সূর্যোদয়ের দেশে ফুটবল রূপকথা

হিরোশিমা শহরে যখন আকাশ থেকে ‘লিটল বয়’ এসে পড়ল, মুহূর্তে ছারখার হয়ে গেল শহরটির মাইলের পর মাইল এলাকা। কিছু বুঝে ওঠার আগেই যমদূতের মতো ধেয়ে আসা পারমাণবিক বোমায় প্রাণ হারাল প্রায় দেড় লাখ মানুষ। শুধু মানবসভ্যতা নয়, ধুলার সঙ্গে মিশে গেল দেশটির অর্থনীতিও। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া জাপানের কঙ্কালসার রূপ দেখে গোটা বিশ্ব সেদিন ধরে নিয়েছিল, দেশটি আর কোনোদিন মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না। কিন্তু ইতিহাসের সব হিসাব-নিকাশ আর ভবিষ্যদ্বাণী ভুল প্রমাণ করতে খুব বেশি সময় নেয়নি সূর্যোদয়ের দেশ। মাত্র কয়েক দশকের মধ্যেই এক অলৌকিক পুনরুত্থানে জাপান আজ শুধু এশিয়াই নয়, গোটা বিশ্বের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক পরাশক্তি। বুলেট ট্রেন আর অত্যাধুনিক সব প্রযুক্তিপণ্যে বিশ্বজয়ের পাশাপাশি বহির্বিশ্বে জাপানের আরেকটি বড় পরিচয়— ফুটবল।
বিশ্বকাপ ফুটবল মানেই যেখানে ইউরোপ আর লাতিন আমেরিকার একচেটিয়া আধিপত্য; সেখানে এশিয়ার দেশগুলোর যাত্রা শেষ হয়ে যায় খুব অল্পতেই। ২০০২ সালে ঘরের মাঠে দক্ষিণ কোরিয়ার সেই রূপকথার সেমিফাইনাল খেলাই এখন পর্যন্ত বিশ্বমঞ্চে এশিয়ান ফুটবলের সর্বোচ্চ প্রাপ্তি। এরপর কেটে গেছে দীর্ঘ দুই দশক। ২০২৬ বিশ্বকাপ যখন আবারও দুয়ারে কড়া নাড়ছে, তখন পুরো এশিয়ার নজর সূর্যোদয়ের দেশ জাপানে। এবারের বিশ্বকাপে এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি) থেকে অংশ নিচ্ছে রেকর্ড আটটি দেশ। জাপান ছাড়াও এ তালিকায় আছে দক্ষিণ কোরিয়া, ইরান, সৌদি আরব, ইরাক, কাতার এবং প্রথমবারের মতো ইতিহাস গড়া উজবেকিস্তান ও জর্ডান। অবধারিতভাবেই মূল আকর্ষণ ফিফা র্যাংকিংয়ের ১৮ নম্বরে থাকা ‘ব্লু সামুরাই’দের ঘিরেই। কারণ, ইতিহাসে এই প্রথম কোনো এশিয়ান দেশ বিশ্বকাপে শুধু ‘অংশগ্রহণকারী’ কিংবা বড় কোনো দলকে চমকে দেওয়া ‘জায়ান্ট কিলার’ হিসেবে নয়, বরং অন্যতম ফেভারিট হিসেবেই টুর্নামেন্টে পা রাখছে।
জাপান ফুটবলের এই রাজসিক উত্থান কোনো অলৌকিক ঘটনা নয়, বরং তিন দশক ধরে জাপানিজ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (জেএফএ) এক সুদূরপ্রসারী, আধুনিক ও সুশৃঙ্খল পরিকল্পনার ফসল। জাপানের এই ফুটবল বিপ্লবের শুরু ১৯৯১ সালে, যা পূর্ণতা পায় ১৯৯৩ সালে পেশাদার ‘জে লিগ’ শুরুর মাধ্যমে। ১৯৯৬ সালে জেএফএ একটি শতবর্ষী মাস্টার প্ল্যান হাতে নেয়। যার মূল লক্ষ্য ছিল তৃণমূল স্তরে অবকাঠামো উন্নয়ন এবং নিজস্ব বিশ্বমানের একাডেমি গড়ে তোলা। শুরুর দিকে জিকো, গ্যারি লিনেকার কিংবা পিয়েরে লিটবারস্কির মতো বুড়ো বিশ্বতারকাদের মোটা অঙ্কের টাকায় লিগে এনে বিশ্ব জুড়ে তুমুল আলোড়ন তৈরি করেছিল জাপান। কিন্তু দ্রুতই তারা বুঝতে পারে, কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ঢেলে বিদেশি তারকা এনে দেশের ফুটবলের প্রকৃত উন্নতি সম্ভব নয়। তাই দ্রুতই গ্ল্যামারের পথ পরিহার করে তৃণমূল ফুটবল ও যুব একাডেমি তৈরিতে মনোযোগ দেয় জাপান। প্রচুর বিনিয়োগের পাশাপাশি শুরু হয় শক্তিশালী পাইপলাইন তৈরির মিশন।
পরিকল্পনার সুফলও মিলতে শুরু করে হাতেনাতে। ১৯৯৮ সালে প্রথমবারের মতো ফিফা বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে সামুরাইরা। এর পরের গল্পটা শুধুই অবিরাম ছুটে চলার, যেখানে ২৮ বছর ধরে কোনো বিশ্বকাপের মূল মঞ্চ থেকেই বাদ পড়েনি তারা। এই একটি পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে, বুলেট ট্রেনের গতিতেই নিজেদের ফুটবলকে এগিয়ে নিয়েছে দেশটি। ২০২৬ বিশ্বকাপে জাপানের স্কোয়াডে রয়েছে তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি ইউরোপ-প্রবাসী খেলোয়াড়। কাউরু মিতোমা ও তাকুমি মিনামিনোর মতো তারকাদের চোটের ধাক্কাও তাই অনায়াসে সামাল দিতে পারছেন কোচ হাজিমে মোরিয়াসু। ইউরোপের শীর্ষ লিগে খেলার অভিজ্ঞতা থাকায় দলটির রক্ষণ থেকে আক্রমণ— সবখানেই রয়েছে অবিশ্বাস্য গভীরতা। মাঝমাঠ সামলানোর দায়িত্বে আছেন রিয়াল সোসিয়েদাদের তাকেফুসা কুবো, ফ্রাঙ্কফুর্টের রিতসু দোয়ান ও লিভারপুলের ওয়াতারু এন্দো। আক্রমণে ডাচ লিগের গোল্ডেন বুটজয়ী উয়েদার সঙ্গী সেল্টিকের গতিদানব দাইজেন মায়েদা। অতীতে জাপানের প্রধান দুর্বলতা ছিল রক্ষণভাগ, যা এবার সামলাচ্ছেন আয়াক্সের তাকেহিরো তোমিয়াসু ও কো ইতাকুরা। আর গোলবারে বিশ্বস্ততার প্রতীক পার্মার জিওন সুজুকি। সাম্প্রতিক প্রীতি ম্যাচে ব্রাজিল ও ইংল্যান্ডকে হারিয়ে জাপান জানান দিয়েছে, পরাশক্তিদের চোখ রাঙানিতে তারা আর ভীতু নয়। এবারের বিশ্বকাপে জাপান যদি সেমিফাইনাল খেলে, তবে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না বলেই মনে করছেন ফুটবলবোদ্ধারা।
শক্তির বিচারে জাপানের মতো অতটা আলো কাড়তে না পারলেও এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম আলোচিত দল ইরান। ফিফা র্যাংকিংয়ের ২০ নম্বরে থাকা এই লায়ন্সরা মাঠের ফুটবলের চেয়ে রাজনৈতিক মারপ্যাঁচ আর নানামুখী বাধার মুখোমুখি হয়েছে সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে পা রাখার পর থেকেই অবধারিতভাবে তাদের দিকে ধেয়ে এসেছে ভূরাজনীতির নানা ঝড়ঝাপটা। যুদ্ধবিধ্বস্ত ও নানা নিষেধাজ্ঞায় জর্জরিত ইরান, কিন্তু ফুটবল ঐতিহ্যে পিছিয়ে নেই; জাপানের সমান সাতবার বিশ্বকাপের টিকিট কেটেছে তারা। তবে প্রতিবারই টুর্নামেন্ট শেষ হয়েছে গ্রুপ পর্বে। এবার অবশ্য মাঠের লড়াইয়ে তারুণ্যের চেয়ে অভিজ্ঞতায় বেশি ভরসা রাখছে দলটি।
অন্যদিকে, ৪০ বছর পর বিশ্বকাপের মূল পর্বে উঠেছে মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ ইরাক। ফিফা র্যাংকিংয়ের ৫৬ নম্বরে থাকা ‘মেসোপটেমিয়ার সিংহ’রা প্রতিবেশী ইরানের মতোই ভূরাজনীতির গ্যাঁড়াকলে পড়েছে। দল হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছামাত্রই তিক্ত এক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়। শিকাগোর ও’হেয়ার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইরাকের প্রধান স্ট্রাইকার আয়মেন হুসেইনকে টানা ৭ ঘণ্টা আটকে রেখে জেরা করে মার্কিন অভিবাসন কর্তৃপক্ষ। এর আগে তারা শুধু একবারই বিশ্বমঞ্চে খেলার স্বাদ পেয়েছিল, সেটি ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে। সেই আসরে বেলজিয়ামের বিপক্ষে ম্যাচের ৫৯ মিনিটে ইরাকের ফুটবল ইতিহাসের একমাত্র বিশ্বকাপ গোলটি করেছিলেন দেশটির কিংবদন্তি স্ট্রাইকার আহমেদ রাধি। এবারের আসরে তাদের প্রধান চালিকাশক্তি একঝাঁক প্রতিভাবান তরুণ। বিশেষ করে জিদান ইকবাল কিংবা আলি আল-হামাদির মতো ইউরোপের শীর্ষ লিগগুলোয় খেলা ফুটবলারদের ওপর ভর করেই নতুন ইতিহাস লিখতে চায় ইরাক।
টানা ১০ বার বাছাই পর্বে ব্যর্থতার পর প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের মূল পর্বে জায়গা করে নিয়েছে জর্ডান। বিশ্বমঞ্চে অংশগ্রহণই তাদের কাছে স্বপ্নপূরণের মতো। বিশ্বকাপে খেলা নিশ্চিত হওয়ার রাতে আম্মানের রাজপথে উল্লাস করেছে লাখো মানুষ। র্যাংকিংয়ের ৬৩ নম্বর দলটির জন্য বিশ্বকাপ শিরোপা হয়তো দুরাশার, কিন্তু প্রথমবার বিশ্বমঞ্চে নিজেদের দেশের পতাকা ওড়ানোই হবে তাদের জন্য বড় অর্জন।
২০৩৪ বিশ্বকাপের আয়োজক সৌদি আরব কয়েক বছর ধরেই ক্রীড়াক্ষেত্রে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছে। ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো, নেইমার, করিম বেনজেমা, সাদিও মানের মতো সুপারস্টারদের এনে তারা সৌদি প্রো লিগের দৃশ্যপটই বদলে দিয়েছে! এমনকি কিলিয়ান এমবাপ্পে কিংবা ভিনিসিয়ুস জুনিয়রদের মতো তারকাদের পেছনেও তারা অর্থ খরচে রাজি। জাপান তাদের ফুটবলের উন্মেষলগ্নে যে গ্ল্যামারের পথ থেকে সরে এসেছিল, বর্তমানে সেই পথেই হাঁটছে সপ্তমবারের মতো বিশ্বকাপে অংশ নিতে যাওয়া সৌদি। বিশ্বকাপে তারা একবারই নকআউট খেলতে পেরেছিল, সেটিও তাদের প্রথম বিশ্বকাপ ১৯৯৪ আসরে। এখন পর্যন্ত ক্রীড়াক্ষেত্রে তাদের অতি-বিনিয়োগ বিশ্বমঞ্চে উল্লেখযোগ্য কোনো সাফল্য এনে দিতে পারেনি।
টটেনহাম হটস্পারের সাবেক সুপারস্টার সন হিউং-মিনের দেশ দক্ষিণ কোরিয়া বিশ্বকাপে এশিয়ার সবচেয়ে ‘সফল’ দল। ২০০২ সালে ঘরের মাঠে সেমিফাইনাল খেলা ফিফা র্যাংকিংয়ের ২৫ নম্বর দলটির এবারের প্রধান শক্তি তাদের বিশ্বমানের আক্রমণভাগ। অধিনায়ক সনের বিপুল অভিজ্ঞতা আর পিএসজি তারকা লি কাং-ইনের গতি ও ড্রিবলিংয়ের মেলবন্ধন যেকোনো প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ গুঁড়িয়ে দিতে পারে। মধ্য এশিয়ার দেশ উজবেকিস্তান প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের মূল পর্বে উঠেছে। সাড়ে তিন কোটি জনসংখ্যার দেশটি ১৯৯২ সালে স্বাধীন দেশ হিসেবে প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছিল। ১৯৯৬ থেকে তারা প্রতিটি এশিয়ান কাপে অংশ নিয়েছে। ২০০৪ সাল থেকে প্রতিবারই উঠেছে নকআউটে। তাই ফিফা র্যাংকিংয়ের ৫০ নম্বর দলটিকে নিয়ে বিশ্বকাপে বাড়তি কিছুই আশা করছেন সমর্থকরা।
বাকি সাত দলের শক্তি, ঐতিহ্য কিংবা মাঠের বাইরের নানা সীমাবদ্ধতার চিত্র যখন এমন, তখন উত্তর আমেরিকার এই বিশ্বকাপে পুরো এশিয়ার আশা-আকাঙ্ক্ষার একমাত্র প্রতীক হয়ে উঠেছে ‘ব্লু সামুরাই’ জাপান। অনেক দেশেই ফুটবল যেখানে স্রেফ আবেগের কিংবা টিকে থাকার লড়াই, জাপানিরা সেখানে ফুটবলকে রূপ দিয়েছে নিখুঁত এক বিজ্ঞানে। বিশ্বমঞ্চে তাকেফুসা কুবোরা কতদূর যাবে, তার উত্তর সময়ের কাছে তোলা রইল। তবে সাড়ে তিন দশকে সুশৃঙ্খলভাবে তারা যে ফুটবল বিপ্লব ঘটিয়েছে, তা অন্য এশিয়ান দেশগুলো রোল মডেল হিসেবে গ্রহণ করতে পারে।




