কিংবদন্তিদের পথে বেলিংহাম

জুড বেলিংহাম
বিশ্বকাপ কখনো হয়ে ওঠে কোনো এক তারকার জাদু দেখানোর মঞ্চ। সেই জাদুতে সোনালি ট্রফিটি নিজের করে নেয় কোনো দেশ। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার ডিয়েগো ম্যারাডোনা, ২০০২-এ ব্রাজিলের রোনালদো কিংবা ২০২২ সালে সেই মায়াঞ্জন এঁকেছিলেন আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসি। ইংল্যান্ডের হয়ে জুড বেলিংহামও করে চলেছেন এই কিংবদন্তিদের মতোই অবিশ্বাস্য সব কীর্তি।
মায়ামির তপ্ত চুল্লির মতো গরমে নরওয়ের বিপক্ষে বেলিংহাম ইংল্যান্ডকে উদ্ধার করেছেন জোড়া গোল করে। ম্যাচের ৩৬ মিনিটেই পিছিয়ে পড়েছিল ইংল্যান্ড। এরপর বিরতির আগে সমতা ফেরান বেলিংহাম। ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে গড়ালে তার ৯৩ মিনিটের গোলে ২-১ ব্যবধানের জয়ে সেমিফাইনাল নিশ্চিত হয় ইংল্যান্ডের। শেষ ষোলোয় মেক্সিকোর বিপক্ষেও জোড়া গোল করেছিলেন বেলিংহাম। বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে নকআউটে দুই বা বেশি গোল করা খেলোয়াড়ের ৭ জনের সংক্ষিপ্ত তালিকায়ও নাম তুললেন তিনি।
বেলিংহামের আগে এই কীর্তি করেছিলেন ১৯৩৮ বিশ্বকাপে ইতালির সিলভিও পিওলা, ১৯৫৪-তে হাঙ্গেরির স্যান্দর ককসিস, ১৯৫৮ সালে ব্রাজিলের পেলে, ১৯৬২-তে গারিঞ্চা, ১৯৮৬ সালে ডিয়েগো ম্যারাডোনা আর ২০২২ সালে ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে।
পিওলা কোয়ার্টার ফাইনাল ও ফাইনালে করেছিলেন ২ গোল। ককসিস কোয়ার্টার ফাইনালে ব্রাজিলের বিপক্ষে দুটি এবং সেমিফাইনালে উরুগুয়ের বিপক্ষে করেন দুই গোল। পেলে সেমিফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে তিনটি ও ফাইনালে সুইডেনের বিপক্ষে করেন দুই গোল। গারিঞ্চা কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দুটি ও সেমিফাইনালে চিলির বিপক্ষে করেন আরও দুই গোল।
১৯৮৬ সালের কোয়ার্টার ফাইনালে ম্যারাডোনা ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দুটি ও সেমিফাইনালে বেলজিয়ামের বিপক্ষেও করেন জোড়া গোল। এমবাপ্পে ২০২২ বিশ্বকাপে শেষ ষোলোয় পোল্যান্ডের বিপক্ষে দুটি ও ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে করেন হ্যাটট্রিক। এমবাপ্পের পর বেলিংহামই প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে জোড়া গোল করলেন দুটি আলাদা নকআউট ম্যাচে। পাশাপাশি ২৩ বছর বয়সে বেলিংহাম এই কীর্তি গড়া দ্বিতীয় সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড়। তার চেয়ে কম বয়সে (১৭ বছর বয়সে) ১৯৫৮ সালে সুইডেন বিশ্বকাপে ব্রাজিলের হয়ে এই কীর্তি গড়েছিলেন একমাত্র পেলে।
ইংল্যান্ডের যখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তখনই জ্বলে ওঠেন বেলিংহাম। ইংল্যান্ডের হয়ে তার ১২ গোলের ৯টিই বড় টুর্নামেন্টে। এর পাঁচটি গোল ইংল্যান্ডকে লিড এনে দিয়েছে আর দুটি গোল ছিল সমতা ফেরানোর
নরওয়ের বিপক্ষে ইংল্যান্ডের ২-১ গোলের জয়ে অবশ্য খুশিতে ভাসছেন না কোচ টমাস টুখেল, ‘আমরা নিজেদের জন্য পরিস্থিতি খুব, খুব কঠিন করে তুলেছিলাম। শেষ চারে যেতে পারার অনুভূতি দুর্দান্ত, কিন্তু আমি এমন পারফরম্যান্সে খুশি নই। মাঠে খেলোয়াড়দের নিবেদনে কোনো কমতি ছিল না। কিন্তু আমরা যেভাবে খেলেছি, তাতে আমি সন্তুষ্ট নই। আমরা নিরাপদ ফুটবল খেলার চেষ্টা করেছি, যথেষ্ট আক্রমণাত্মক মনোভাব দেখাইনি। আমরা ভাগ্যবান ছিলাম।’
টুখেলের সঙ্গে অবশ্য একমত নন বেলিংহাম। ম্যাচ শেষে তিনি বললেন, ‘হয়তো আর্লিং হলান্ড, নুসা, সরলথদের মতো খেলোয়াড়দের বিপক্ষে এ ধরনের পরিস্থিতিতে খেলার জন্য কী প্রয়োজন, তা তিনি (কোচ) জানেন না। এই দলটির বিপক্ষে খেলা মোটেও সহজ কাজ নয়। আমার মনে হয়, আমরা একটি ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা করেছি এবং আমাদের উচিত সেমিফাইনালেও সেটি ধরে রাখা।’
নরওয়ের বিপক্ষে জোড়া গোল ছাড়াও বেলিংহাম একাই পাঁচটি শট নিয়েছিলেন, যা যেকোনো ইংলিশ খেলোয়াড়ের মধ্যে সর্বোচ্চ। এ ছাড়া প্রতিপক্ষের বক্সে সবচেয়ে বেশি বল স্পর্শ (ছয়বার), সবচেয়ে বেশি ডুয়েল জয় (আটবার) এবং ফাউল আদায়ের (চারবার) তালিকায়ও শীর্ষে বেলিংহাম।
২০২৪ ইউরোয় শেষ ষোলোর ম্যাচে ঘড়ির কাঁটায় ৯৪ মিনিট ৩৪ সেকেন্ড, তখন এক দুর্দান্ত ওভারহেড কিকে গোল করে দলকে স্লোভাকিয়ার কাছে লজ্জাজনক হারের হাত থেকে বাঁচিয়েছিলেন বেলিংহাম। গোলটি উদযাপনের সময় ইংলিশ সমর্থকদের উদ্দেশে তার সেই বিখ্যাত উক্তি ‘হু এলস?’ বা আমি ছাড়া আর কে— এখনো সবার মনে আছে। এরপর অতিরিক্ত সময়ে জয় পেয়েছিল ইংল্যান্ড।
ইংল্যান্ডের যখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তখনই জ্বলে ওঠেন বেলিংহাম। ইংল্যান্ডের হয়ে তার ১২ গোলের ৯টিই বড় টুর্নামেন্টে। এর পাঁচটি গোল ইংল্যান্ডকে লিড এনে দিয়েছে, আর দুটি গোল ছিল সমতা ফেরানোর। আর নিজের জাত চেনাতে এই বিশ্বকাপে আর্লিং হলান্ডের পর একমাত্র তিনিই বাঁ পা, ডান পা এবং হেডে করেছেন গোল।
মেক্সিকো সিটিতে ৩-২ ব্যবধানের জয়ে জোড়া গোলের পর নরওয়েকে বিদায় করা ম্যাচে আরও দুই গোল করে বেলিংহাম আবারও বললেন, ‘আমি ছাড়া আর কে’— তাহলে খুব বাড়াবাড়ি হবে কি?




