রোনালদোই ছিলেন পর্তুগালের মুখ

সংগৃহীত ছবি
শেষ হল পর্তুগালে ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর অধ্যায়। নিজের দেশে রোনালদো শুধু একজন ফুটবলারই নন, তিনি বিশ্বমানের রাষ্ট্রদূত এবং লক্ষ লক্ষ পর্তুগীজের অনুপ্রেরণা। তারপরও যেভাবে রোনালদোর বিদায়টা হল, সেটা তেতো স্বাদ রেখে যায়।
রোনালদো কি পর্তুগালের স্কোয়াডে আর ডাক পেতেন? হয়তো পেতেন, কারণ কোচ জর্জ জেসুস বলেছিলেন দরজা খোলা আছে আর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার রোনালদোর ওপরই ছিল। তবে এটা ঠিক রোনালদো আর দলের অটোমেটিক চয়েজ ছিলেন না, আর রোনালদো এটি ভালোভাবে মেনে নেননি।
তাহলে কি অবসরটা জেদি সিদ্ধান্ত? আংশিকভাবে, হ্যাঁ।
কোচ যখনই তার জায়গা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, তিনি ঠিক সেভাবেই প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন যেভাবে অতীতে দেখিয়েছেন। পর্তুগালের ডাগআউটে বসা প্রায় প্রতিটি কোচের সঙ্গেই এমন ঘটনা কমবেশি দেখা গেছে। কোচদের সঙ্গে তার যেমন মতবিরোধ হয়েছে, তেমনি তাদের ও সতীর্থদের সঙ্গে এমন এক আত্মিক বোঝাপড়াও তৈরি হয়েছিল যা এই বিদায়কে বুঝতে সাহায্য করে।
কিশোর রোনালদো যখন প্রথম জাতীয় দলে যোগ দেন, তখন তিনি উল্টো করে বেসবল ক্যাপ পরে, বিশাল রোদচশমা চোখে আর জোরে হেডফোন বাজাতে বাজাতে ক্যাম্পে আসেন। লুইস ফিগো ও রুই কস্তার মতো সিনিয়র খেলোয়াড়দের সঙ্গে খাবার খাওয়ার সময়ও তিনি টুপি খুলতেন না। লুইস ফেলিপে স্কোলারি এমন একজন অসাধারণ খেলোয়াড়কে দেখতে পেয়েছিলেন যিনি ছিলেন অপরিপক্ব এবং নিজেকে জাহির করতে বেশি উদগ্রীব। তিনি সবার সামনে তাকে তিরস্কার করেন। পরে ব্যক্তিগতভাবে বলেন , নিজেকে বদলালে তিনি একদিন পর্তুগালের অধিনায়ক হবেন।
তার জীবনের প্রথম বড় হতাশাটি আসে দ্রুতই এবং নিজ দেশেই। মাত্র ১৯ বছর বয়সে লিসবনের এস্তাদিও দা লুজ স্টেডিয়ামে ইউরো ২০০৪-এর ফাইনালে খেলেছিলেন রোনালদো, যেখানে পুরো দেশ বিশ্বাস করেছিল ট্রফিটি তাদেরই ঘরে আসছে।
অপরিচিত গ্রীস সেই স্বপ্ন ভেঙে দেয়। ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজার পর রোনালদো আর নিজের চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি। সেই কান্নার দৃশ্য চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। এটা তার মধ্যে এমন এক জেদ তৈরি করেছিল যা আর কখনোই পুরোপুরি ফুরিয়ে যায়নি।
সেসময় ৭ নম্বর জার্সিটি পড়তেন ফিগো, তাই রোনালদোকে ১৭ নম্বর জার্সি গায়ে জড়াতে হয়। ফিগো তাকে মানিয়ে নিতে সাহায্য করেছিলেন, তবে ব্যাপারটি তিনি সহজও করে দেননি। ২০০৬ সালে ফিগো যখন জাতীয় দল ছেড়ে যান, তখন সেই জার্সিটি এবং পুরো দলটিই রোনালদোর হয়ে ওঠে।
২০০৫ সালের সেপ্টেম্বরে, রাশিয়ার বিপক্ষে একটি কোয়ালিফাইং ম্যাচের আগে, স্কোলারি এবং ফিগো রোনালদোর রুমে গিয়ে জানান যে তার বাবা মারা গেছেন। স্কোলারি তাকে বাড়ি যাওয়ার প্রস্তাব দেন। কিন্তু রোনালদো খেলাটাই বেছে নেন, সতীর্থদের স্বাভাবিক আচরণ করতে বলেন এবং ড্রেসিংরুমে বল নিয়ে কসরত করে সময় কাটান।
বাবার প্রয়াণকে সহ্য করার এটাই ছিল তার নিজস্ব উপায়। পরে তিনি স্কোলারিকে ‘বাবা’ বলে ডেকেছিলেন। এভাবেই জাতীয় দলটি এমন একটি আশ্রয়ে পরিণত হয়েছিল যা তাকে মানসিকভাবে শক্ত রেখেছিল।
কোচ কার্লোস কুইরোজের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটে ২০১০ সালের বিশ্বকাপে স্পেনের কাছে বিদায়ের পর। বাজে পারফরম্যান্সের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রোনালদো সাংবাদিকদের কোচের কাছে প্রশ্ন করতে বলেন। দলের ওপর তার প্রভাব এত বেশি বেড়ে গিয়েছিল যে তা দলের রুটিন বদলে দিয়েছিল। তাই কোচ মনে করেছিলেন তার কর্তৃত্ব খর্ব করা হচ্ছে।
সমাজবিজ্ঞানী জোয়াও নুনো কোয়েলহো পর্তুগিজদের চোখে রোনালদোর গুরুত্ব বোঝাতে চমৎকার এক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জাতীয় দলটি পর্তুগিজ পরিচয় এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিত হওয়ার দেশটির প্রয়োজনীয়তার একটি প্রতীক হয়ে উঠেছিল। রোনালদো সেই প্রয়োজনীয়তার কেন্দ্রে অবস্থান করেছিলেন এবং পর্তুগিজদের মনে পরস্পরবিরোধী অনুভূতির জন্ম দিয়েছিলেন। কিছু পর্তুগিজ তার ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা ও অহংকার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন, এবং সবাই তার ব্যক্তিত্বের সঙ্গে নিজেদের মেলাতে পারেননি।
কোয়েলহো ব্যাখ্যা করেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার সমালোচনা করা আরও কঠিন হয়ে পড়েছিল। দেশটি তাকে নিয়ে গর্বিত হতে চেয়েছিল এবং একই সঙ্গে কখনো কখনো এক অস্বস্তিও বোধ করেছিল। তারপরও পর্তুগাল তাকে পেয়ে গর্বিত ছিল। আর শিরোপা জয়ের মধ্য দিয়ে সেই সংশয় বা সন্দেহগুলোও দূর হয়ে যায়।
২০১৬ সালে ফার্নান্দো সান্তোসের অধীনে রোনালদো বদলে যান। নানির পাশে সেন্টার ফরোয়ার্ড হিসেবে খেলাটা তিনি মেনে নেন—এর আগে কোচের নির্দেশ তিনি এত স্বাভাবিকভাবে কখনো মেনে নেননি।
আইসল্যান্ডের সঙ্গে উদ্বোধনী ড্রয়ের পর, তিনি ব্যক্তিগতভাবে নানিকে বলেছিলেন যে তিনি সান্তোসকে বিশ্বাস করেন, এবং এরপর ড্রেসিংরুম এক সত্যিকারের অধিনায়ককে দেখতে পায়। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে পেনাল্টি মিস করার পর তিনি প্রায় ঘুমাতেই পারেননি। সান্তোস ঘুম থেকে জেগে দেখেন রোনালদো আগেই জেগে বসে আছেন।
মার্কৌসিসের ট্রেনিং ক্যাম্পে তিনি এক ভক্তের হাতে থাকা মেগাফোন নিয়ে সমর্থকদের বলেন যে পর্তুগাল তখনো পর্যন্ত কিছুই জেতেনি। তিনি নেতার ভূমিকাটি বেশ উপভোগ করছিলেন।
প্যারিসের ফাইনালে পেশির চোটের কারণে তিনি চেহারায় জল নিয়ে মাঠ ছাড়েন, যা তাকে সেরা ফর্মে খেলতে দেয়নি।
নানি অধিনায়কের আর্মব্যান্ড পরেছিলেন। বিরতির সময় রোনালদো নিজেকে সামলে নিয়ে সতীর্থদের উৎসাহ দেন, এবং অতিরিক্ত সময়ের ঠিক আগে, তখনও ল্যাংড়াতে ল্যাংড়াতে তিনি এদারকে বলে দিয়েছিলেন যে এদারই গোল করবে। আর এদার ঠিক সেটাই করেছিলেন।
তবে রোনালদোর পুরোনো স্বভাব বা জেদ পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। অতিরিক্ত সময়ে রোনালদো সাইডলাইনে দাঁড়িয়ে নির্দেশ দিচ্ছিলেন, শেষ পর্যন্ত চতুর্থ রেফারি তাকে ফিরিয়ে না পাঠানো পর্যন্ত তিনি থামেননি।
তার সবচেয়ে বড় শক্তি—প্রতিটি ফলের ওপর প্রভাব বিস্তারের তীব্র তাগিদ—অনেক সময় তার পক্ষে নিজের সীমা মেনে নেওয়া কঠিন করে তুলেছিল।
২০০৩ সালে যখন তিনি আন্তর্জাতিক ফুটবলে পা রাখেন, পর্তুগাল তখনো তাদের প্রথম বড় শিরোপার সন্ধানে ছিল। কিছু খেলোয়াড় একটি যুগ চিহ্নিত করেন, আবার কেউ কেউ চিরকালের জন্য একটি জাতীয় দলকে বদলে দেন। রোনালদো দ্বিতীয় দলটির অন্তর্ভুক্ত। জুলাইয়ের সেই রাতের ট্রফিটি পর্তুগালকে তাদের প্রথম ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ উপহার দেয়।
তিন বছর পর তিনি সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করে দলকে প্রথম নেশনস লিগের ফাইনালে তোলেন, যা পর্তুগাল জিতে নেয়। ২০২৫ সালে তিনি এমন এক বয়সে দ্বিতীয় নেশনস লিগ ট্রফি উঁচিয়ে ধরেন যখন বেশিরভাগ খেলোয়াড়ই অবসর নিয়ে নেন।
কোনো খেলোয়াড়ই জাতীয় দলের হয়ে তার চেয়ে বেশি গোল করেননি, এবং কেউ তার মতো পর্তুগালের জার্সি গায়ে জড়াননি। রোনালদোর প্রভাবে পর্তুগাল এমন একটি দলে পরিণত হয় যারা কেবল প্রতিভাবান দলগুলোর তালিকায় সীমাবদ্ধ না থেকে প্রতিটি টুর্নামেন্টে শিরোপার দাবিদার হিসেবে মাঠে নামার মানসিকতা অর্জন করে। একই সঙ্গে একটি পুরো প্রজন্ম এমন এক ড্রেসিংরুমের মধ্য দিয়ে উঠে আসে যেখানে মানদণ্ড কী হবে তা তিনিই নির্ধারণ করে দিতেন।
কোয়েলহোর সেই যুক্তিটি এখানেও প্রযোজ্য, একটি ছোট দেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিত হওয়ার পথ খুঁজে পেয়েছিল, এবং দীর্ঘ দুই দশক ধরে রোনালদোই ছিলেন সেই দেশটির মুখ।
২০১৬ সালের পর তাকে নিয়ে প্রশ্নগুলো বদলে যায়। মানুষ কম প্রশ্ন করত যে তিনি স্বার্থপর কি না, আর বেশি প্রশ্ন করত পর্তুগাল কি তার ওপর অতিরিক্ত মাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে কি না।
২০১৮ সালের বিশ্বকাপে তিনি স্পেনের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করেছিলেন, যার মধ্যে বড় টুর্নামেন্টে ৪৫টি প্রচেষ্টার পর তার প্রথম ফ্রি-কিক থেকে করা গোলটিও ছিল। তবু উরুগুয়ের কাছে হেরে বিদায় নিয়েছিল পর্তুগাল।
২০২৬ সালের বিশ্বকাপ শেষে যখন তিনি ফরোয়ার্ড হিসেবে প্রথম একাদশে নিয়মিত খেলা চালিয়ে যান, তখন তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হয়েছিল। অথচ পরিসংখ্যান অনুযায়ী সেটিই ছিল তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে সেরা সময়। রবার্তো মার্তিনেসের অধীনে ৩৭ ম্যাচে ২৮ গোল অর্থাৎ ম্যাচপ্রতি ০.৭৫৬ গোল করে, ফার্নান্দো সান্তোসের আমলের ম্যাচপ্রতি ০.৬২৪ গোলের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছেন।
তার অবদানকে সম্মান জানাতে ফেডারেশন থেকে একটি বিশেষ সংবর্ধনার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, যা জরুরি। কারণ তাঁর এই বিদায় ভক্তদের মনের মতো কোনো উৎসবমুখর উদযাপনের সুযোগ রাখেনি।
তারা শুধু রোনালদোর সঙ্গেই বড় হয়ে ওঠেনি, বরং তিনি তাদের এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন যেখানে তারা আগে কখনো পৌঁছাতে পারেনি।





