সাফ ফুটবল
বদলে যাওয়া শ্রীলঙ্কাকে সমীহ করতেই হবে

ঘরের মাঠে বাংলাদেশের ২৩ বছরের আক্ষেপ ঘুচানোর সুযোগ কাজে লাগাতে প্রথমে পেরুতে হবে গ্রুপ পর্বের বাধা। ৫ নভেম্বর ভুটানের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে শুরু হবে স্বাগতিকদের অভিযান। এরপর ১১ নভেম্বর প্রতিপক্ষ শ্রীলঙ্কা। আপাতদৃষ্টে সহজ মনে হলেও গ্রুপের দুই প্রতিপক্ষই ভোগাতে পারে বাংলাদেশকে। বিশেষ করে শ্রীলঙ্কা ছুড়ে দিতে পারে বড় চ্যালেঞ্জ। আট বছর পর স্বাগতিক হওয়া বাংলাদেশকে শুরু থেকেই পেরুতে হবে কঠিন পথ।
বদলে যাওয়া শ্রীলঙ্কা
১৯৯৫ সাফ জিতলেও ফুটবলে শ্রীলঙ্কা কখনোই দক্ষিণ এশিয়ার পরাশক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি। বিশেষ করে বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের মনে রাখার মতো তেমন কোনো স্মৃতি নেই। তবে ২০২৪ সালে কুয়েতি কোচ আব্দুল্লাহ আল-মুতাইরি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই একটু একটু করে বদলে যেতে শুরু করে তারা। তবে তার আগে থেকেই শ্রীলঙ্কা বংশোদ্ভুত ফুটবলারদের দেশে এনে খেলাতে শুরু করে। ২০১৯ সালে ওয়াসিম রিজিক প্রথম বংশোদ্ভুত ফুটবলার হিসেবে শ্রীলঙ্কা জাতীয় দলে প্রতিনিধিত্ব করেন। এই ফরোয়ার্ডের দেখাদেখি পরবর্তীতে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা ফুটবলাররা শ্রীলঙ্কাকে প্রতিনিধিত্ব করেন। সাম্প্রতিক সময়ে আল-মুতাইরির স্কোয়াডে বংশোদ্ভুত ফুটবলারদের সংখ্যাই অনেক বেশি। সাফের স্কোয়াডেও ১০জন বংশোদ্ভুত ফুটবলার আছেন।
২০২৫ ও ২০২৬ সালে আল-মুতাইরিরঅধীনে শ্রীলঙ্কা চমকপ্রদ পারফরম্যান্স করেছে। ২০২৫ সালে ১১টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে ৬টিতে জয়, একটিতে ড্র ও ৪ ম্যাচে হারে শ্রীলঙ্কা। গত বছর এশিয়ান কাপের বাছাইয়ে তারা লাওস, ব্রুনেই, চাইনিজ তাইপেকে হারায়। ২০২৬ সালে ফের তারা চাইনিজ তাইপেকে হারানোর পর প্রীতি ম্যাচে সিশেলসকে দুই বার ও মরিশাসকে একবার হারানোর কৃতিত্ব দেখায়। অক্টোবরে পাওয়া এই জয়গুলো শ্রীলঙ্কাকে সাফে বড় স্বপ্ন দেখাচ্ছে।
বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কার তুলনা
বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কা দুইরকম দল নিয়ে খেলছে। থমাস ডুলির বাংলাদেশ দল গড়ে উঠেছে দেশীয় ক্লাব ফুটবলে অভিজ্ঞ খেলোয়াড় আর ইউরোপ থেকে আসা বড় মাপের তারকাদের নিয়ে। অন্যদিকে আল-মুতাইরির শ্রীলঙ্কা দলটি গড়ে উঠেছে ইউরোপ ও বিভিন্ন দেশের ছোট লিগে খেলা প্রবাসী খেলোয়াড়দের ওপর আস্থা রেখে।
গোলরক্ষক
বাংলাদেশ: মিতুল মারমা, মেহেদী হাসান শ্রাবণ।
শ্রীলঙ্কা: সুজন পেরেরা।
শ্রীলঙ্কার সুজন পেরেরা অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বগুণে অনেক এগিয়ে। দীর্ঘদিন ধরে খেলছেন ফর্টিস এফসিতে। তাই বাংলাদেশের ফুটবল সম্পর্কে প্রায় সবকিছুই জানা। এই জায়গায় সুজন পেরেরা বাংলাদেশের জন্য ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারেন। বাংলাদেশের মিতুল মারমা ও মেহেদী হাসান শ্রাবণ দুজনই বেশ চটপটে হলেও চাপের মুখে ছোটখাটো ভুল করার অভ্যাস আছে। কিছুদিন আগেই প্রধান গোলকিপার হিসেবে ধরা হতো মিতুলকে। তবে শ্রাবণেরও ভালো সুযোগ রয়েছে খেলার। এখানে অভিজ্ঞ আনিসুর রহমান জিকোর না থাকাটা ভোগাতে পারে বাংলাদেশকে।
ডিফেন্ডার
বাংলাদেশ: তপু বর্মণ, তারিক কাজী, বিশ্বনাথ ঘোষ, মো. সাদ উদ্দিন।
শ্রীলঙ্কা: ক্লদিও কামার্কনেখট, জেসন থায়াপরান, জাহি অ্যাডিস, উইলিয়াম থমাসন
শ্রীলঙ্কার রক্ষণভাগে ইউরোপের বিভিন্ন দলে খেলা খেলোয়াড়রা আছেন, যার মূল দায়িত্বে আছেন ক্লদিও কামার্কনেখট । বাংলাদেশ দল তারিক কাজী ও তপু বর্মণের অভিজ্ঞতা দিয়ে এই ঘাটতি পোষানোর চেষ্টা করছে। এদের সঙ্গে থাকছেন বিশ্বনাথ, সাদউদ্দিনের মতো পরীক্ষিত উইং ব্যাক ও জিদান ইউসুফের মতো তরুণ সেন্টারব্যাক।
মিডফিল্ডার
বাংলাদেশ: হামজা চৌধুরী, জামাল ভূঁইয়া, সোহেল রানা, শেখ মোরসালিন, শমিত সোম।
শ্রীলঙ্কা: গ্যারেথ কেলি, বারাথ সুরেশ, লিওন পেরেরা, আধারন রাজামোহন
হামজা চৌধুরীর মতো প্রিমিয়ার লিগের খেলোয়াড় যোগ দেওয়ায় বাংলাদেশের মাঝমাঠ অনেক শক্তিশালী হয়েছে। সঙ্গে জামাল ভূঁইয়ার নেতৃত্ব, সোহেল রানার অভিজ্ঞতা, শেখ মোরসালিনের বৈচিত্রতা আর শমিত সোমের পাসিং অ্যাকিউরিসি শ্রীলঙ্কার মাঝমাঠের চেয়ে বাংলাদেশকে এগিয়ে রাখবে।
ফরোয়ার্ড
বাংলাদেশ: রকিব হোসেন, ফয়সাল আহমেদ ফাহিম, রোনান সুলিভান, ফারহান আলী ওয়াহিদ।
শ্রীলঙ্কা: ডিলন ডি সিলভা, ওয়েড ডেকার, রাহুল সুরেশ, ওয়াসিম রাজিক।
শ্রীলঙ্কার আক্রমণভাগ বেশ গতিশীল। ডিলন ডি সিলভা ও ওয়েড ডেকার দারুণ গতি দিয়ে প্রতিপক্ষের দুর্বল রক্ষণভাগ সহজে ভেঙে ফেলতে পারেন। বাংলাদেশ মূলত উইংয়ে রাকিব হোসেনের গতির ওপর বেশি ভরসা করে। ফাহিমও উইং প্লেয়ার। এবার দেখার ফারহান আলী ওয়াহিদ, রোনান সুলিভান, মাহি খানরা রাকিব-ফাহিমের জোগান দেওয়া বলের কতটা সদ্ব্যবহার করতে পারেন।
শ্রীলঙ্কার কিছু দুর্বলতা
আল-মুতাইরির অধীনে সাম্প্রতিক সময়ে ভালো খেললেও শ্রীলঙ্কার কিছু কৌশলগত ও গঠনগত সমস্যা থেকেই গেছে। ধীরগতিতে শুরু তাদের অন্যতম সমস্যা। ম্যাচের শুরুতে গুছিয়ে উঠতে অনেক সময় লাগে। ফলে শক্তিশালী প্রতিপক্ষরা এর সুযোগ সহজেই নিতে পারে। যেহেতু দলটি দ্বিতীয়ার্ধে তুলনামূলক ভালো ও আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলে অভ্যস্ত, সে সময় হাই প্রেস করার ফলে তাদের রক্ষণভাগে একেবারেই অরক্ষিত হয়ে
পড়ে। ফলে কাউন্টার অ্যাটাকে তাদের গোল হজমের হার বেশি। অতিমাত্রায় প্রবাসী নির্ভরতাও তাদের বড় সমস্যা। ক্লদিও কামার্কনেখট বা ডিলন ডি সিলভার মতো খেলোয়াড়েরা বাইরে থেকে এসে দলের মান বাড়ালেও স্থানীয়দের সঙ্গে অনুশীলনের কম সুযোগ পাওয়ায় দলে সমন্বয় কিছুটা ঘাটতি থাকছে।
ম্যাচের শেষ দিকে দলটির রক্ষণভাগে ক্লান্তি ভর করার প্রবণতা দেখা গেছে শেষ কয়েকটি ম্যাচে। ক্লান্তির কারণে তারা পজিশন ঠিক রাখতে পারছে না এবং জেঞ্জার জোনে অপ্রয়োজনীয় ফাউল করে বিপদ ডেকে আনছে। প্রবাসীরা আসায় একাদশটা শক্তিশালী হলেও এখনো সাইড বেঞ্চ ততটা শক্তিশালী হয়নি। বিশেষ করে মূল সেন্টারব্যাক বা ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডাররা চোটে পড়লে বা কার্ডের কারণে বাদ পড়লে বেঞ্চ থেকে শূন্যস্থান পূরণের মতো সে মানের ফুটবলার তাদের নেই। দুই দেশের সর্বশেষ সাক্ষাতে বাংলাদেশ হেরেছিল ২-১ গোলে। ২০২১ সালে কলম্বোতে চারজাতি টুর্নামেন্টে স্বাগতিকদের হারাতে পারেনি বাংলাদেশ। পাঁচ বছর পরের শ্রীলঙ্কা বাংলাদেশের কাছে অনেকটাই অজানা। সেই বদলে যাওয়া প্রতিপক্ষকে হারাতে না পারলে বড় খেসারত দিতে হতে পারে হামজাদের।



