বিশ্বকাপের আগে
ইংলিশরা আবারও গাইছে ‘ইটস কামিং হোম’

সংগৃহীত ছবি
‘ইটস কামিং হোম’। বিশ্বকাপ এলেই ইংল্যান্ড ফুটবল ভক্তদের মুখে শোনা যায় এই গান। বিশ্বকাপ তার আঁতুড়ঘরে ফিরবে, ফুটবলের জনক ফিরে পাবে তার হারানো গৌরব; প্রতি আসরেই বুকভরা আশা নিয়ে অপেক্ষায় থাকেন ইংলিশরা। তবে ৬০ বছর পেরিয়ে গেলেও সোনালি ট্রফির দেখা পায়নি ইংল্যান্ড। হ্যারি কেইন-জুড বেলিংহাম ম্যাজিকে বিশ্বকাপ ট্রফিকে কি ‘বাড়ি ফেরাতে’ পারবেন টমাস টুখেল?
দৃঢ় রক্ষণভাগ, প্রতিভাবান মিডফিল্ড, ভয়ংকর উইং আক্রমণ, অভিজ্ঞ স্ট্রাইকার; কী নেই এই ইংল্যান্ড দলে? ইউরোপসেরা ক্লাবে সেরা সব ফুটবলারকে নিয়েই সাজানো টুখেলের দল। কাগজে-কলমে ইংল্যান্ডকে এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা দলই মানা হচ্ছে।
কাগজে-কলমে অবশ্য গত কয়েক বিশ্বকাপেই সেরা স্কোয়াড হিসেবে মূল পর্বে পা রেখেছিল ইংলিশরা। তবে প্রতিবারই খালি হাতে ফিরতে হয়েছে তাদের। ১৯৬৬ সালে শেষবার বিশ্বকাপ ছুঁয়ে দেখা ইংল্যান্ড ওই আসরের পর এখন পর্যন্ত ফাইনালেই উঠতে পারেনি! সবশেষ ২০১৮ বিশ্বকাপে সেমিতে উঠেছিলেন কেইনরা। সেবার ক্রোয়েশিয়ার কাছে হেরে বিশ্বকাপ স্বপ্ন শেষ হয়ে যায় তাদের।
স্বপ্নের আবর্তন কেইন-বেলিংহামে ঘিরে
কেইন বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে ভাঙছেন একের পর এক রেকর্ড। আরেকজন রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে নিজেকে গড়ে তুলছেন বড় তারকা হিসেবে। কেইন ও বেলিংহাম জুটিই এবার ইংল্যান্ডের বড় ভরসা।
ইংল্যান্ডের ইতিহাসের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার মানা হয় হ্যারি কেইনকে। ফিনিশিং, পাসিং, পজিশনিং এবং সামনে থেকে দলকে নেতৃত্ব দেওয়া, সব মিলিয়ে গত কয়েক বছরে তিনি নিজেকে নিয়ে গেছেন অন্য উচ্চতায়।
সাফল্যের আশায় টটেনহাম ছেড়ে বায়ার্ন মিউনিখে পাড়ি জমিয়েছিলেন এই ইংলিশ স্ট্রাইকার। জার্মান ক্লাবে এসে ঘুচে গেছে তার শিরোপার আক্ষেপ। এখন বাকি দেশের হয়ে শিরোপা জেতার।
বায়ার্নের হয়ে এই মৌসুমে এখন পর্যন্ত ৪৯ ম্যাচে কেইনের গোল ৫৫। এবারে বিশ্বকাপ বাছাই পর্বেও ইংল্যান্ডের জার্সিতে তিনি ছিলেন সর্বোচ্চ স্কোরার। আট ম্যাচে গোল করেছেন আটটি।
৩২ বছর বয়সী স্ট্রাইকারকে ঘিরেই ইংলিশদের সব স্বপ্ন আবর্তিত হচ্ছে। কোচ টমাস টুখেল বেশ কয়েকবারই বলেছেন, ইংল্যান্ড যদি বিশ্বকাপ জেতে, তাহলে সেটা সম্ভব হবে কেইনের কারণেই। পাহাড়সমান চাপ নিয়ে তাই এবার যুক্তরাষ্ট্রে পা রাখবেন তিনি।
তাকে বল বানিয়ে দেওয়ার মূল দায়িত্ব যার, সেই জুড বেলিংহাম রিয়ালের হয়ে নিজের জাত চিনিয়েছেন আগেই। কাজ তার গোলের সুযোগ তৈরি করা। কিন্তু নিজেও পারেন গোল করতে। পায়ে-মাথায় তার গোলের অভ্যাস তো দেখেছি রিয়ালেই, তবে তার মূল কাজটা মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে খেলার মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া। কেইন বা দলের অন্য ফরোয়ার্ডের সঙ্গে সেই তালমিল হয়ে গেলে গোলের বড় উৎস হবেন বেলিংহাম।
যদিও এই মৌসুমটা তার রিয়ালে ভালো কাটছে না। ৩৫ ম্যাচে খেলে ছয় গোল ও পাঁচ অ্যাসিস্টের পরিসংখ্যানটা অবশ্যই তার মানের সঙ্গে যায় না। এজন্য ইনজুরি এবং রিয়ালের কোচিং ম্যানেজমেন্টও দায়ী বৈকি।
এই ভুল নিশ্চয়ই করবেন না টমাস টুখেল। ইংল্যান্ডের সেরা মিডফিল্ডারের সর্বোচ্চটা নিংড়ে নিয়ে কেইনের পায়ে গোলের সমারোহ দেখতে চাইবেন।
ইংলিশ রক্ষণেই আটকা প্রতিপক্ষ
এবার বাছাই পর্বে আট ম্যাচের আটটিতেই জিতেছে ইংল্যান্ড। প্রতিপক্ষের জালে ২২ গোল দিলেও অবিশ্বাস্যভাবে একটি গোলও হজম করেনি ইংলিশরা! ইংলিশ রক্ষণভাগ এমন খেললে, গোল না খাওয়ার ব্রত করলে ভুগতে হবে প্রতিপক্ষের ফরোয়ার্ডদের। আর অনুপ্রাণিত হবেন নিজের দলের ফরোয়ার্ডরা।
দুর্দান্ত এই রক্ষণের নেতৃত্বে আছেন ম্যানচেস্টার সিটি ডিফেন্ডার জন স্টোনস ও চেলসির রিস জেমস। এ দুই ডিফেন্ডারকে পেরিয়ে গোল করা প্রতিপক্ষের জন্য বেশ কঠিনই হবে।
স্টোনস-জেমসকে সঙ্গ দিতে স্কোয়াডে থাকতে পারেন জ্যারেল কুনশা, লুইস হল, টিনো লিভারমেন্টো ও এজরি কোনসারা।
মাঝমাঠের বৈচিত্র্য আনবে সাফল্য
ইংল্যান্ডের মাঝমাঠের মূল শক্তি বেলিংহাম। মাঠে রিয়াল মাদ্রিদ তারকার সবচেয়ে সঙ্গী আর্সেনালের ডেক্লান রাইস। বেলিংহামের মতো রাইসও বলের দখল নেওয়া, খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ ও ফরোয়ার্ডদের বল বানিয়ে দেওয়ায় দক্ষ কারিগর।
তাদের সঙ্গী হিসেবে দলে ডাক পেতে পারেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কোবি মাইনো, আর্সেনালের এবেরেচি এজে ও ক্রিস্টাল প্যালেসের অ্যাডাম ওয়ার্টন। খুব কম দলেরই আছে এমন চমৎকার রক্ষণভাগ। তাদের ম্যাচ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
আক্রমণভাগে কেইনের সঙ্গে অনেক তারা
গত কয়েক আসরের মধ্যে এবার সেরা আক্রমণভাগ নিয়ে বিশ্বকাপে যাচ্ছে ইংল্যান্ড। কেইনের সঙ্গী হিসেবে টুখেল তার দলে রাখতে পারেন আর্সেনালের বুকায়ো সাকা, সিটির ফিল ফোডেন, চেলসির কোল পালমার, বার্সার মার্কাস রাশফোর্ডকে। প্রত্যেকে নিজেদের জায়গায় দুর্দান্ত খেলছেন। মূল একাদশে কেইন, সাকা, ফোডেনের সঙ্গে কে থাকবেন, সে নিয়েই ভাবতে হতে পারে টুখেলকে।
সমস্যা হলো এত তারকার দ্যুতিতেও মিলছে না বিশ্বকাপ। চাপের মুখেই কি না কমে যায় তারার ঔজ্জ্বল্য। প্রতিবারের মতো এবারও এই ইংলিশ দলকে নিয়ে প্রত্যাশার পারদ তুঙ্গে। বাড়তি চাপের বোঝা নিয়ে খেলতে নেমে আবার খালি হাতে ফিরতে পারে ইংল্যান্ড, এমন শঙ্কা অনেকেরই।
সেই ১৯৬৬ সালে নিজেদের একমাত্র বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পেয়েছিল ইংল্যান্ড। ছয় দশকে বদলে গেছে ফুটবলের অনেক কিছুই। শুধু বদলায়নি তাদের ভাগ্য। প্রতিবারের মতো ভাগ্য বদলের মিশন নিয়ে এবারও যাচ্ছেন কেইনরা।







