ফরাসি সুগন্ধ না স্প্যানিশ ছন্দ
ফ্রান্সের অপ্রতিরোধ্য আক্রমণ স্পেনের দুর্ভেদ্য রক্ষণ

আক্রমণে ঢেউ তুলে প্রতিপক্ষকে দুমড়ে-মুচড়ে দিচ্ছে ফ্রান্স। তিকিতাকায় মুগ্ধ করা স্পেন সেমিফাইনালে পৌঁছেছে শুধু এক গোল হজম করে। দুই দলের বিশ্বকাপ সেমিফাইনালটা তাই অপ্রতিরোধ্য আক্রমণভাগের সামনে দুর্ভেদ্য রক্ষণ প্রাচীরের লড়াই!
আজ জিতলেই টানা তৃতীয়বার ও সর্বশেষ আট বিশ্বকাপে পাঁচবারই ফাইনালের টিকিট পাবে ফ্রান্স। এই স্বপ্নপূরণে পথ আগলে দাঁড়াতে পারে স্পেনই। লা রোহারা গত ইউরো আর নেশনস লিগে রোমাঞ্চকর ম্যাচে বুক ভেঙেছিল ফ্রান্সের। তাহলে বিশ্বকাপে নয় কেন? সেই বাস্তবতাই স্মরণ করালেন স্পেনের বাজির ঘোড়া লামিন ইয়ামাল, ‘হয় ফ্রান্স টানা তিনবার বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলবে, নয়তো আমরা টানা তৃতীয়বার ওদের হারাব। ফ্রান্সকে ভয় পাই না আমরা।’
গত ইউরো সেমিফাইনালে ফ্রান্সকে ২-১ গোলে হারিয়েছিল স্পেন। গত বছর উয়েফা নেশনস লিগের ৯ গোলের রোমাঞ্চকর ম্যাচেও ফরাসিদের তারা হারিয়েছিল ৫-৪-এ। ইউরোয় মিউনিখের সেই ম্যাচে ফ্রান্সের একাদশের সাতজন থাকতে পারেন ডালাসে আজকের ম্যাচেও। তবে ইউরোর ফ্রান্স আর বিশ্বকাপের ফ্রান্স এক নয়। তখন নিজেদের চেনা ছন্দ হাতড়ে বেড়াচ্ছিল দিদিয়ের দেশমের দল। প্রথম ম্যাচেই নাক ভেঙে যাওয়ায় স্বাচ্ছন্দ্যে ছিলেন না এমবাপ্পে। আন্তোয়ান গ্রিজমান ছিলেন নিজের ছায়া। চেনা ছন্দে না থেকেও ফ্রান্স কোনোমতে টিকিট পেয়েছিল শেষ চারের।
এবারের বিশ্বকাপে কিলিয়ান এমবাপ্পে ৮ ও উসমান দেম্বেলে করেছেন ৫ গোল। মাঝমাঠ ও আক্রমণভাগের মধ্যে দারুণ সৃজনশীলতা আর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখছেন মাইকেল ওলিসে। ব্র্যাডলি বারকোলা, দেজিরে দুয়েরা গতি বাড়াচ্ছেন আক্রমণের। ফ্রান্স বল ছাড়াও যেমন গোছানো ফুটবল খেলছে, তেমনি বল পায়েও শানাচ্ছে বৈচিত্র্যময় আক্রমণ। তারা দ্রুতগতিতে আক্রমণ করতে পারে, আবার প্রয়োজনে খেলার গতিও কমিয়ে দিতে পারে। কোনোরকম অস্বস্তি ছাড়া দীর্ঘক্ষণ রক্ষণও সামলাতে পারে।
ফ্রান্সের এই ভারসাম্যের আসল পরীক্ষা স্পেনের বিপক্ষে। নিখুঁত পাসিংয়ে ফ্রান্সকে বল থেকে বঞ্চিত রাখার ক্ষমতা আছে তাদের। অনেকটা সময় ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ রেখে হঠাৎ ডি-বক্সের ভেতর আক্রমণ চালিয়ে গোল করার সামর্থ্যও বারবার দেখিয়েছে স্পেন।
লামিন ইয়ামাল হ্যামস্ট্রিংয়ের চোট নিয়ে টুর্নামেন্ট শুরু করলেও এখন আবার নিজের চেনা ছন্দে। তার জাদু যেকোনো সময় বদলে দিতে পারে ম্যাচের গতিপথ। আর লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল সেই চেনা দলীয় দর্শনে খেলছে, যা তাদের ইউরো জিতিয়েছিল। তারা বলের দখল শুধু গোল করার জন্যই রাখে না, বরং প্রতিপক্ষকে চেপে ধরতে আর নিজেদের রক্ষণভাগকে সুরক্ষিত রাখতেও ব্যবহার করে। পুরো টুর্নামেন্টে মাত্র একটি গোল হজমই বোঝায় স্পেনের রক্ষণ ভেদ করা কতটা কঠিন। অবশ্য কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়াম দেখিয়ে দিয়েছে, স্পেনের শুরুর দিকের প্রেসিং এড়িয়ে মাঝমাঠের পেছনের ফাঁকা জায়গা ব্যবহার করতে পারলে তাদের বিপাকে ফেলা সম্ভব। সেই সুযোগটি কাজে লাগাতে ফ্রান্সের চেয়ে উপযুক্ত দল কমই আছে।
এমবাপ্পের গতির জন্য স্পেনের ডিফেন্ডাররা রক্ষণভাগকে খুব বেশি ওপরে তুলে খেলতে সাহস পাবে না। উইং ধরে দেম্বেলের আক্রমণ করার ক্ষমতা বিভ্রান্তিতে ফেলতে পারে স্পেনকে। ওলিসে তো মাঝমাঠে বলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে হুট করে যেভাবে আক্রমণের গতি বাড়ান, সেটা সামলানো যেকোনো দলের জন্য কঠিন।
১৯৯৮, ২০০৬, ২০১৮ ও ২০২২ সালে বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলেছে ফ্রান্স। স্পেনকে হারালে সর্বশেষ আট বিশ্বকাপের পাঁচটিতেই খেলবে ফাইনাল। ১৯৯৪ থেকে ২০০২ সালে টানা তিনটি বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলেছিল ব্রাজিল। টানা তিন ফাইনাল খেলার হাতছানি ফ্রান্সেরও। দলের এই ধারাবাহিকতার মূল কৃতিত্ব কোচ দিদিয়ের দেশমের। ২০১৮ সালের চ্যাম্পিয়ন ফরাসি দলটির মূল শক্তি ছিল শক্তিশালী রক্ষণভাগ ও প্রতিআক্রমণ। ২০২২ সালের রানার্সআপ ফ্রান্স অনেকটাই নির্ভরশীল ছিল এমবাপ্পের ওপর। আর এবারের দলটির গভীরতা অনেক বেশি।
কিংবদন্তি থিয়েরি অঁরির হাত ধরে অলিম্পিকে দুর্দান্ত খেলেছিলেন দেজেরি দুয়ে, মাইকেল ওলিসেরা। গ্রিজমান, জিরু, পাভার্দ এবং কোমানরা অবসর নিলে কোচ দেশম আস্থা রাখেন সেই অলিম্পিক দলের খেলোয়াড়দের ওপর। তাদের নিয়ে ৪-৩-৩ ফরমেশন থেকে ধীরে ধীরে আরও আক্রমণাত্মক ৪-২-৩-১ ফরমেশনে যান দেশম। গত নেশনস লিগে প্রথমবার দেম্বেলে, ওলিসে, দুয়ে আক্রমণভাগে এমবাপ্পের ঠিক পেছনে একসঙ্গে খেলার সুযোগ পান। স্পেনের বিপক্ষে এই চারজনই থাকতে পারেন শুরুর একাদশে। এতদিনে রক্ষণেও উন্নতি করেছে ফ্রান্স। শেষ পাঁচ ম্যাচে তাদের জালে বল জড়িয়েছে শুধু একটি।
ফ্রান্সের এই ভীতি জাগানিয়া পারফরম্যান্স থামাতে পারে স্পেনের নিয়ন্ত্রিত ফুটবল। পুরো বিশ্বকাপ জুড়ে তারা প্রতিপক্ষকে সবচেয়ে কম শট নেওয়ার সুযোগ দিয়েছে এবং তাদের গোলমুখে সবচেয়ে কম আক্রমণ হয়েছে। আজ ডালাসে তাই দুর্দান্ত সেমিফাইনালের অপেক্ষায় পুরো ফুটবলবিশ্ব।




