মহাশক্তির মহাপতন
যন্ত্র ও সৌন্দর্যের বিদায় একই রাতে

জার্মানি এই প্রথম বিশ্বকাপে টাইব্রেকারে হেরে বিদায় নিয়েছে।
ফুটবলে ‘জার্মান যন্ত্রের ঐতিহ্য’ ও নেদারল্যান্ডসের ‘টোটাল ফুটবল’— দুটিই ফুটবল ইতিহাসের অমর অধ্যায়। একদল শিখিয়েছে কীভাবে জিততে হয়, অন্য দল দেখিয়েছে ফুটবলের শিল্পোত্তীর্ণ রূপ। কিন্তু ১২ গজের পেনাল্টি বক্সে গিয়ে সব ঐতিহ্য, দর্শন ও কৌশল মুহূর্তেই অর্থহীন হয়ে যায়। টাইব্রেকার এমন এক ‘রোলারকোস্টার’ যেখানে যুক্তির চেয়ে স্নায়ু, পরিকল্পনার চেয়ে মুহূর্তের সাহস ও ভাগ্যের প্রভাব থাকে বেশি।
জার্মানি এই প্রথম বিশ্বকাপে টাইব্রেকারে হেরে বিদায় নিয়েছে। রাউন্ড অব থার্টি টু-তে তারা ৪-৩ গোলে হেরেছে র্যাংকিংয়ে ৩১ ধাপ নিচের দল প্যারাগুয়ের কাছে। হারার পর জার্মানির তরুণ কোচ নাগেলমান তার ফুটবল দলের পরিচিতি নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছেন, ‘প্রথম পর্বের পরেই বিদায় নিলে তা আর জার্মান ফুটবলের জন্য যথেষ্ট নয়। টানা তৃতীয়বারের মতো ছিটকে গেছি আমরা, তাই আমরা আর প্রথম সারির দলগুলোর মধ্যে নেই।’
এটা শুধু হতাশার গল্প নয়, বাস্তবতাও। ২০১৪ সালে সর্বশেষ বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর জার্মানির পতনের গল্প শুরু হয়েছে। পরের দুই বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বই পেরোতে পারেনি চারবারের চ্যাম্পিয়নরা। এবার নকআউটে পা রেখেই বিদায়। এক যুগে পরিষ্কার হয়ে গেছে, বেকেনবাওয়ার, ম্যাথাউস, মুলার, ক্রুসদের সঠিক উত্তরাধিকার নেই এই দলে। একসময় বলা হতো, শেষ বাঁশি না বাজা পর্যন্ত জার্মানরা হারে না। সেই দুর্দমনীয় শক্তি আজ যেন ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে ক্ষয়ে যাওয়া এক ফুটবল সাম্রাজ্যের প্রতীকে।
আর নেদারল্যান্ডস সেই শিল্পী, যার আঁকা ছবির প্রশংসা সবাই করে কিন্তু পুরস্কারের মঞ্চে তার নামটি আর উচ্চারিত হয় না। হওয়ার মেতো অবস্থা তৈরিও করে না। এবার রাউন্ড অব থার্টি টু-তে মরক্কোর বিপক্ষে নেদারল্যান্ডস লিড নিয়েছিল গাকপোর গোলে। নির্ধারিত সময়ের শেষ মুহূর্তে মরক্কোর গোলে ম্যাচটি ১-১-এর সমতায় টাইব্রেকারে পৌঁছাতেই আসলে ডাচ ফুটবল স্বপ্ন ফিকে হয়ে আসে। ওখানে একদম আনাড়ি তিনবার বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলা দলটি।
প্রচণ্ড সমালোচনা হচ্ছে নেদারল্যান্ডসের কোচ রোনাল্ড কোম্যানের। তার পাঁচ ডিফেন্ডার খেলানো ও রক্ষণাত্মক ফুটবল নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে চারদিকে। কিন্তু ডাচ কোচ গায়েই মাখছেন না, ‘সমালোচনা করা আপনার অধিকার। আপনারা সাইডলাইন থেকে দেখেন, আমি দলের সঙ্গে মাঠের ভেতরে কাজ করি। তাই আবারও সুযোগ পেলে আমি একই সিদ্ধান্ত নেব।’ তিনি যে কৌশলই নিক, ম্যাচ জিততে না পারলে সমালোচনা হবেই। তাও আবার জিততে হবে নির্ধারিত সময়ে। কারণ টাইব্রেকারের অলক্ষুনে অভিশাপ ডাচদের পিছু ছাড়ছে না।
শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপও মনে করিয়ে দিল, ফুটবলের এত কৌশল ও নন্দনতত্ত্বের যারা জন্ম দিয়েছে— তারা টাইব্রেকার পরীক্ষা উতরানোর কোনো সূত্র আবিষ্কার করতে পারেনি।




