৬৪ দল নিয়ে বিতর্ক
বিশ্বকাপ সোনার ডিম পাড়া হাঁস!

সংগৃহীত ছবি
এই বিশ্বকাপ শেষ হতে না হতেই শুরু হয়ে গেছে ২০৩০ বিশ্বকাপের দল সংখ্যার আলোচনা। প্রসঙ্গটা তুলেছেন দক্ষিণ আমেরিকান ফুটবল সংস্থা বা কনমেবল সভাপতি আলেহান্দ্রো ডোমিঙ্গেস। বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ৬৪ দলের পক্ষে অবস্থান নিয়ে লিখেছেন, ‘২০৩০ বিশ্বকাপ ৬৪ দলের হলে ভালো। এটা নিশ্চিত করতে কনমেবল কাজ করে যাচ্ছে। ৬৪ দলের হলে পৃথিবীর কোনো দেশই ফুটবল উৎসব থেকে বাদ পড়বে না।’
কনমেবল ২০২৫ সালে প্রথম প্রস্তাব দিয়েছিল ৬৪ দলের বিশ্বকাপ আয়োজনের। এর পর থেকে তারা বিভিন্ন সময়ে বলেছে একই কথা। পরে একই সুর শোনা গেছে ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর কণ্ঠেও। এই ইস্যুতে তিনিও ইতিবাচক, সরাসরি না হলেও যেন এই প্রস্তাবের পক্ষে ঝুঁকে আছেন ফিফা সভাপতি।
ফিফা সভাপতির নির্বাচন ও অর্থ
ইনফান্তিনোর সময়কালকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় তিনি সবসময় অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পক্ষে। ফিফা সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার সময়ই তিনি বলেছিলেন বেশি আর্থিক সহযোগিতার কথা। এখন প্রতিটি দেশের ফুটবল সংস্থা ফিফা থেকে ৮০ লাখ ডলার পায় চার বছরে। দুর্বল দেশগুলো অতিরিক্ত ১২ লাখ ডলারের সহায়তাও পায়। এ ছাড়া প্রতিটি মহাদেশীয় ফুটবল কনফেডারেশন ফুটবলের উন্নয়ন, প্রচার ও পরিচালনার জন্য পায় ৬ কোটি ডলার।
এই আর্থিক সহযোগিতাই ফিফা সভাপতি নির্বাচনে ইনফান্তিনোর বড় অস্ত্র। অর্থের কারণে নির্বাচনে অনেক দেশের সমর্থন তিনি পাবেন। ধারণা করা হচ্ছে, এবারও তিনি পাস করে যাবেন সভাপতি পদে।
কিন্তু এই বিপুল অর্থ জোগানোর উৎস হিসেবে তিনি ব্যবহার করেন বিশ্বকাপকে। এই টুর্নামেন্ট বড় হলে বেশি আয়— এই ফর্মূলাতেই বিশ্বাসী ইনফান্তিনো। তাই কনমেবলের সঙ্গে সুর মিলিয়ে ফিফা প্রেসিডেন্টও বলতে থাকেন, ‘ছোট দেশগুলোকে যদি বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ না দেওয়া হয়, তাহলে তাদের উন্নতির জায়গা থাকবে না।’
৪৮ দলের এবারের বিশ্বকাপ থেকে ফিফার আয় হবে প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার। ৬৪ দলের হলে টেলিভিশন সম্প্রচারস্বত্ব, স্পন্সরশিপ ও টিকিট বিক্রি থেকে আয় বাড়বে।
অর্থযোগ বাড়াতে গিয়ে বিশ্বকাপ যেন ফুটবল থেকে একটু দূরেই সরে গেছে এবার। সুপার বোলের আদলে বিশ্বকাপ ফাইনালে লম্বা বিরতি দেওয়া হয়েছে বিনোদন অনুষ্ঠানের জন্য। সেটি ২৭ মিনিট ২২ সেকেন্ডের, যা ফুটবল ইতিহাসে প্রথম। তা ছাড়া হাইড্রেশন ব্রেক কি শুধুই ফুটবলারদের পানি পানে সতেজ হওয়ার বিরতি? এর পাশাপাশি টেলিভিশনে কমার্শিয়াল ব্রেকে আয়েরও সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। ফিফা সভাপতিও যে ৬৪ দলের পক্ষে দাঁড়াবেন, এতে কোনো সন্দেহ নেই।
৪৮ দলের বিশ্বকাপ কেমন হয়েছে
এবারের বিশ্বকাপে অনেক নতুন দল খেললেও আফ্রিকার দলগুলোই ভালো করেছে বেশি। আফ্রিকার ১০ দলের মধ্যে ৯টি পৌঁছেছে দ্বিতীয় রাউন্ডে বা নকআউটে। এশিয়ার ৯ দলের মাত্র দুটি এবং কনকাকাফের ছয় দলের মধ্যে তিনটি পৌঁছেছে নকআউটে। ইউরোপ ও আফ্রিকার অনেক দল তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী হলেও এশিয়া ও কনকাকাফ অঞ্চলের দলগুলো এখনো সেই মানে পৌঁছাতে পারেনি। নতুন দলগুলোর মধ্যে একমাত্র কেপ ভার্দেই ব্যতিক্রম। তারা বড় দলগুলোকেও চমকে দিয়েছে।
তবে বিশ্বকাপ বড় করতে হলে ইউরোপের দেশগুলোর জন্য কোটা বরাদ্দ করা উচিত। তাতে ইতালি, ডেনমার্ক, পোল্যান্ডের মতো দলগুলোর দুয়ার খুলতে পারে।
৬৪ দলের ধারণা কি অনুমোদন পাবে
২০৩০ সালের বিশ্বকাপ হবে স্পেন, মরক্কো ও পর্তুগালে। এটা বিশ্বকাপের শতবর্ষ পূর্তির আসর বলে উরুগুয়ে, আর্জেন্টিনা ও প্যারাগুয়েতে হবে একটি করে ম্যাচ।
এই বিশ্বকাপ ৬৪ দলে সম্প্রসারণে মহাদেশীয় সংস্থাগুলোর কাছ থেকে এর পক্ষে তেমন সমর্থন মিলছে না। ইউরোপীয় ফুটবল সংস্থার সভাপতি আলেকজান্ডার সেফেরিন এটাকে খারাপ আইডিয়া বলে মন্তব্য করেছেন। উত্তর ও মধ্য আমেরিকা এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলের সংস্থা কনকাকাফের সভাপতি ভিক্টর মন্তগলিয়ানি এই ধারণাকে ক্ষতিকর বলে ব্যাখ্যা করেছেন। তার চোখে ফুটবলের এটা বৃহত্তর স্বার্থের জন্য ভালো হবে না।
এএফসি সভাপতি শেখ সালমান বিন ইব্রাহিম আল খলিফাও এর পক্ষে নন। তার ধারণা, ‘ফুটবল সম্প্রসারণে এটা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে।’
আসলে বিশ্বকাপ হয়ে গেছে সোনার ডিম পাড়া হাঁস। দল বাড়িয়ে এ টুর্নামেন্ট থেকে শুধু টাকা কামাতে চায় ফিফা। এতে অনেক বিরোধিতা থাকলেও এটা যে বাস্তবায়ন হবে না, তা বলা মুশকিল। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন ফিফা কাউন্সিলের ৩৭ সদস্য।





