ফিরে দেখা
মেসির বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের সেরা মুহূর্তগুলো

বুয়েনস এইরেসে বুধবার বাংলাদেশ সময় ভোরে বেনিনের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচের মধ্য দিয়ে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের জার্সিতে নিজের ২০৮তম তথা শেষ ম্যাচটি খেলতে নামছেন লিওনেল মেসি। দীর্ঘ দুই দশকের বর্ণাঢ্য আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে নীল-সাদা জার্সিতে অসংখ্য অবিস্মরণীয় মুহূর্ত উপহার দিয়েছেন এই মহাতারকা। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের ক্রীড়া লেখকদের চোখে মেসির ক্যারিয়ারের সেরা কিছু স্মরণীয় মুহূর্ত নিয়ে সাজানো হয়েছে এই বিশেষ আয়োজন।
কাতারে সোনালী ট্রফি উঁচিয়ে ধরার মুহূর্ত (২০২২)
ফ্রান্সের বিপক্ষে নাটকীয় ফাইনালে গনসালো মন্তিয়েলের জয়সূচক পেনাল্টি গোলটির পর মেসির মাটিতে লুটিয়ে পড়ার দৃশ্যটি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা ছবি। দীর্ঘ পাঁচবারের চেষ্টায় বিশ্বকাপ জিতে তার মুখে যে স্বস্তি ও আনন্দের হাসি ফুটে উঠেছিল, তা কোটি ভক্তের হৃদয়ে চিরস্থায়ী হয়ে আছে। কাতার বিশ্বকাপে সাতটি গোল করে দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে ফাইনালে তুলেছিলেন তিনি। এর আগে কোয়ার্টার ফাইনালে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে নাহুয়েল মলিনাকে দেওয়া সেই চোখ জুড়ানো নো-লুক পাসটি ছিল মেসির অতিমানবীয় সৃষ্টিশীলতার অনন্য নিদর্শন।
জার্মানির মাটিতে সেই অচেনা মেসি ও প্রথম গোল (২০০৬)
২০০৬ সালের জুনে জার্মানি বিশ্বকাপে সার্বিয়া ও মন্টেনেগ্রোর বিপক্ষে বদলি হিসেবে নেমে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজের প্রথম গোলটি করেছিলেন তরুণ মেসি। তখন তার মাথায় ছিল লম্বা কোঁকড়ানো চুল এবং চোখেমুখে ছিল কৈশোরের বন্য উচ্ছ্বাস। সেদিন কে জানত, জেলের্সিকেনের মাঠে বদলি হিসেবে নামা এই তরুণই একদিন ফুটবল বিশ্বের সর্বকালের সেরা ফুটবলারে পরিণত হবেন!
কোপা আমেরিকায় মেক্সিকোর বিপক্ষে সেই চিপ গোল (২০০৭)
মাত্র ২১ বছর বয়সে কোপা আমেরিকায় মেক্সিকোর বিপক্ষে করা সেই গোলটি এখনো ফুটবলপ্রেমীদের চোখে ভাসে। কার্লোস তেভেজের পাস থেকে বল পেয়ে মেক্সিকোর গোলরক্ষক অসওয়ালদো সানচেজের মাথার ওপর দিয়ে অত্যন্ত নিখুঁত ও দৃষ্টিনন্দন লবে বল জালে জড়িয়েছিলেন তরুণ মেসি। তখন তার গায়ে ১০ নম্বর নয়, বরং ১৮ নম্বর জার্সি শোভা পেত। মিসর বিশ্বকাপে ৩৯ বছর বয়সে রূপকথা (২০২৬)
চলতি বছরের জুলাই মাসে মিসরের বিপক্ষে বিশ্বকাপের রাউন্ড অব ষোলোর ম্যাচটি ছিল অবিশ্বাস্য। ম্যাচের শেষ ১২ মিনিট বাকি থাকতেও মিসর ২-০ গোলে এগিয়ে ছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে খেলার গতি বদলে দেন ৩৯ বছর বয়সী মেসি। একটি অ্যাসিস্ট, একটি দারুণ গোল এবং পুরো ম্যাচে নিজের জাদুকরী পারফরম্যান্স দিয়ে দলকে ৩-২ ব্যবধানে জিতিয়ে সেমিফাইনালে তুলেছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে ফ্রি-কিকের জাদু (২০১৬)
শতবর্ষী কোপা আমেরিকার সেমিফাইনালে স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে করা সেই ফ্রি-কিক গোলটি শিল্পকর্মের সমতুল্য। বক্সের বেশ দূর থেকে চার জনের মানব দেওয়াল ভেদ করে সরাসরি সাইড নেটিংয়ে বল জড়ানোর পর মেসির ‘ডিড ইউ জাস্ট সি হোয়াট আই ডিড’ (Did you just see what I did) সেলিব্রেশন কোপা আমেরিকার ইতিহাসের অন্যতম সেরা মুহূর্ত হয়ে আছে।
ব্রাজিল বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে বসনিয়ার বিপক্ষে জয়সূচক গোল (২০১৪)
বিখ্যাত মারাকানায় বসনিয়ার বিপক্ষে কঠিন লড়াইয়ের সময় ম্যাচের প্রথমার্ধে অনেকটাই নিষ্ক্রিয় ছিলেন মেসি। তবে দ্বিতীয়ার্ধে হিগুইয়েনের সাথে দারুণ এক ওয়ান-টু খেলে ডিফেন্ডারদের কাটিয়ে দূরের পোস্টের ভেতর দিয়ে অসাধারণ এক গোল করে ম্যাচ জয়ের পথ তৈরি করেছিলেন তিনি।
ইকুয়েডরের বিপক্ষে রূপকথার সেই হ্যাটট্রিক (২০১৭)
২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপে খেলা নিয়ে যখন চরম শঙ্কা তৈরি হয়েছিল, ঠিক তখনই একাই দলকে টেনে তুলেছিলেন মেসি। ইকুয়েডরের মাঠে গিয়ে শুরুতেই গোল খেয়ে বসেছিল আর্জেন্টিনা। এরপর মেসি দুর্দান্ত এক হ্যাটট্রিক করে দলকে সরাসরি বিশ্বকাপের টিকিট পাইয়ে দেন। সেই রাতটি ছিল খাদের কিনারা থেকে আর্জেন্টিনাকে ফিরিয়ে আনার মহাকাব্য।
মেক্সিকোর বিপক্ষে ঘুরে দাঁড়ানোর সেই গোল (২০২২)
কাতারে সৌদি আরবের কাছে অপ্রত্যাশিত হারের পর প্রচণ্ড চাপের মুখে পড়েছিল আর্জেন্টিনা। মেক্সিকোর বিপক্ষে ম্যাচের এক ঘণ্টা পর্যন্ত যখন কোনো গোল হচ্ছিল না, ঠিক তখনই বক্সের বাইরে থেকে লো-শটে দুর্দান্ত গোল করে দলকে খাদের কিনারা থেকে বাঁচিয়েছিলেন মেসি। ওই একটি গোলই পুরো টুর্নামেন্টে আর্জেন্টিনার ভাগ্য বদলে দিয়েছিল।
আর্জেন্টিনার আকাশী-সাদা জার্সিতে মেসির এই দীর্ঘ যাত্রা শুধুই কিছু ট্রফি বা জয়ের পরিসংখ্যান নয়; এটি ফুটবল প্রেমীদের জন্য এমন কিছু শৈল্পিক মুহূর্ত যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম মনে রাখবে।









