যে আর্জেন্টিনা শেষে খোলে জাদুর বাক্স

সংগৃহীত ছবি
‘জাতীয় সংগীত বাজার পর থেকে পুরো দল আবেগী হয়ে পড়েছিল। এটি আর দশটি সাধারণ জয়ের মতো নয়। দেশে এমন অনেক মানুষ আছেন, যাদের চাকরি নেই, সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে... সেসব মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পারা অসাধারণ’— ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারানোর পর বলেছেন লিওনেল মেসি।
শুধু মেসি নন, এটি পুরো আর্জেন্টিনারই হৃদয়ের কথা। রাজনৈতিক বৈরিতা আর ফকল্যান্ড যুদ্ধের পর ইংল্যান্ডের সঙ্গে ফুটবল শুধুই একটা ম্যাচ হয়ে থাকে না। এজন্যই ম্যাচ শেষে লো সেলসো ‘ফকল্যান্ড আর্জেন্টিনার’ লেখা ব্যানার নিয়ে নেমে পড়েন মাঠে। সেটি উঁচিয়ে ধরেন অন্যরাও। এই ব্যানারে হয়তো কোনো ইতিহাস বদলাবে না কিন্তু খেলার মাঠে একটি গোটা জাতির কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হয়েছে ভালোভাবে।
ম্যাচটা কোনো যুদ্ধ ছিল না। ইতিহাসকে নতুন করে লেখার ব্যাপারও ছিল না। কিন্তু ম্যাচের আগে বলা লিওনেল স্কালোনির ‘শুধুই একটি ফুটবল ম্যাচ’— এই ‘শুধু’ শব্দটার মধ্যেই জড়িয়ে এক বিশাল পৃথিবী। কারণ আর্জেন্টিনায় ফুটবল কখনোই শুধু একটি খেলা হয়ে থাকেনি। এটি তাদের আত্মপরিচয়। আর্জেন্টিনায় এমন অনেক বাবা ও সন্তান আছেন, যাদের জীবনের সবচেয়ে আবেগময় কোলাকুলিটা হয় দলের কোনো একটি গোলের পর। সেই আবেগ আর হাল না ছাড়ার জেদে ইংল্যান্ডকে সেমিফাইনালের মতো মঞ্চে নাস্তানাবুদ করে ছাড়ল আর্জেন্টিনা। জিতল যেন ‘যুদ্ধ’ই।
প্রথম ১৫ মিনিট ছিল কুৎসিত বিশৃঙ্খল আর হাতাহাতি, যেখানে ফুটবলের ছিটেফোঁটাও নেই। ম্যাচ শুরুর দুই মিনিটের মাথাতেই হাতাহাতি! এরপর একে অন্যের সামান্য স্পর্শে তা চলতেই থাকে। স্পেন ও ফ্রান্সের অন্য সেমিফাইনালটির তুলনায় এটি ছিল একেবারে আলাদা এক ম্যাচ। খেলা একই কিন্তু খেলার ধরন আলাদা। রেফারি যতক্ষণ পর্যন্ত সুযোগ দিচ্ছিলেন, ততক্ষণ পর্যন্ত দুটি পদ্ধতিই বৈধ। আর এসবই ছিল ম্যাচের কৌশলের অংশ।
৫৫ মিনিটে অ্যান্থনি গর্ডনের গোলে ইংল্যান্ড এগিয়ে যাওয়ার পর খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসে আর্জেন্টিনা। লিওনেল স্কালোনি মাঠের ডান দিকে পাঠান মেসিকে। ইংল্যান্ড কোচ টমাস টুখেল রক্ষণ আরও শক্ত করতে ফরোয়ার্ড তুলে ডিফেন্ডার নামাতে শুরু করেন একে একে। সেটি ছিল নিজের পায়ে কুড়াল মারার সিদ্ধান্ত। কেননা, সেই গোলের পর ম্যাচের শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ডের বল পজেশন মাত্র ১২ শতাংশ আর আর্জেন্টিনার ৮৮ শতাংশ!
মেসি জাদুর ঝাঁপি খুলতে থাকেন কখনো ভেতরে ঢুকে, কখনো বক্সের সামনে জায়গা তৈরি করে, তো কখনো চোখ জুড়ানো সব পাস দিয়ে। মেসির ড্রিবলই ছিল ৯টি, যা ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর গত চার বিশ্বকাপের সম্মিলিত ড্রিবলিংয়ের চেয়ে একটি বেশি! আর ইংল্যান্ডের সবাই মিলে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ড্রিবল করেছিল সাতটি। ইংল্যান্ডের বক্সে মেসির টাচ ছিল সাতটি, পুরো ইংল্যান্ড দলের টাচও সাতটি। সমান।
১৯৮৬ বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনালে ডিয়েগো ম্যারাডোনার ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ বা ‘ঈশ্বরের হাত’-এর মতো কিছু করতে পারেননি, তবে মেসির ঈশ্বরের পা ঠিকই দেখেছেন ইংলিশরা। ৮৫তম মিনিটে মেসির বাড়ানো পাসেই বক্সের বাইরে থেকে বুলেট শটে সমতা ফেরান এনসো ফের্নান্দেস। আর ইনজুরি টাইমের দ্বিতীয় মিনিটে মেসির ক্রসেই মাথা ছুঁইয়ে আর্জেন্টিনাকে ২-১ গোলের রুদ্ধশ্বাস জয় এনে দেন লাউতারো মার্তিনেস। ৭৫ মিনিটের পর এটি ছিল এবারের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার ১১তম গোল। অথচ ১৯৯০, ১৯৯৮, ২০০৬ আর ২০১৪ বিশ্বকাপের শেষদিকে গোল হজম করে হৃদয় ভেঙেছিল তাদের।
ম্যাক অালিস্টারের হেড ও আরেকটি শট পোস্টে না লাগলে ব্যবধান বাড়তে পারত আরও। তারপরও ১৯৭০ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের করা সর্বোচ্চ ১৯ গোলের রেকর্ডে ভাগ বসাল আর্জেন্টিনা। কার্লোস বিলার্দোর পর আর্জেন্টিনার দ্বিতীয় কোচ হিসেবে টানা দুটি বিশ্বকাপ ফাইনালে পৌঁছানোর গৌরব এখন লিওনেল স্কালোনির। এর আগে ১৯৮৬ ও ১৯৯০ বিশ্বকাপে বিলার্দোর অধীনে টানা দুবার ফাইনালে খেলেছিল আর্জেন্টিনা। এখন ফাইনালেই চোখ স্কালোনির, ‘আমাদের দেশ আর দেশের মানুষের জন্য এটি অনেক বড় আনন্দের মুহূর্ত। আমরা শিরোপা জেতার জন্য লড়াই চালিয়ে যাব।’
ম্যাচের পর টিওয়াইসির সাংবাদিক মাতিয়াস পেলিচিওনি ১৯৮৬ সালের সেই ঐতিহাসিক ম্যাচে ম্যারাডোনার পরা জার্সির একটি রেপ্লিকা মেসির হাতে তুলে দেন। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথমবার খেলতে নেমে ম্যাচসেরা হওয়া মেসি জয়টা উৎসর্গ করেন ম্যারাডোনাকে, ‘নিঃসন্দেহে ওপর থেকে ডিয়েগো এই জয়টা দারুণভাবে উপভোগ করছেন। এটাও ওর জন্য একটি উপহার।’




