শেষের কবিতা নয়, এ আসলে অমরকাব্য
যে মেসি প্রতিদিন লেখেন নতুন রূপকথা
- তৃতীয় বিশ্বকাপ গোল্ডেন বল প্রায় নিশ্চিত
- গোল্ডেন বুটের দৌড়েও সবার ওপরে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
একবার ভাবুন, লিওনেল মেসি অবসর ভেঙে না ফিরলে কী হতো?
২০১৬ সালে কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির কাছে হেরে অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন আর্জেন্টাইন তারকা। আরেকবার ২০১৮ বিশ্বকাপে ভরাডুবির পর তিনি অভিমানে বিরতি নিয়েছিলেন জাতীয় দল থেকে। অবসর বা অভিমান ভেঙে যদি তিনি না ফিরতেন? নক্ষত্র যদি এক আকাশ আঁধার দেখে ঝরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিত, পৃথিবী হয়তো কোনোদিনই টের পেত না আলোর আনন্দ। তেমনি মেসি না ফিরলেও অজানা থাকত ছোট মানুষটির পায়ে এত মাধুর্য লুকিয়েছিল বিশ্বকাপের জন্য। ফুটবল ঈশ্বরও আফসোস করতেন এক বুক হাহাকার নিয়ে।
তিনি ফিরেছেন এবং কাতার বিশ্বকাপ থেকেই দেখিয়ে যাচ্ছেন ফুটবল জাদু। কাতার জয় করে এবার যুক্তরাষ্ট্রে ৩৯-এ পা রেখেও জাদুকর প্রতিটি ম্যাচে রচনা করছেন ফুটবল আনন্দের অমর সিম্ফনি। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম মুখোমুখিতে হয়তো ডিয়েগো ম্যারাডোনার মতো সাড়া ফেলেননি। কিন্তু যা করেছেন, তা কি কম বিস্ময়কর! গোলের নায়ক না হয়েও জয়ের মূল স্থপতি হয়েছেন লিওনেল মেসি। পিছিয়ে পড়া দলের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে দুটি নিখুঁত অ্যাসিস্টে ইংল্যান্ডের স্বপ্ন ভেঙে আর্জেন্টিনাকে পৌঁছে দিয়েছেন টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ ফাইনালে। ম্যারাডোনা ইতিহাসটা লিখেছিলেন ‘হাতে-পায়ে’। আর মেসি তার মাথা ও সৃজনশীলতায় লিখলেন মহাকাব্যের নতুন এক অধ্যায়, যেখানে গোলের চেয়েও বড় হয়ে ধরা দিয়েছে গোল বানিয়ে দেওয়ার শিল্প।
প্রথমার্ধে তিনি ছিলেন কড়া মার্কিংয়ে। একদম নজরবন্দি। কিন্তু ৫৫ মিনিটে গোল খাওয়ার পর আর্জেন্টাইন অধিনায়ক আর আটকে থাকেননি। টমাস টুখেল যখন একের পর এক ডিফেন্ডার নামিয়ে নিজের দলকে রক্ষণে গুটিয়ে নিচ্ছেন, তখনই মেসি সরে গেলেন ডান প্রান্তে। আর সেখানেই বদলে গেল ম্যাচের গল্প। ম্যাচ শেষে আর্জেন্টিনার গোলকিপার এমিলিয়ানো মার্তিনেস বলেছেন, ‘মেসিকে উইংয়ে নিয়ে যাওয়াটাই ছিল আমাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত।’
যে মানুষটা একসময় নিজের পায়ের জাদুতে একাই ম্যাচের ভাগ্য লিখতেন, সময়ের সঙ্গে তিনিই হয়ে গেলেন সেরা নির্মাতা। উইঙ্গারের ভূমিকায় নেমে যেন নতুন করে আবিষ্কার করেছেন নিজেকে। মেসির আত্মজীবনীর লেখক গিয়েম বালাগে বলেছেন, কৌশল ও সময়ের প্রয়োজনে মেসি অন্তত পাঁচবার বদলেছেন নিজেকে। সেমিফাইনালে ৯টি ক্রস ফেলেছেন তিনি ইংল্যান্ডের বক্সে। প্রতিটি যেন ধনুক হয়ে ছুটে যাওয়া তীর। গোলকিপার জর্ডান পিকফোর্ড কয়েকটি সেভ করেও শেষ রক্ষা করতে পারেননি। ইনজুরি টাইমে তার মাপা ক্রসে লাউতারো মার্তিনেসের লক্ষ্যভেদী হেডে মেসির আর্জেন্টিনা পৌঁছে যায় ফাইনালে।
শেষ ১৫ মিনিট ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে তুলে নিয়েছিলেন জাদুকর। সেটি হওয়ারই ছিল। আর্জেন্টিনার পিঠ যখন দেয়ালে ঠেকে যায়, সতীর্থরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে একজন মানুষকেই খুঁজে বেড়ায়। তিনিই এই দলের বাতিঘর। বল তার পায়ে পৌঁছালেই যেন জট খুলে যায়, অসম্ভবের ভেতরও উঁকি মারে সম্ভাবনা। কখনো ড্রিবলে, কখনো নিখুঁত পাসে কখনোবা মাপা ক্রসে বের করে আনেন। তাই ইংল্যান্ড অধিনায়ক হ্যারি কেইনও স্বীকার করে নিচ্ছেন, ‘ম্যাচের বড় একটা সময় আমরা তাকে ভালোভাবেই সামলেছি। কিন্তু বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক খেলোয়াড়দের মতোই বল পেলে সে কিছু না কিছু তৈরি করতে পারে। এ কারণেই সে সর্বকালের সেরাদের একজন।’
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে গোলের খাতায় নাম না থাকলেও ম্যাচ শেষে সব আলোচনাই মেসিকেন্দ্রিক। তিনি যেন ঝড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা এক বাতিঘর— নিজে আলো ছড়িয়ে শুধু পথই দেখান না, নিরাপদ গন্তব্যেও পৌঁছে দেন সবাইকে। তিনি ম্যারাডোনা নন, হওয়ার চেষ্টাও করেননি বোধহয়। ম্যারাডোনা ছিলেন বজ্রপাতের মতো বিস্ফোরক, মেসি নক্ষত্রের মতো অবিরাম আলো ছড়িয়ে যাওয়া এক মহাজাগতিক উপস্থিতি।




