নিঃস্ব রিক্ত রাজপুত্রের বিদায়

শূন্য হাতেই আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানালেন সুপারস্টার নেইমার।
ব্রাজিলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা তিনি। গোলসংখ্যায় পেছনে ফেলেছেন পেলে-রোনালদো নাজারিওর মতো মহীরুহদের। যার ক্যারিয়ারে শুধুই সোনালী সাফল্যের গল্প থাকার কথা ছিল, নিয়তি তার জন্য লিখে রেখেছিল এক নির্মম ট্র্যাজেডি। ২০১০ সালে নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামের যে সবুজ গালিচায় উজ্জ্বল সম্ভাবনা নিয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলে পা রেখেছিলেন, ঠিক ১৬ বছর পর সেই একই মাঠেই অশ্রুসিক্ত বিদায়ে শেষ হলো ব্রাজিলিয়ান ফুটবল রাজপুত্রের যাত্রা। বিশ্বকাপ শিরোপা তো দূর, কোনো ব্যালন ডি’অর ছাড়া আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টেনে দিলেন নেইমার জুনিয়র। এই ব্যালন ডি’অর নামের সোনার হরিণটা ধরবেন বলেই ২০১৭ সালে বার্সেলোনার বিখ্যাত ‘এমএসএন’ ত্রয়ী ভেঙে পিএসজিতে যোগ দিয়েছিলেন। ২২২ মিলিয়ন ইউরোর সেই দলবদল কাঁপিয়ে দিয়েছিল পুরো ফুটবল বিশ্বকে। তখন চাউর হয়েছিল, মেসির ছায়া থেকে মুক্ত না হলে নেইমারের কপালে ব্যালন ডি’অর জুটবে না। নেইমার নিজেও প্রকাশ্যে মেসির সাম্রাজ্য ছেড়ে নিজের আলোয় আলোকিত হওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু নিয়তির পরিহাস, সেই রেকর্ড গড়া দলবদলই নেইমারের ক্যারিয়ারকে আলোকিত করার বদলে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিল। বদলে দিল ক্যারিয়ারের গতিপথ। যে মেসির ছায়া থেকে তিনি বেরোতে চেয়েছিলেন, সেই মেসি পরবর্তীতে জিতেছেন বিশ্বকাপ, টানা দুটি কোপা আমেরিকা এবং রেকর্ড আটটি ব্যালন ডি’অর! চলতি বিশ্বকাপেও শিরোপার অন্যতম দাবিদার লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা। অন্যদিকে নেইমারের প্রাপ্তির খাতাটা শেষ পর্যন্ত ভিজল চোখের জলে। নিয়তি দুজনকে দাঁড় করিয়ে দিল দুই মেরুতে, যার একপাশে সাফল্য অন্যপাশে শুধুই হাহাকার। ব্রাজিলের গত এক দশকের ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন ছিলেন নেইমার। কিন্তু ক্যারিয়ারের শেষভাগে ইনজুরি তার পিছু ছাড়েনি। বিশেষ করে পিএসজিতে যোগ দেওয়ার পর থেকে তিনি মাঠের চেয়ে মাঠের বাইরেই ছিলেন বেশি সময়। পিএসজিতে টিকতে না পেরে চলে যান সৌদি আরবের আল নাসরে। কিন্তু মাসের পর মাস মাঠের বাইরে থাকা খেলোয়াড়কে আল নাসরও রাখতে চায়নি। বাধ্য হয়ে নিজ দেশের ক্লাব সান্তোসে যোগ দেন। সেখানেও মাঠের চেয়ে মাঠের বাইরেই বেশি থেকেছেন। এমন আনফিট নেইমারকে বিশ্বকাপের দলেই নিতে চাননি কার্লো আনচেলত্তি। কিন্তু সমর্থকদের চাপে শেষ পর্যন্ত বাধ্য হন। বিশ্বকাপ দলে ডাক পেলেও আনচেলত্তি তাকে মূল পরিকল্পনায় রাখেননি। ডান পায়ের কাফ ইনজুরিতে আক্রান্ত নেইমার চলতি বিশ্বকাপে ব্রাজিলের খেলা পাঁচ ম্যাচের মধ্যে মাত্র দুইটিতে মাঠে নেমেছিলেন। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বে মাত্র ১৫ মিনিট খেলেছিলেন। নরওয়ের বিপক্ষেও বদলি হিসেবে ৬৭ মিনিটে মাঠে নামেন। ইনজুরি টাইমে পেনাল্টি থেকে গোল করে ব্রাজিলের ব্যবধান কমালেও সেটা কেবল সান্ত্বনাই হয়ে রইল। ১৩০ ম্যাচে নেইমারের গোলসংখ্যা হলো ৮০, যা ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসে সর্বোচ্চ। অ্যাসিস্ট করেছেন ৫৮টি। সিনিয়র জাতীয় দলের হয়ে তার একমাত্র ট্রফি ২০১৩ সালের কনফেডারেশন্স কাপ। ২০১৬ রিও অলিম্পিকে সোনা জিতলেও সেটি ছিল অনূর্ধ্ব-২৩ দলের হয়ে। ব্রাজিলিয়ান এই সুপারস্টার চারটি বিশ্বকাপ (২০১৪, ২০১৮, ২০২২, ২০২৬) খেললেও একবারও ট্রফি ছুঁয়ে দেখতে পারেননি। বরং ব্রাজিলের ইতিহাসে থিয়াগো সিলভার পর দ্বিতীয় খেলোয়াড় হিসেবে চার বিশ্বকাপে অংশ নিয়েও শূন্য হাতে ফেরার এক বেদনাবিধুর কীর্তি গড়েলেন। মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ম্যাচ শেষে স্ত্রী ও সন্তানের বুকে মাথা রেখে কান্নায় ভেঙে পড়লেন। সতীর্থদের স্বান্ত্বনায় কিছুটা ধাতস্থ হয়ে মিডিয়ার সামনে এসে বলে দিলেন, ‘আমি চেষ্টা করেছি, অনেক চেষ্টা করেছি। কিন্তু এখন সব শেষ। যেখানে আমার শুরু হয়েছিল, আজ সেখানেই শেষ করলাম।’ নেইমারের বিদায়ের এই করুণ সুর হৃদয় বিদীর্ণ করেছে পৃথিবীর আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা সেলেসাও ভক্তদের। বার্সেলোনার জার্সিতে যে ফুটবল জাদুকরের উত্থান হয়েছিল অপ্রতিরোধ্য গতিতে, পিএসজিতে গিয়ে সেই প্রতিভার ধার যেন ক্রমশ ম্লান হতে শুরু করে। ২০১০ সালের ১০ আগস্ট মেটলাইফ স্টেডিয়ামে যার হাত ধরে ব্রাজিল তাদের হেক্সা মিশনের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল, সেই চেনা মাঠেই রিক্ত হস্তে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় বললেন নেইমার। শেষ হলো ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের এক ট্র্যাজিক উপাখ্যান।







