এফবিআইয়ের গোপন নথি
মেসিকে বোমা মারার হুমকির তথ্য ফাঁস

বিশ্বকাপে মেসিকে বোমা মেরে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। ছবি: এআই
বোমা মেরে উড়িয়ে দেওয়া হবে! তা-ও আবার লিওনেল মেসিকে! অবিশ্বাস্য হলেও এমন খবর ফাঁস হয়েছে। এফবিআইয়ের গোপন নথির খবর প্রকাশ করেছে স্প্যানিশ একটি সংবাদমাধ্যম। তাতেই উঠে এসেছে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য।
সম্প্রতি এফবিআইয়ের তদন্তের একটি গোপন নিরাপত্তা নথির বরাত দিয়ে স্পেনের সংবাদমাধ্যম প্রেনসা ইবিরেকা জানিয়েছে, বিশ্বকাপ জুড়ে এসব ঘটনার ওপর নজর রেখেছিল যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআই ও আন্তর্জাতিক পুলিশ সহযোগিতা কেন্দ্র (আইপিসিসি)। নথিতে উঠে এসেছে টুর্নামেন্টের নিরাপত্তাব্যবস্থার নেপথ্যের বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য।
সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে ছিলেন মেসি
হুমকির তালিকায় সবচেয়ে বেশি আলোচিত নাম ছিল আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসি। টুর্নামেন্টের আগে এবং চলাকালে তাকে ঘিরে একাধিক গুরুতর নিরাপত্তা সতর্কতা তৈরি হয়।
আর্জেন্টিনা-জর্ডান ম্যাচের দিন ডালাস বিমানবন্দরে পুলিশকে ফোন করেন এক ব্যক্তি। তার দাবি ছিল, তিনি আরও দুজনকে নিয়ে হাতে তৈরি বোমা ও এআর-১৫ রাইফেল নিয়ে স্টেডিয়ামের দিকে যাচ্ছেন। পুলিশকে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, খেলোয়াড় ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলার পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছিল। সেখানে বিশেষভাবে মেসিকে লক্ষ করার কথাও উল্লেখ করা হয়।
ঘটনা আরও আছে
আর্জেন্টিনা-মিসর ম্যাচের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরও ভয়ংকর হুমকি দেওয়া হয়। সামাজিক যোগাযোগমধ্যমে এক্স অ্যাকাউন্টে একজন দাবি করেন, তিনি আটলান্টা স্টেডিয়ামে ঢুকে শরীরে বাঁধা বিস্ফোরক দিয়ে মেসিকে হত্যা করবেন।
ম্যাচ চলাকালীন স্টেডিয়ামের কয়েকটি ডাস্টবিনে বোমা থাকার খবরও আসে পুলিশের কাছে। পরে বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ ও প্রশিক্ষিত কুকুর দিয়ে পুরো স্টেডিয়ামে তল্লাশি চালানো হয়।
রোনালদোর পিছু নিয়েছিল ভক্ত ও সন্দেহভাজন ব্যক্তি,
মেসির মতোই নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগে ছিলেন পর্তুগিজ মহাতারকা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোও।
বিশ্বকাপের সময় এক সন্দেহভাজন ব্যক্তি রোনালদোর থাকার জায়গা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করছিলেন বলে পুলিশকে জানানো হয়। পরে হিউস্টনে পর্তুগাল দলের হোটেল থেকে ওই ব্যক্তিকে শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা হয়।
টরন্টোতেও এক ভক্ত রোনালদোর সঙ্গে একই লিফটে ওঠার চেষ্টা করেন। নিরাপত্তাকর্মীরা তাকে আটকে দেন। মায়ামিতেও রোনালদোর কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা হয়। এমনকি পর্তুগাল-ক্রোয়েশিয়া ম্যাচে এক দর্শক মাঠে ঢুকে পড়েন।
মাঠের ভুলেও ছাড় মেলেনি
বিশ্বকাপের সময় খেলোয়াড়দের জন্য বিপদ শুধু স্টেডিয়ামের বাইরের হুমকিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। মাঠে করা ভুলের প্রতিক্রিয়াতেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভয়ংকর হুমকি পেয়েছেন কয়েকজন।
সহজ সুযোগ নষ্ট করার পর নরওয়ের স্ট্রাইকার আলেকজান্ডার সরলথ ও তার স্ত্রীকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। পেনাল্টি মিসের পর কলম্বিয়ার জামিনটন ক্যাম্পাজও নিরাপত্তা নিয়ে সমস্যায় পড়েন।
স্পেন-ফ্রান্স ম্যাচে লামিনে ইয়ামালকে ফাউল করে পেনাল্টি দেওয়ার ঘটনায় ফরাসি ডিফেন্ডার লুকাস দিনিয়েও প্রাণনাশের হুমকি পান।
ফরাসি তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পেকেও ঘিরে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। প্যারাগুয়ের বিপক্ষে ম্যাচের ঘটনার পর দেশটিতে তার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। এমনকি তার প্রতিকৃতি পোড়ানোর ঘটনাও ঘটে এবং সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
রেফারির ফোনে হাজারো হুমকি
বিশ্বকাপের সবচেয়ে ভয়াবহ অনলাইন হয়রানির শিকারদের একজন ছিলেন ফরাসি রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ার।
আর্জেন্টিনা-মিসর ম্যাচ পরিচালনার পর তার ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে প্রায় ছয় হাজার হুমকিমূলক বার্তা পাঠানো হয়। বার্তাগুলোর বড় একটি অংশ এসেছিল মিসরীয় নাগরিকদের কাছ থেকে।
একই ম্যাচে ভিএআর দায়িত্বে থাকা ফরাসি রেফারি উইলি দেলাজোদও হুমকি পান। পরিস্থিতি গুরুতর হওয়ায় ফ্রান্সে তাদের বাড়ি ও পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তায় পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
বিদায়ের পরও নিরাপদ ছিল না দক্ষিণ কোরিয়া
বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের পর সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়ে দক্ষিণ কোরিয়া দল। কোচ হং মাইওং-বোসহ দলের সদস্যদের উদ্দেশে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়।
পরিস্থিতির কারণে বিমানবন্দর পর্যন্ত দলটিকে কঠোর পুলিশি নিরাপত্তার মধ্যে নিয়ে যেতে হয়।
ফুটবল বিশ্বকাপ শেষ পর্যন্ত কোটি কোটি মানুষের কাছে আনন্দ ও উৎসবের স্মৃতি হয়ে থাকলেও, প্রকাশ্যে আসা এসব নিরাপত্তা নথি দেখাচ্ছে—মাঠের বাইরের বাস্তবতা ছিল একেবারেই ভিন্ন।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফুটবল আসরের আলোয় যখন কোটি দর্শক মেতে ছিলেন, তখন সেই মঞ্চের আড়ালে নিরাপত্তাকর্মীদের মোকাবিলা করতে হয়েছে একের পর এক বোমা আতঙ্ক, হত্যার হুমকি ও তারকা খেলোয়াড়দের ঘিরে হয়রানির ঘটনা।




