বিশ্বকাপের আগে
রোনালদোকে সোনালী শিরোপায় রাঙানোর প্রস্তুতি পর্তুগালের

সংগৃহীত ছবি
বিশ্বকাপের ‘ডার্ক হর্স’ তকমা তাদের গায়ে পাকাপাকিভাবে লেগেছে বহুকাল আগেই। পাহাড়সম প্রত্যাশা নিয়ে বিশ্বকাপে আসা, কিছু ম্যাচে দুর্দান্ত খেলা, এরপর একরাশ হতাশা নিয়ে বিদায় নেওয়া। বিশ্বকাপে পর্তুগালের গল্পটা যেন সবারই খুব চেনা। বহু যুগের সেই আক্ষেপ ঘোচাতে আবারও বিশ্বকাপের মঞ্চে পা রাখছে পর্তুগিজরা। এবার কি ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো জাদুতে শিকে ছিঁড়বে পর্তুগালের ভাগ্য?
রোনালদোর জন্য বিশ্বকাপ চায় তারা
এমন কোনো শিরোপা নেই, যা ছুঁয়ে দেখা হয়নি তার। তবুও পেশাদার ক্যারিয়ারে সবচেয়ে বড় আক্ষেপ হয়ে রয়েছে একটি মাত্র ট্রফি। ক্যারিয়ারের সায়াহ্নে এসে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো আজও খুঁজে ফিরছেন বিশ্বকাপের সেই সোনালি শিরোপা।
২০০৬ সালে যখন প্রথমবার বিশ্বকাপে মাঠে নামেন, বয়স ছিল ২১। এরপর পেরিয়ে গেছে ২০ বছর। বিশ্বকাপের পাঁচ আসরে পর্তুগালের হয়ে খেলেছেন রোনালদো। প্রতিবারই ফিরতে হয়েছে খালি হাতে। একে একে অবসর নিয়েছেন পুরনো সব সতীর্থ, রয়ে গেছেন শুধুই তিনি।
কাতার বিশ্বকাপ থেকে পর্তুগালের বিদায়ের পর চোখের জলেই মাঠ ছেড়েছিলেন। বিশ্বকাপের মঞ্চে আর দেখা যাবে না সিআর সেভেনকে, ভক্তরা বুকে পাথর বেঁধে মেনে নিয়েছিলেন। তবে হাল ছাড়েননি আধুনিক ফুটবলের এই কিংবদন্তি। বয়স ৪১ পেরোলেও গত চার বছর দারুণভাবে নিজেকে ফিট রেখে রেকর্ড ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলার দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছেন।
২০১৬ সালে রোনালদোর নেতৃত্বে ইতিহাস গড়ে ইউরো জিতেছিল পর্তুগাল। টুর্নামেন্ট জুড়ে পর্তুগালের লক্ষ্য ছিল একটাই, পর্তুগিজ রাজপুত্রকে আন্তর্জাতিক শিরোপা জেতাতে হবে! রোনালদোর সবচেয়ে পুরনো সতীর্থ ব্রুনো ফার্নান্দেজ বহুবার বলেছেন, ‘২০২৬ বিশ্বকাপ শিরোপা তারা জিততে চান সিআর সেভেনের জন্যই।’ হোয়াও ফেলিক্স, পেদ্রো নেতোর মতো তরুণরাও নিজেদের অর্জনের চেয়ে এগিয়ে রাখছেন রোনালদোর এই অপূর্ণ ইচ্ছাকেই।
‘বুড়ো’ রোনালদোই হবেন তারুণ্যের প্রেরণা
বয়স তার ৪১। বুড়ো বয়সেও যেন চির তরুণ রোনালদো। এই তো সেদিনের কথা, কর্নার থেকে উড়ে আসা বলে অনেকখানি লাফিয়ে গোল করলেন। আল নাসরের এই তারকা বিশ্বকে জানান দিলেন, এখনো কিন্তু ফুরিয়ে জাননি!
কিন্তু সৌদি প্রো লিগ ও বিশ্বকাপ তো এক নয়। ৪৮ দলের এই মহারণে মুখোমুখি সেরাদের সেরারা। সেখানে তারুণ্যনির্ভর পর্তুগাল দলে কি এই বয়সে ভালো কিছু করতে পারবেন সিআর সেভেন?
গত নেশনস লিগ বলুন আর বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব, রোনালদো বুঝিয়ে দিয়েছেন, একঝাঁক তরুণের মধ্যেও তিনি মেলে ধরতে পারেন নিজেকে। এসি মিলানের রাফায়েল লিও, চেলসির পেদ্রো নেতো কিংবা জুভেন্তাসের ফ্রান্সেসকো কনসেসাও— তিনজনের সঙ্গেই গত কয়েক বছরে দারুণ বোঝাপড়া দেখিয়েছেন রোনালদো। পর্তুগাল কোচ রবার্তো মার্তিনেস তাই চোখ বন্ধ করেই ভরসা রাখতে পারেন এই ‘বুড়োর’ ওপর।
অবিশ্বাস্য এক ক্যারিয়ারের সায়াহ্নে দাঁড়িয়ে থাকা এই ফুটবল তারকা তার অভিজ্ঞতার সবটুকু ঢেলে শেষবার চেষ্টা করবেন ওই সোনালি ট্রফিটা ছুঁয়ে দেখতে। পুরো পর্তুগাল অপেক্ষা করছে ওই মুহূর্তের জন্যই।
ইউরোপ সেরা রক্ষণভাগ
নেশনস কাপে পর্তুগালের সাফল্যের বড় রহস্য ছিল তাদের জমাট ডিফেন্স। ইউরোপের সেরা তিন ক্লাবের চার ডিফেন্ডার অতন্দ্রপ্রহরীর মতো সামলান রক্ষণভাগ। পিএসজির নুনো মেন্দেস, ম্যানচেস্টার সিটির রুবেন দিয়াজ ও ম্যাথুস নুনেজ, বার্সেলোনার হোয়াও ক্যানসেলো— এই চারজনের ওপর কোচের ভরসার কমতি নেই।
বেঞ্চেও আছেন একঝাঁক তারকা। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের ডিয়োগো দালত, বেনফিকার আরাহো, স্পোর্টিং সিপির গঞ্জালো ইনাসিওরা ম্যাচের শেষভাগে মাঠে নেমে আটকে দিতে পারেন প্রতিপক্ষে ম্যাচে ফেরার শেষ চেষ্টা।
ঠান্ডা মাথার মাঝমাঠই ভরসা পর্তুগালের
দুই ম্যানচেস্টারের তারকা ব্রুনো ফার্নান্দেজ ও বেনার্দো সিলভাতেই চোখ বন্ধ করে ভরসা রাখেন রবার্তো মার্তিনেস। বলের দখল নিয়ে প্রতিপক্ষকে নাস্তানাবুদ করা, দারুণ সব বল বানিয়ে রোনালদোদের গোলে বড় ভূমিকা রাখা, সবেতেই পটু এই পর্তুগিজ মিডফিল্ড।
ফার্নান্দেজ-সিলভার সঙ্গে আছেন এই মুহূর্তে পর্তুগালের অন্যতম বড় তারকা ভিতিনিয়া। পিএসজির এই তারকাকে নিয়ে আলাদাভাবেই ভাবতে হবে প্রতিপক্ষকে।
মাঝমাঠ মাতাতে আরও থাকবেন হোহাও নেভেস, রুবেন নেভেস ও দারিও এসুগো।
তারায় ভরা আক্রমণভাগ
রেকর্ড ষষ্ঠ বিশ্বকাপে মাঠে নামবেন পর্তুগালের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় তারকা রোনালদো। সব আলো থাকবে তার দিকেই। হাজার গোলের দিকে ছুটে চলা এই কিংবদন্তি বিশ্বকাপে কেমন করবেন, সেদিকেই তাকিয়ে আছে তার শতকোটি ভক্ত।
তার সঙ্গী হয়ে এসি মিলানের রাফায়েল লিও, চেলসির পেদ্রো নেতো, জুভেন্তাসের ফ্রান্সেসকো কোনসেসাও এগিয়ে যাবেন দুর্বারগতিতে— কোচের বিশ্বাস এমনটাই।
বদলি হিসেবে নেমে খেলার মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন আল নাসরের হোয়াও ফেলিক্স, ডর্টমুন্ডের ফ্যাবিও সিলভারা।
ইউসেবিও পারেননি। খালি হাতে ফিরেছেন লুইস ফিগোরাও। পর্তুগালের সেই সোনালি প্রজন্মের ট্রফি ছাড়াই বিদায় নেওয়ার ব্যথা এখনো পীড়া দেয় পুরো দেশকে। ইউরো জিতে সেই ক্ষতে কিছুটা মলম লাগালেও বিশ্বকাপ না পাওয়ার হতাশা তাড়া করে বেড়ায় রোনালদোকে। লিওনেল মেসি ২০২২ বিশ্বকাপের পর আরেক কিংবদন্তির ফুটবল রূপকথার গল্প মায়ামিতে রচিত হলে ক্ষতি কী!






