ব্রাজিলের সামনে ‘অপরাজিত’ নরওয়ে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ইতিহাসের পাতায় ভাইকিংসদের পরিচিতি দুর্ধর্ষ যোদ্ধা, দক্ষ নাবিক আর অভিযাত্রী হিসেবে। অষ্টম থেকে একাদশ শতকের সময়টায় দাঁড়টানা জাহাজে করে তারা আটলান্টিক মহাসাগরে ঘুরে বেড়াতেন, আবিষ্কার করতেন নতুন নতুন জলপথ। আজকের আর্লিং হলান্ডরা তাদেরই বংশধর। পূর্বপুরুষদের প্রতি সম্মান দেখাতেই প্রতিটি ম্যাচ জয়ের পর ড্রামের শব্দের সঙ্গে দাঁড়টানার ভঙ্গিতে উদযাপন করেন নরওয়ের ফুটবলাররা। নিউ ইয়র্কে আজ ব্রাজিলের সামনে সেই অকুতোভয় ভাইকিংসরা, যাদের বিপক্ষে বিশ্বকাপে কখনোই জিততে পারেনি ব্রাজিল।
শেষ ৩২-এর রাউন্ডে বেশিরভাগ বড় দলেরই জিততে ঘাম ছুটেছে। নেদারল্যান্ডস আর জার্মানি তো অঘটনের শিকার হয়ে ধরেছে বাড়ির পথ। ইংল্যান্ড, আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, নরওয়েরও জয়টা সহজে আসেনি। তাই নকআউটের পরের পর্বে লড়াইটা যে দুই তরফের জন্যই কঠিন হতে যাচ্ছে, এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। ব্রাজিলকে নিঃসন্দেহে দুর্ভাবনায় ফেলবে আর্লিং হলান্ডের ফর্ম। এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপে ৫ গোল করে ফেলেছেন হলান্ড। আলিসন এখন পর্যন্ত হজম করেছেন দুটি গোল, একটি মরক্কোর বিপক্ষে আসরের প্রথম ম্যাচে আর পরেরটি সবশেষ ম্যাচে জাপানের বিপক্ষে। আশঙ্কার ব্যাপার হচ্ছে, দুটি গোলই ব্রাজিল হজম করেছে অনেকটা একই ধাঁচে। দুই সেন্টারব্যাক গাব্রিয়েল মাগালিয়ায়েস আর মার্কিনিয়োসকে গতিতে পেছনে ফেলে যেভাবে মাঝমাঠ থেকে বাড়ানো বলটা ধরে নিয়ে গোল করেছেন মরক্কোর ইসমাইল সাইবারি আর জাপানের কাইশু সানোকে পাঁচজন মিলেও পাহারা দিয়ে রাখতে পারেননি। পিএসভিতে খেলা সাইবারি কিংবা মেইনজে খেলা সানোর চেয়ে হলান্ড অনেক উঁচু মানের স্ট্রাইকার। সবশেষ মৌসুমে ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে সবরকম প্রতিযোগিতা মিলিয়ে তার গোলসংখ্যা ৩৮। ছয় বছর পিএসভিতে খেলেও এতটা গোল করতে পারেননি সাইবারি। অন্যদিকে, ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার সানোর গোটা ক্যারিয়ারের গোলের অর্ধেক এই বিশ্বকাপে হলান্ড এরই মধ্যে করে ফেলেছেন! সানোর ক্লাব ক্যারিয়ারের গোলসংখ্যা ১০, হলান্ডের বিশ্বকাপেই ৫ গোল হয়ে গেছে।
কার্লো আনচেলত্তি শিয়ালের মতোই ধূর্ত, হলান্ডকে আটকাতে তার সাদা চুলের নিচের ধূসর কোষে নিশ্চয়ই কোনো একটা পরিকল্পনার ছক করা হয়ে গেছে। রিয়াল মাদ্রিদের কোচ থাকা অবস্থায় ম্যানচেস্টার সিটির বিপক্ষে একাধিকবার নকআউটে মুখোমুখি হয়েছেন আনচেলত্তি। এই ভাইকিংস যোদ্ধাকে আটকাতে রুডিগারের সঙ্গে আলাবা কিংবা চুয়ামেনিকে (যাকে যখন পেয়েছেন) নিয়ে রীতিমতো ‘খাঁচা’ বানিয়েছিলেন ইতালিয়ান গ্র্যান্ডমাস্টার। রুডিগার তার সঙ্গে আঠার মতো সেঁটে থেকে কোনো জায়গাই দেননি হলান্ডকে। সেই একই কৌশল যদি আনচেলত্তি ব্রাজিলের ম্যাচেও কাজে লাগাতে চান, তাহলে তার হাতে সেই অস্ত্র হয়ে উঠতে পারেন গাব্রিয়েল ও মার্কিনিয়োস। গাব্রিয়েল খেলেন আর্সেনালে, সেই সুবাদে হলান্ডের গতিবিধির সঙ্গে তার ভালোই পরিচিতি; সেই সঙ্গে দশাসই স্বাস্থ্যে হলান্ডকে রোখার মতো শক্তিও রাখেন।
‘একা রামে রক্ষা নেই সুগ্রীব দোসর’ প্রবাদের মতোই হলান্ডকে সামাল দিতে গেলেও অন্যদিকে ফাঁকা হয়ে যাচ্ছেন মার্টিন ওডেগার্ড। আর্সেনালে খেলা নরওয়ের এই ফরোয়ার্ডও হয়ে উঠতে পারেন হুমকি। তবে আর্সেনালেরই আরেক ফরোয়ার্ড গাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি হয়ে উঠতে পারেন নরওয়ের মাথাব্যথার কারণও। জাপানের বিপক্ষে তার গোলেই তো বাঁচল ব্রাজিল।
চোট কাটিয়ে ফিরছেন রাফিনিয়া। তবে একাদশে তাকে শুরু থেকেই কি আনচেলত্তি রাখবেন নাকি তার অনুপস্থিতিতে ভালো করা রায়ানেই আস্থা রাখবেন, সেটিও প্রশ্ন। চোটের কারণে অনিশ্চিত লুকাস পাকেতা আর নেইমার তো এক আশ্চর্যবোধক চিহ্ন হয়েই আছেন।
নরওয়ের সঙ্গে চারবারের দেখায় একবারও জিততে পারেনি ব্রাজিল, ড্র দুবার আর দুবার হার। সবশেষ নরওয়ে বিশ্বকাপ খেলেছিল ১৯৯৮ সালে। সেবার গ্রুপ পর্বের ম্যাচে ব্রাজিলকে ২-১ গোলে হারিয়ে দিয়েছিল নরওয়ে। যে ম্যাচে একাদশে না থাকলেও বেঞ্চে ছিলেন নরওয়ে দলের খেলোয়াড়, হলান্ডের বাবা আলফ-ইঙ্গে হলান্ড। এবার বিশ্বকাপে ফের মুখোমুখি ব্রাজিল-নরওয়ে। শেষ মুহূর্তে চোটে না পড়লে হলান্ড নামটা এবার শুরুর একাদশেই থাকবে। পারিবারিক ইতিহাসের হুবুহু পুনরাবৃত্তি হয়তো হচ্ছে না, বাকিটা আনচেলত্তির হাতে।




