দল বেড়েছে গোলও কি বাড়বে?

বিশ্বকাপ ফুটবলে অংশগ্রহণ করা দলের সংখ্যা ৩২ থেকে বাড়িয়ে এবার ৪৮ করেছে ফিফা। ১৯৩০ সালে মহাদেশের ১৩ দলের অংশগ্রহণে মাত্র ১৮ ম্যাচের আয়োজন দিয়ে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা ৯৬ বছর পর তিন দেশে বিস্তৃত ৪৮ দলের অংশগ্রহণে ১০৪ ম্যাচের এক মহাযজ্ঞে রূপ নিয়েছে। আনুষ্ঠানিকতার বাইরে গিয়ে বিশ্বকাপে সাধারণ দর্শকরা দেখতে চায় অসাধারণ ফুটবল, দেখতে চায় গোল। বিশ্বকাপ দৈর্ঘ্যে প্রস্থে বাড়লেও খেলার মানে কতটা বাড়বে এই বৃদ্ধিতে?
ম্যাচ বাড়লেই যে গোল বাড়ে, পরিসংখ্যান এমনটা বলছে না। গড়ে ম্যাচপ্রতি সবচেয়ে বেশি গোল হয়েছে ১৯৫৪ সালের বিশ্বকাপে। সুইজারল্যান্ডে মাত্র ১৬ দলের আসরে ২৬ ম্যাচে গোল হয়েছিল ১৪০টি, ম্যাচপ্রতি গড়ে ৫.৩৮ গোল! অন্যদিকে ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে ৬৪ ম্যাচে গোল হয়েছে ১৭২টি, ম্যাচপ্রতি গড়ে ২.৬৯ গোলের দেখা পাওয়া গেছে। ঐকিক নিয়ম তো বলে, দলের সংখ্যা বাড়লে গোলও বাড়ার কথা। কারণ, যত বেশি দল খেলবে তত দুই দলের পার্থক্যও বাড়বে। এবারের বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ফিফা র্যাংকিংয়ের দল ফ্রান্স আর সর্বনিম্ন র্যাংকিংয়ের দল নিউজিল্যান্ড, তারা আছে ৮৫তম স্থানে। বক্সিংয়ের ভাষায় বোঝাতে গেলে অনেক ক্ষেত্রেই লড়াইটা হবে অসম, হেভিওয়েটের সঙ্গে ফেদারওয়েটের। এমন পরিস্থিতিতে তো দুর্বল দলের গোলবন্যায় ভেসে যাওয়ার কথা। ফুটবল আর বক্সিংয়ের এটিই পার্থক্য!
বিশেষণটা প্রথম বিখ্যাত হয় হোসে মরিনহোর কথা থেকে। সময়টা ২০০৪, মরিনহো তখন চেলসির কোচ। টটেনহামের মাঠ থেকে গোলশূন্য ড্র করে আসার পর প্রতিপক্ষের অতিরিক্ত রক্ষণাত্মক ফুটবলে বিরক্ত মরিনহো বলেছিলেন, ‘পারলে ওরা একটা বাস নিয়ে এসে গোলপোস্টের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়।’ সেই থেকে ‘পার্কিং দ্য বাস’ হয়ে উঠেছে অতিরক্ষণাত্মক ফুটবলের প্রতিশব্দ, যেখানে গোলকিপারের সামনে আরও ৯ জন মিলে জমাট প্রাচীর তুলে দাঁড়িয়ে যান। গোল করা নয়, গোল না খাওয়াই প্রধান লক্ষ্য। একই বছর প্রতি ম্যাচে গোলকিপারের সামনে রক্ষণের দেয়াল তুলে আর সময় সুযোগে কাউন্টার অ্যাটাকে ১ গোল করার কৌশলে ইউরো জিতে বাজিমাত করে দিয়েছিল গ্রিসও। এখনো বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে অনেক দলের কৌশলই থাকে গোল না খাওয়া, পুরো সময়টাই রক্ষণাত্মকভাবে কাটিয়ে দিয়ে কোনোরকমে ১ পয়েন্ট নিয়ে বেরিয়ে যাওয়া। আর নকআউট ম্যাচ হলে খেলাটাকে টাইব্রেকারে নিয়ে যাওয়া, সেখানে তো দুই দলেরই সমান সুযোগ। ১৯৫৪ বিশ্বকাপে যেটা হয়েছিল, বেশিরভাগ ম্যাচে দুই দলই জেতার জন্য খেলেছে এবং গোল করাই ছিল প্রধান উদ্দেশ্য। যে দল বেশি গোল করেছে তারাই জিতেছে। যেমন গ্রুপ পর্বে হাঙ্গেরি-পশ্চিম জার্মানি ম্যাচ শেষ হয়েছে ৮-৩ গোলে, ইংল্যান্ড-বেলজিয়াম ম্যাচ শেষ হয়েছে ৪-৪ সমতায়, কোয়ার্টার ফাইনালে অস্ট্রিয়া-সুইজারল্যান্ড ম্যাচের ফল ছিল ৭-৫ এবং সেটি ৯০ মিনিট শেষে। এখনকার সময়ে এ রকম স্কোরলাইন দেখা যেতে পারে শুধু টাইব্রেকারে।
এবারের বিশ্বকাপে হেভিওয়েট বনাম ফেদারওয়েট ম্যাচ আছে বেশ কয়েকটি। যেমন জার্মানি আর কুরাসাও। চারবারের চ্যাম্পিয়ন জার্মানি, দেশ হিসেবেই বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি। তাদের প্রতিপক্ষ কুরাসাও ক্যারিবিয়ানের ছোট্ট একটা দ্বীপ। আয়তনে জার্মানি কুরাসাওয়ের ৮০৪ গুণ বড় আর জনসংখ্যায় ৫০০ গুণ বেশি। ফুটবলে পার্থক্যটা এর থেকেও বড়। এই অসম লড়াইয়ে জার্মানদের বিপক্ষে কি গোল করার জন্য কোনো ঝুঁকি নিতে চাইবেন ডিক আদফোকাত? তিন দফা নেদারল্যান্ডসের কোচ থাকা এই ডাচ কোচ নিঃসন্দেহে চাইবেন জার্মানদের কাছ থেকে ১ পয়েন্ট আদায় করে নিতে, সেজন্য ইউরোপের বিভিন্ন লিগে খেলা কুরাসাওয়ের অনাবাসী খেলোয়াড়দের নিয়ে গড়া দলটিকে তিনি সাজাবেন রক্ষণাত্মক কৌশলে।
ফিফা র্যাংকিংয়ের ৯ নম্বরে থাকা বেলজিয়ামের সঙ্গে গ্রুপ পর্বে ম্যাচ পড়েছে ৮৫ নম্বরে থাকা নিউজিল্যান্ডের, এই আসরে র্যাংকিংয়ের সবচেয়ে নিচের দল তারাই। ফিফা র্যাংকিংয়ে ৭৬ ধাপের পার্থক্যই বলে দিচ্ছে কতটা অসমান প্রতিযোগিতা হতে যাচ্ছে মাঠে। গত দুবারের ফাইনালিস্ট, ২০১৮ সালের চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সের সঙ্গে গ্রুপ পর্বে খেলবে ইরাক। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির সঙ্গে ছবির দেশ, কবিতার দেশ ফ্রান্সের যতটা পার্থক্য, মাঠের খেলার পার্থক্যটা আরও বেশি। ফিফা র্যাংকিংয়ে চারে থাকা ব্রাজিল গ্রুপ পর্বে খেলবে ৮৩তম স্থানে থাকা হাইতির বিপক্ষে, এই বিশ্বকাপে এই ম্যাচটিতেই দুই দলের ফিফা র্যাংকিংয়ের পার্থক্য সবচেয়ে বড়।
ছোট কিংবা বড়, কোনো দলই গোল হজম করতে চায় না। বিশেষ করে বিশ্বকাপের মতো টুর্নামেন্টে তো আরও না। কারণ, এখানে গ্রুপ পর্ব থেকে পরের ধাপে উঠতে পয়েন্ট, গোলগড় সবকিছুই প্রভাব রাখে। এমন নয় যে, বিশ্বকাপের বড় ম্যাচে গোল হয় না, ২০১৪ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ব্রাজিলকে ৭ গোল দিয়েছে জার্মানি, আর ২০২২ বিশ্বকাপের ফাইনালও পেনাল্টি শুটআউটে নিষ্পত্তি হওয়ার আগে ১২০ মিনিটে দেখেছে ৬ গোল। কিন্তু সেটা অল্পকিছু ম্যাচে। বেশিরভাগ ম্যাচই নিষ্পত্তি হচ্ছে ন্যূনতম ব্যবধানে। কারণ কোচদের কৌশলে ম্যাচ জেতার চেয়ে হার এড়ানোটাই বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে।
১৯৫৪’র পর ১৯৫৮ বিশ্বকাপেও ম্যাচপ্রতি গড়ে এত বেশি গোল না হলেও সংখ্যাটি স্বাস্থ্যবানই ছিল। ফরম্যাট বদলে ১৬ দলের ম্যাচ হলো ৩৫টি, তাতে গোল হয়েছে ১২৬টি, গড়ে প্রতি ম্যাচে ৩.৬ গোল। এরপর শুধু কমতেই থাকল, সেই যে ম্যাচপ্রতি গড় গোল ৩-এর নিচে নামল, সেটি আর উঠলই না। পরের দুই আসরে চিলি আর ইংল্যান্ডে গড় গোল ছিল ২.৭৮, এর পর থেকে সেটি ২.৫-এর আশপাশে। ইতালিতে ১৯৯০ বিশ্বকাপে সেটি কমে হয়ে গেল ২.২১, এরপর তিনটি আসরে ২.৬-এর আশপাশে থাকার পর ২০০৬-এর জার্মানি বিশ্বকাপে সেটি নেমে গেল ২.৩ গোলে। এরপর দক্ষিণ আফ্রিকায় ২০১০ বিশ্বকাপে সেটি আরও নামল, ২.২৭। নামবে না কেন, গোটা আসরে মাত্র ৮ গোল করেও যে বিশ্বকাপ জেতা যায়, সেটি যে দেখিয়ে দিয়েছিল স্পেন! বিপরীতে তারা হজম করেছিল মাত্র ২ গোল, নকআউট পর্বের চারটি ম্যাচই স্প্যানিশরা জিতেছিল ১-০ ব্যবধানে। বিশ্বকাপের সবশেষ তিন আসরেও গড় গোল ২.৬ করেই। ব্রাজিল বিশ্বকাপে গড় গোল ২.৬৭, রাশিয়ায় ২.৬৪ আর কাতারে ২.৬৯।
প্রতিপক্ষে ইরাককে পেয়ে ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে, কিংবা উজবেকিস্তানকে পেয়ে পর্তুগালের ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো গোলসংখ্যা বাড়িয়ে নিতে পারেন। তবে নিউজিল্যান্ড, কুরাসাও, হাইতি, ইরাক কিংবা উজবেকিস্তানের মতো দলগুলো বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ায় তাদের বিপক্ষে ম্যাচগুলোয় বড় প্রতিপক্ষ যে বলে-কয়ে গোলবন্যা বইয়ে দেবে, এমনটি মোটেও বলার উপায় নেই। প্রথমত সব দলই কঠিন বাছাই পর্ব অতিক্রম করেই বিশ্বকাপে এসেছে, যেখানে ইতালি কিংবা চিলির মতো প্রতিষ্ঠিত দল সুযোগ পায়নি। দ্বিতীয়ত লড়াইটা যখন অসম, তখন কোনো কূটকৌশল নিতেই বাধা নেই। তাই সুযোগ পেলে গোলপোস্টের সামনে বাস দাঁড় করিয়ে দিতেও কোচদের আপত্তি নেই!




