলত্তি চান স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বে শেষ ম্যাচটিতে নেইমারকে খেলিয়ে নকআউটের জন্য পুরোপুরি তৈরি করতে।
ইংল্যান্ডের ডেইলি মেইলের এক প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, ‘গত দুটি বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল থেকেই বিদায় নিয়েছিল ব্রাজিল, আর এবারও তাদের পারফরম্যান্স দেখে মনে হচ্ছে সেটিই হয়ত তাদের দৌড়ের শেষ সীমানা। হতে পারে ওই পর্বে তারা ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হবে। যদি তাই হয় তাহলে ইংল্যান্ডের ইতিহাসে এই প্রথম তারা পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে খেলতে নামার আগে বিন্দুমাত্র ভয় পাবে না।’
দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন ভিনি
ব্রাজিলিয়ান ভক্তদের এখনই ভেঙে পড়ার মত কিছু হয়নি। বরং রিয়ালের ফর্ম ভিনিসিয়ুস ব্রাজিলে টেনে আনায় আশাবাদী হতেই পারেন তারা। মরক্কোর পর ফিলাডেলফিয়াতেও তিনি আরেকটি রাজকীয় পারফরম্যান্স উপহার দিলেন। কুনিয়াকে অ্যাসিস্টের পাশাপাশি নিজেও করলেন এক গোল। হয়েছেন ম্যাচ সেরা।
হাইতির বিপক্ষে ম্যাচটি কেবল তার গোল বা অ্যাসিস্টের ছিল না, বরং বল ছাড়া মাঠে তার কঠোর পরিশ্রমও ছিল চোখে পড়ার মতো। বাম প্রান্তে দগলাস সান্তোসকে সাহায্য করার জন্য প্রায়ই রক্ষণভাগে নেমে এসেছিলেন ভিনি।
আনচেলত্তির ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের কাছ থেকে ঠিক এটাই দরকার। ভিনি নিজেও জানেন যে, পুরো স্কোয়াডের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ছড়িয়ে দিতে এই বিশ্বকাপে তাকেই দলের মূল অনুপ্রেরণা হতে হবে। আর ঠিক সেটাই তিনি করে দেখিয়েছেন।
পাকেতার অলরাউন্ড পারফরম্যান্স
ফ্ল্যামেঙ্গোর পাকেতা হাইতির বিপক্ষে ছিলেন এককথায় অসাধারণ, বিশেষ করে বিরতির আগে। তিনি মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ করছিলেন এবং সুযোগ পেলেই হাইতির গোলপোস্টে আক্রমণ তৈরি করছিলেন। ম্যাচের সবচেয়ে আকর্ষণীয় মুহূর্ত ছিল ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের গোলের জন্য তার অসাধারণ পাসটা। তাদের এই দারুণ রসায়নের সূত্রপাত ফ্ল্যামেঙ্গো অ্যাকাডেমির বন্ধুত্ব। অতীতে ভিনিসিয়ুস, পাকেতাকে ফুটবলে তার সেরা বন্ধু বলেছিলেন। মাঠে বলের ওপর তাদের এই পারস্পরিক বোঝাপড়া দেখলেই বোঝা যায় কেন তারা সেরা বন্ধু।
পাকেতা এই ছন্দ ধরে রাখতে পারলে আর ভিনি জ্বলে উঠলে এবারের বিশ্বকাপেই সম্ভব আসল ব্রাজিলের দেখা পাওয়ার।




