ক্লোসাকে টপকালেন অস্ট্রিয়াকে হারালেন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
লিওনেল মেসির বয়স কি কমছে— প্রশ্নটা আসতে পারে ২০২৬ বিশ্বকাপে তার পারফরম্যান্সে। কাতার বিশ্বকাপের চেয়েও তিনি সতেজ, চনমনে, আরও ধারালো। হ্যাটট্রিক দিয়ে করেছেন শুরু, পরের ম্যাচে করলেন চোখ জুড়ানো দুই গোল। অস্ট্রিয়া ম্যাচকে মেসিময় বললে ভুল হবে না। পেনাল্টি মিস, সুযোগ নষ্টের হতাশায় যেমন বারবার পুড়ছেন, তেমনি পাখির মতো ডানা মেলে উড়েছেন গোল উদযাপনে।
ইন্টার মায়ামি সুপারস্টারই গড়ে দিয়েছেন ম্যাচের ব্যবধান। ডালাস স্টেডিয়ামে দুবার ফুটবল দুনিয়াকে মোহিত করলেন এ জাদুকর। তার জোড়ায় অস্ট্রিয়াকে ২-০ গোলে হারিয়ে এবারের বিশ্বকাপে টানা দ্বিতীয় জয় আর্জেন্টিনার। তাতে ‘জে’ গ্রুপের শীর্ষে থেকে নকআউট পর্বের শেষ ৩২ নিশ্চিত আলবিসেলেস্তেদের।
চার বছর আগে কাতারে বিশ্বকাপ জিতে ফুটবলকে পূর্ণতা দেওয়া মেসি থামছেন না। পূর্ণতার আনন্দে লিখে চলেছেন নতুন কাব্য। যার সর্বশেষ সংযোজন বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে বসা। মিরোস্লাভ ক্লোসার ১৬ গোলের রেকর্ড আগের ম্যাচেই ছুঁয়েছেন। অস্ট্রিয়ার জালে একবার বল জড়িয়ে জার্মান কিংবদন্তিকে সরিয়ে হয়ে যান বিশ্বকাপের ‘গোলের রাজা’। আর ইনজুরি টাইমে আরেকবার লক্ষ্যভেদ করে বিশ্বকাপে নিজের গোলসংখ্যা নিয়ে গেলেন ১৮-তে।
ইতালির কিংবদন্তি গোলকিপার জিয়ানলুইজি বুফন একবার মেসির সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতের বর্ণনা করেছিলেন এভাবে— ‘আমি লিওর কাছে গিয়ে ওকে ছুঁয়ে দেখলাম। আসলে বোঝার চেষ্টা করলাম ও মানুষ নাকি এলিয়েন। দেখলাম ও আমাদের মতোই।’
হ্যাঁ, মেসি মানুষ, তারও বয়স বাড়ছে। আগামীকালই ৩৯ বছর পূর্ণ করবেন তিনি। অথচ মাঠের ফুটবলে সেটির ছাপ এতটুকুও নেই। আক্রমণে গতি দিচ্ছেন, প্রয়োজন পড়লে নিচে নেমে সাহায্য করছেন রক্ষণে। অস্ট্রিয়ার খেলোয়াড়দের কড়া ট্যাকলেও ভারসাম্য হারাচ্ছেন না। ফিটনেসে অনন্য হয়ে আনন্দে উপভোগ করছেন প্রতিটি মুহূর্ত।
ডালাসের ম্যাচটি আর্জেন্টিনা ও অস্ট্রিয়ার। বলের পেছনে ছুটেছেন বাকি ২১ জনও। এরপরও ম্যাচটি মেসিময় হয়ে আছে, কারণ আর্জেন্টাইন অধিনায়কের এক-একটি মুভে লেখা হয়েছে প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির মুহূর্ত। ম্যাচের নবম মিনিটের কথাই ধরা যাক। অস্ট্রিয়ার বক্সে জোড়া ফাউলের শিকার হলেন লাউতারো মার্তিনেস। ভিএআরের সাহায্যে রেফারি বাজালেন পেনাল্টির বাঁশি। স্পট কিক থেকে গোলের সুবর্ণ সুযোগ। কিন্তু ১২ গজ দূর থেকে নেওয়া শটে ব্যর্থ হলেন সর্বকালের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়।
ওই হতাশা ১৯তম মিনিটেই কাটাতে পারতেন মেসি। লাউতারোর সঙ্গে বল দেওয়া-নেওয়া করে অস্ট্রিয়া গোলকিপার অ্যালেক্সান্ডার শ্লাগারকে একা পেয়েও হলেন ব্যর্থ। তার হতাশা আরও আষ্টেপৃষ্ঠে ধরে ঘড়ির কাঁটা আধা ঘণ্টা পেরোনোর পর, ডি-বক্সের সামনে থেকে নেওয়া শট ডেভিড আলাবা রুখে দিলে।
তাই বলে দমে যাবেন মেসি? ফুটবল ইতিহাসে অনন্য উচ্চতায় বসা এ তারকার মানসিক দৃঢ়তা কতটা, ফুটবলবিশ্ব জানে। ডালাসের সবুজ গালিচায় সেটি আরেকবার প্রদর্শিত হলো। অস্ট্রিয়ার গোলদ্বার খুলে গেল তারই ছোঁয়ায়। ৩৮ মিনিটে দেখার মতো এক শটে উৎসবের ঢেউ তুললেন ডালাস স্টেডিয়ামে। বাঁদিক থেকে ফাকুন্দা মেদিনার ডায়াগোনাল পাস থিয়াগো আলমাদা ডামি করে ছেড়ে দিলে বাঁ পায়ের সিগনেচার শটে জাল খুঁজে নেন মেসি। তাতে বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে খোদাই করে নেন নিজের নাম।
গোল শোধে মরিয়া অস্ট্রিয়া দ্বিতীয়ার্ধে খেলায় গতি বাড়ায়। বেশ কয়েকবার কাঁপন ধরিয়েছে আর্জেন্টিনার রক্ষণে। সময় গড়াতে থাকে। এক গোলের লিড নিয়ে ৩ পয়েন্টের আশায় আর্জেন্টিনার সমর্থকরা। তাতে তো মেসি তৃপ্ত নন! গোটা ম্যাচে বেশ কয়েকটি সুযোগ নষ্টের জ্বালা হয়তো জুড়াতে চাইলেন শেষবেলায়। দ্বিতীয়ার্ধের যোগ করা সময়ের পঞ্চম মিনিটে একক প্রচেষ্টায় আরেকবার উৎসবের রেণু ছড়ালেন আর্জেন্টাইন সমর্থকদের মনে। হুলিয়ান আলভারেসের শট গোলকিপারের হাতে লেগে ফিরলে বল পেয়ে যান লিয়ান্দ্রো পারেদেস। এ মিডফিল্ডার মেসির দিকে বল ঠেলে িদলে তার প্রথম চেষ্টার শট প্রতিহত অস্ট্রিয়ান এক ডিফেন্ডারের পায়ে। ফিরতি বলে আড়াআড়ি শটে পেয়ে যান নিজের ও দলের দ্বিতীয় গোল।
বিশ্বকাপ জেতার মঞ্চ কাতারে সাত গোল পেয়েছিলেন মেসি। আর এবার দুই ম্যাচেই করলেন পাঁচ গোল। আর্জেন্টাইন জাদুকর এবার কোথায় গিয়ে থামেন সেটাই দেখার। আপাতত এটা পরিষ্কার— মেসি উড়ছেন মানে ক্ষিপ্রগতিতে ছুটছে আর্জেন্টিনা।




