তিন দেশের সুতোয় গাঁথা কীর্তি

তার সামনে সুযোগ ছিল তিন দেশের হয়ে খেলার। কোন দেশের হয়ে খেলবেন, এ নিয়ে বেশ ভাবতে হয়েছে। অনেক ভেবে ফোলারিন বালোগান বেছে নিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রকেই। তাদের হয়ে বিশ্বকাপ অভিষেকেই গড়লেন রেকর্ড। ষষ্ঠ ফুটবলার হিসেবে বিশ্বকাপে নিজের অভিষেক ম্যাচে জোড়া গোল করে প্যারাগুয়ের বিপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রকে এনে দিয়েছেন ৪-১ ব্যবধানের বড় জয়। অথচ বিশ্বকাপ বাছাই পর্বে এই প্যারাগুয়ে হারিয়েছিল ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনাকে।
লস অ্যাঞ্জেলেসে ম্যাচের শুরু থেকেই দাপট দেখিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ৭ মিনিটের মাথায় বোবাদিলার আত্মঘাতী গোলে লিড নেয় স্বাগতিকরা। এরপর প্রথমার্ধেই দুই গোল করে দলের জয়ের পথ সুগম করেন বালোগান। ৩১ ও ৪৫তম মিনিটে গোল করে রেকর্ড গড়েন এই ফরোয়ার্ড। দ্বিতীয়ার্ধে অবশ্য এক গোল হজম করে স্বাগতিকরা। শেষ বাঁশি বাজার আগে আরও এক গোল করলে শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র পায় ৪-১ ব্যবধানের জয়। যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত ফুটবলার ক্লদিও রেইনার ছেলে জিওভানি রেইনা বদলি হিসেবে নেমে ডান পায়ের অসাধারণ ট্রিভেলা গোলে চমকে দেন রীতিমতো। বড় জয়ের পরও যুক্তরাষ্ট্রের অস্বস্তি পুলিসিচের বিরতির পর চোটের জন্য মাঠ ছেড়ে যাওয়া।
যুক্তরাষ্ট্রের এ বড় জয়ের দিন মাঠে উপস্থিত ছিলেন না মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ম্যাচের আগে অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র দলের জন্য বার্তা পাঠিয়েছিলেন ট্রাম্প। তার ফোন পেয়ে পচেত্তিনো বলেছিলেন, ‘সমর্থনের জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ, মিস্টার প্রেসিডেন্ট। আমরা এমন কিছুই করতে যাচ্ছি, যা আপনাকে আর এই দেশের মানুষকে গর্বিত করবে।’
যুক্তরাষ্ট্রকে গর্বিত করার মতো ফুটবলই খেলেছে যুক্তরাষ্ট্র। তাদের সুন্দর ফুটবলে ঘুম উড়ে যেতে পারে অনেক বড় দলের। এর অন্যতম নায়ক ফোলারিন বালোগান। তার বাবা-মা নাইজেরিয়ান। তারা ছিলেন লন্ডনের বাসিন্দা। ২০০১ সালে এই দম্পতি বেড়াতে গিয়েছিলেন নিউইয়র্কে। মা তখন সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা হওয়ায় নিরাপত্তাজনিত কারণে বিমান সংস্থা তাঁকে ভ্রমণের অনুমতি দেয়নি। সে বছর ৩ জুলাই নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে জন্ম হয় বালোগানের।
সেখানে অবশ্য বেশিদিন থাকা হয়নি। এক মাস পরই পরিবারসহ চলে যান ইংল্যান্ডে। সেখানেই বালোগানের বেড়ে ওঠা এবং ফুটবলের হাতেখড়ি। ইংল্যান্ডের বিভিন্ন বয়সভিত্তিক দলের হয়ে খেলেছেন তিনি। অনেকে ধরেই নিয়েছিলেন, ইংল্যান্ডের হয়ে তাকে বিশ্বমঞ্চে দেখা যাবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের অনূর্ধ্ব-১৮ দলের প্রতিনিধিত্বও করেন বালোগান।
নাইজেরিয়া, ইংল্যান্ড না যুক্তরাষ্ট্র— কোন দেশকে বেছে নেবেন বালোগান? ইংল্যান্ড স্কোয়াডে জায়গা পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। নাইজেরিয়া নেই এবারের বিশ্বকাপে। শেষ পর্যন্ত বালোগান তাই গায়ে জড়ালেন স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রের জার্সিই।
গতকাল প্যারাগুয়ের বিপক্ষে মাঠে নেমে বালোগান করেছেন জোড়া গোল। ১৯৩০ সালের পর প্রথম মার্কিন ফুটবলার হিসেবে এক বিশ্বকাপ ম্যাচে একাধিক গোল করলেন তিনি। কীর্তি গড়ে তিনি বলেছেন, ‘অসাধারণ মুহূর্ত। দারুণ একটি রাত এবং এমন কিছু যা আমি দীর্ঘদিন ধরে স্বপ্ন দেখে আসছিলাম। আমি যখন যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে খেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, তখন আমার মনের ভেতর বড় মঞ্চে খেলা ও ভক্তদের ভালোবাসার প্রতিদান দেওয়ার তীব্র ইচ্ছা ছিল। নিজেদের মাটিতে একটি বিশ্বকাপ... এটি আমার কাছে অনেক বড় কিছু। আমি দলের প্রত্যেকের জন্য গর্বিত। প্রথম ম্যাচের যে স্বাভাবিক স্নায়ুচাপ বা জড়তা থাকে, তা কাটিয়ে ওঠা এবং যেভাবে আমরা জয় দিয়ে শুরু করেছি, তা আমাদের জন্য অনেক বড় ব্যাপার।’
শুধু কি তাই, বালোগান করেছেন আরেকটি অনন্য রেকর্ড। ষষ্ঠ ফুটবলার হিসেবে বিশ্বকাপে নিজের প্রথম ম্যাচেই পেলেন জোড়া গোল। ১৯৩০ সালে নিজের প্রথম ম্যাচে মেক্সিকোর বিপক্ষে দুই গোল করেছিলেন ফ্রান্সে আন্দ্রে মাসচিনো। ১৯৩৪ বিশ্বকাপে জার্মানি হয়ে বেলজিয়ামের বিপক্ষে অভিষেকেই হ্যাটট্রিক পান এডমুন্ড কোনেন।
২০০৬ বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার তারকা ফুটবলার টিম কেহিল জাপানের বিপক্ষে দুই গোল করেছিলেন। একই আসরে চেক রিপাবলিকের হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে দুই গোল পান টমাস রোসিকি। ২০১৪ বিশ্বকাপে ক্যামেরুনের বিপক্ষে অভিষেকেই জোড়া গোল পান ক্রোয়েশিয়ার মারিও মানজুকিচ।
৩
বালোগানের সুযোগ ছিল ইংল্যান্ড নাইজেরিয়া আর যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে খেলার।
৬
ষষ্ঠ ফুটবলার হিসেবে বিশ্বকাপে অভিষেক ম্যাচে জোড়া গোল করেছেন বালোগান
৯৬
১৯৩০ বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্টের হয়ে জোড়া গোলের কীর্তি ছিল আন্দ্রে মাসচিনোর। ৯৬ বছর পর যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় খেলোয়াড় হিসেবে জোড়া গোল করলেন বালোগান


