ইতালি ফুটবল
কাঁটার মুকুট ফের মানচিনির মাথায়

ছবি: রয়টার্স
যে চাকরিটা কেউ করতে চায় না, সেই চাকরিতেই ফিরে এসেছিলেন রবার্তো মানচিনি। ইতালির জাতীয় ফুটবল দলের কোচের চাকরির প্রস্তাব পেয়েছিলেন পেপ গার্দিওলা, কার্লো আনচেলত্তি, আন্দ্রেয়া পিরলোসহ অনেকেই। কিন্তু কেউ রাজি হননি। অগত্যা ইতালিয়ান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন ফের শরণ নিল রবার্তো মানচিনির। যে মানুষটা দায়িত্বে থাকার সময়ে নর্থ মেসিডোনিয়ার কাছে প্লেঅফে হেরে ২০২২ বিশ্বকাপের বাছাই পর্ব থেকে ছিটকে গিয়েছিল ইতালি, তাকেই আবার ফিরিয়ে আনা হলো এবং মানচিনির দ্বিতীয় অধ্যায়ের শুরুটাও হলো উয়েফা নেশনস লিগে বেলজিয়ামের কাছে ২-০ গোলে হেরে।
ইতালির ফুটবল পেছাচ্ছেই
চারবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ইতালি বিশ্বকাপের সবশেষ তিন আসরে মূল পর্বে খেলার যোগ্যতাই অর্জন করতে পারেনি। এমন নয় যে ইতালিতে যুদ্ধবিগ্রহ চলছে, রাজনীতির কূটচালে ইতালি ভেঙে কয়েক টুকরো হয়ে গেছে; ফলে ফুটবল দল হয়ে গেছে খর্বশক্তির। বরং গত দেড় দশকে ইতালির অর্থনীতি মন্দা কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে, জিডিপি সামান্য হলেও বাড়ছে আর বেকারত্ব কমছে। উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগেও ইতালির ক্লাবগুলো খারাপ করছে না, কো-এফিশিয়েন্ট র্যাংকিংয়ে ইতালির অবস্থান দুই। অথচ ১২ বছর হয়ে গেল, ইতালি বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে পারছে না।
নতুন অধ্যায়ে ইতালি ২-০ গোলে হেরেছে বেলজিয়ামের কাছে
সেপ্টেম্বরের ৮ তারিখে ব্যালন ডি’অর পুরস্কারের জন্য ৩০ জন ফুটবলারের যে তালিকা প্রকাশ করেছে ফ্রান্স ফুটবল, তাতে ইতালির কোনো ফুটবলারের নাম নেই। বিশ্বকাপ না খেলাটা একটা বড় কারণ, তবে মৌসুম তো স্রেফ বিশ্বকাপেই সীমাবদ্ধ নয়। ইতালির ‘সিরি-এ’তে খেলা একজন মাত্র ফুটবলার স্থান পেয়েছেন এ তালিকায়, তিনিও ইতালিয়ান নন। আর্জেন্টিনার লাউতারো মার্তিনেজ। এ তথ্যটাই বলে দেয় বৈশ্বিক মানদণ্ডে ইতালির ফুটবল কোথায় দাঁড়িয়ে। ফ্রান্স, স্পেন, জার্মানি কিংবা ইংল্যান্ডের একাধিক ফুটবলার আছেন বিশ্বের সেরা ৩০ ফুটবলারের তালিকায়, সেখানে ইতালির কেউই নেই। সমস্যাটা স্পষ্ট। প্রতিভাবান ফুটবলারের অভাব ইতালিতে। তাই মানচিনিকে দোষও দেওয়া যায় না। কিন্তু কেন চারবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা প্রতিভাবান খেলোয়াড় খুঁজে পাচ্ছে না?
ক্লাবগুলোর দৈন্যদশা ও পুরনো ধাঁচের একাডেমি
কারণটা লুকিয়ে আছে ইতালির ক্লাবগুলোর মালিকানা, একাডেমিগুলোর পুরনো ধাঁচের পরিচালনা, আর্থিক দৈন্যদশায় দেউলিয়া হয়ে যাওয়া আর আমলাতান্ত্রিক জটিলতার এক অদ্ভুত মারপ্যাঁচে।
বিশ্বকাপ থেকে বাদ পড়ার আগে, ২০১০ সালেই অশনিসংকেত বেজেছিল ইতালির ফুটবলে। সেবার দক্ষিণ আফ্রিকায় গ্রুপ পর্বে প্যারাগুয়ে, স্লোভাকিয়া আর নিউজিল্যান্ডের পেছনে থেকে বিদায় নিয়েছিল আজ্জুরিরা। এরপর এসি মিলানকে দুবার ইউরোপিয়ান কাপ জেতানো সাবেক কোচ ও ইতালিকে ১৯৯৪ সালে বিশ্বকাপের ফাইনালে তোলা আরিগো সাচ্চিকে জাতীয় যুব দলগুলোর সমন্বয়ক করা হয় আর রবার্তো বাজ্জিওকে করা হয়েছিল ইতালিয়ান ফুটবলের সংস্কার কমিটির প্রধান।
ইতালির ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা তারকা বাজ্জিও প্রায় ৫০ জন সহযোগীকে সঙ্গে নিয়ে ‘রিনিউইং দ্য ফিউচার’ নামে ৯০০ পৃষ্ঠার একটি সুদূরপ্রসারী প্রস্তাবনা তৈরি করেছিলেন। ইতালীয় ফুটবল ফেডারেশনের প্রতিভা অন্বেষণ ও কাঠামোগত পরিবর্তনের লক্ষ্যে তৈরি এ প্রস্তাবে কোচিং পদ্ধতিকে একটা সুনির্দিষ্ট মানে নিয়ে আসা, আরও সুসংগঠিত স্কাউটিং নেটওয়ার্ক তৈরি এবং খেলোয়াড়দের অগ্রগতির হিসাব রাখতে একটি সমন্বিত ডিজিটাল ডেটাবেজ তৈরির সুপারিশ করা হয়। ২০১১ সালের ডিসেম্বরে বাজ্জিও এ মহাপরিকল্পনাটি পেশ করেছিলেন। তবে এর বছরখানেক পর, ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে তিনি পদত্যাগ করেন। ক্ষোভ প্রকাশ করে বাজ্জিও সে সময় বলেছেন, প্রকল্পটি এক বছর ধরে ‘পুরোপুরি মুখ থুবড়ে পড়ে আছে’। তিনি আরও যোগ করেন, ‘অন্য কাজ করার সুযোগ থাকতে শুধু শুধু সোফায় বসে সময় নষ্ট করা আমার পছন্দ নয়।’
গত ১৫ বছরে, একশর বেশি ইতালিয়ান ক্লাব দেনার দায়ে দেউলিয়া হয়ে গেছে। এদের ভেতর পারমা, পালেরমো, ভেরোনার মতো পুরনো এবং ঐতিহ্যবাহী ক্লাবও রয়েছে। এ ক্লাবগুলো ইতালির আইনের একটা সুযোগের ফায়দা নিয়েই এ অর্থনৈতিক কেলেঙ্কারিটা করছে। ইতালির আইনে দেউলিয়া হয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠান নতুন তহবিল পেলে নতুন মালিকানায় নতুন স্বতন্ত্র সত্তা হিসেবে ফের চালু হতে পারে, সেক্ষেত্রে পুরনো দেনা নতুন মালিককে শোধ করতে হবে না। নতুন মালিকপক্ষ চাইলে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পুরনো ফোল্ড হয়ে যাওয়া ক্লাবটির ঐতিহাসিক ট্রফি, নাম, লোগো এবং অফিসিয়াল ব্র্যান্ডিং কিনে নিতে পারেন। এভাবে হাতবদল হতে হতে ইতালির ক্লাবগুলো হারিয়েছে স্পন্সরদের বিশ্বাসযোগ্যতা, অর্থনৈতিক ভিত্তি আর ভালো খেলোয়াড়দের দলে আনার সক্ষমতাও।
দুই ক্লাবের এক মাঠ: সানসিরো স্টেডিয়াম
ইতালির বেশিরভাগ ক্লাব তাদের ঘরের মাঠের ম্যাচগুলো খেলে ভাড়া করা স্টেডিয়ামে, যে ভেন্যুগুলোর মালিক নগর কর্তৃপক্ষ। যেমন এসি মিলান ও ইন্তার মিলান যে মাঠে খেলে, সেই সান সিরো ১০০ বছর ধরে মিলান নগর কর্তৃপক্ষের সম্পত্তি ছিল। ২০২৫ সালে এসে সেই মাঠটা কিনে নিয়েছে মিলানের দুই ক্লাব, কারণ আমলাতান্ত্রিক নানান জটিলতার কারণে মাঠের সংস্কারকাজ পুরোপুরি করতে পারছিল না তারা।
ওদিকে উয়েফা ক্লাব দুটিকে সতর্ক করে দিয়েছিল যে, প্রয়োজনীয় সংস্কার না করলে সান সিরো আগামীতে আন্তর্জাতিক ম্যাচ ও চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালসহ ২০৩২ সালের ইউরোর কোনো ম্যাচ পাবে না। নানান আইনি জটিলতা শেষে এ সম্পত্তি হস্তান্তর সম্ভব হয়েছে, এরকম দীর্ঘসূত্রতা শুধু একটা ভেন্যুকে ঘিরে নয়, বরং ইতালিয়ান ফুটবলে একটি নিয়মিত দৃশ্য।
প্রতিভার আকাল
নানা সমস্যায় জর্জরিত ইতালিয়ান ফুটবল ফেডারেশন গত এপ্রিলে একটা প্রতিবেদনে সমস্যাগুলো তুলে আনে। যার ভেতর অন্যতম একটি সমস্যা হচ্ছে, সিরি-এ ইউরোপের অন্যতম বয়স্ক লিগ যেখানে খেলোয়াড়দের গড় বয়স ২৭ বছর। মোট খেলার সময়ের মধ্যে ৬৭.৯ শতাংশ সময়ই বিদেশি বা ইতালীয় জাতীয় দলের অনুপযোগী খেলোয়াড়রা মাঠে থাকেন। ২১ বছরের কম বয়সী ইতালীয় খেলোয়াড়দের মাঠে খেলার সময় মাত্র ১.৯ শতাংশ, যা বিশ্বের ৫০টি মনিটর করা লিগের মধ্যে ৪৯তম।
শুধু তাই নয়, খেলোয়াড় তুলে আনার বেলাতেও সিরি-এ পিছিয়ে। গত এক দশকে ঘরের মাঠে তৈরি খেলোয়াড় বিক্রি করে আয়ের দিক থেকে শীর্ষ ৫০টি যুব একাডেমির মধ্যে ইতালির মাত্র দুটি ক্লাব রয়েছে (আতালান্তা ও জুভেন্টাস)। অনূর্ধ্ব-১৯ ও অনূর্ধ্ব-২০ স্তরে ইতালি জাতীয় দল সাফল্য পেলেও তরুণ খেলোয়াড়রা সিনিয়র পর্যায়ে এবং ইউরোপিয়ান প্রতিযোগিতায় পর্যাপ্ত খেলার সুযোগ পান না।
গুণগত মানে পিছিয়ে সিরি-এ
কৌশলের দিক থেকেও সিরি-এ পিছিয়ে। সিরি-এ’তে বলের গতি প্রতি সেকেন্ডে ৭.৬ মিটার, চ্যাম্পিয়নস লিগে সেটা ১০.৪ মিটার। অন্যান্য শীর্ষ ইউরোপীয় লিগের চেয়েও সিরি-এ’তে খেলার গতি অনেক কম। ড্রিবলিং এবং হাইপ্রেসিং অ্যাগ্রেশনের দিক থেকেও সিরি-এ শীর্ষ পাঁচ লিগের মধ্যে সবার শেষে।
রবার্তো মানচিনি এ সত্যি কথাগুলো ভালোভাবেই জানেন। তিনি এটাও জানেন যে, ইতালিয়ান ফুটবল ফেডারেশন খুব আগ্রহ নিয়ে নয় বরং বেকায়দায় পড়েই তাকে দায়িত্ব দিয়েছে। রুশ একটা অনলাইন জুয়ার কোম্পানি ফনবেটের সঙ্গে ব্যক্তিগত চুক্তি আছে আন্দ্রেয়া পিরলোর। ইতালির ফুটবল ফেডারেশন এ ব্যাপারে আপত্তি তোলায় শেষ পর্যন্ত জাতীয় দলের দায়িত্বে আসেননি পিরলো। তাকে খুব করে দায়িত্বে চেয়েছিলেন একসময়ের সতীর্থ ও ইতালির ফুটবল ফেডারেশনের টেকনিক্যাল ডিরেক্টর পাওলো মালদিনি আর জাতীয় দল পরিচালনার খোলনলচে পাল্টে ফেলার প্রকল্পের উপদেষ্টা ব্রাজিলের সাবেক ফুটবলার লিওনার্দো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পিরলো না আসায় তারা দুজনও পদত্যাগ করেছেন।
পরিশেষে
ইতালির জাতীয় দলের দায়িত্বে ফেরার আগে মানচিনি ছিলেন কাতার লিগের দল আল সাদের দায়িত্বে। এতেই বোঝা যাচ্ছে, কাউকে না পেয়েই মানচিনিকে ফিরিয়ে এনেছে ইতালির ফুটবল ফেডারেশন এবং এতে করে ইতালির ফুটবল যে সামনের দিকে এগোচ্ছে না, মানচিনির দ্বিতীয় অধ্যায়ের প্রথম ম্যাচে বেলজিয়ামের বিপক্ষেই সেটা স্পষ্ট।





