ফুটবলের 'টি-টোয়েন্টি' উৎসবও হাউজফুল !

ছবি: বাফুফে
ফুটবলমুখী দর্শকদের মাঠে ফেরাতে ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ড এর সেসময়কার বিপনন বিভাগ উদ্যোগ নিয়েছিল ২০ ওভারের সংক্ষিপ্ত ক্রিকেট ম্যাচের। কিন্তু ৯০ মিনিটের ফুটবল কিভাবে ২০ দুগুণে ৪০ মিনিটের ফুটসাল হলো?
উত্তর হচ্ছে, তরুণদের সারা বছর চটজলদি উত্তেজনাপূর্ণ আর রোমাঞ্চকর অথচ খুব বেশি শারিরীক ধকল পোহাতে হয় না এমন একটা খেলায় ব্যস্ত রাখার জন্য। ফুটবলের প্রথম বিশ্বকাপ হয়েছে ১৯৩০ সালে, যেটা জিতেছিল উরুগুয়ে। সেই উরুগুয়েতেই ইয়ং মেনস ক্রিশ্চিয়ান অ্যাসোসিয়েশন (ওয়াইএমসিএ) এর একজন শারিরীক প্রশিক্ষক হুয়ান কার্লোস সেরিয়ানি চেয়েছিলেন ফুটবলের জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে আরেকটু কম সময়ের দ্রুত গতির একটা খেলা উদ্ভাবন করতে যেটা ঘরের ভেতরেও খেলা যাবে। সেটাই ফুটসাল।
সেনাবাহিনী দলের লিড নেওয়ার পর উল্লাস
বিশ্বজুড়ে ফুটবলের পাশাপাশি ফুটসালও বেশ জনপ্রিয়। ফিফার ফুটসাল বিশ্বকাপ হয়, মহাদেশীয় কনফেডারেশন গুলোও ফুটসালের মহাদেশীয় প্রতিযোগিতা আয়োজন করে। বাংলাদেশেও পথচলা শুরু হয়েছে ফুটসাল লিগ বাংলাদেশ নামে, পুরুষ এবং নারী দুই দলেরই প্রতিযোগিতা ছিল এই আয়োজনে। প্রথম আসর শেষ হলো রবিবার।পুরুষ ও নারী, দুই বিভাগেই শিরোপা জিতেছে আইএম টেন এফসি।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফুটসাল লিগ, বিশেষ করে নারীদের ফুটবল হালফিলে বেশ ট্রেন্ডিং। বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজার মেয়ে একটি দলের হয়ে খেলেছেন, রাশিয়ান বংশোদ্ভুত নোরা সালাউদ্দিন নামের একজনকেও খেলতে দেখা গেছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে 'খ্যাপ' খেলা ফুটবলারদেরও দেখা গেছে এই ফুটসাল টুর্নামেন্টে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের অনেক অনুসারী, তাদের মিথস্ক্রিয়াতেই জনপ্রিয়তা পেয়েছে আয়োজনটি।
রবিবার সন্ধ্যায় ছিল ফাইনাল। শুরুতেই নারীদের ম্যাচ, আইএমটেন এফসি'র প্রতিপক্ষ বাংলাদেশ সেনাবাহিনী স্পোর্টস ক্লাব দল। পিটার বাটলার বাংলাদেশ নারী জাতীয় দলের দায়িত্ব নেয়ার পর যাদের জাতীয় দল থেকে ছেঁটে ফেলেছেন; সেই সাবিনা খাতুন, কৃষ্ণা রানী সরকার, মাসুরা পারভিন, মাৎসুশিমা সুমাইয়া সবাই খেলছেন আইএমটেন এফসির হয়ে। যে ক্লাবটি চালান বাংলাদেশ ফুটসাল কমিটির চেয়ারম্যান ইমরানুর রহমান। দল সংশ্লিষ্টদের কাছে জানা গেল, খেলোয়াড়দের জন্য উন্নত আবাসন এবং ভালো পারিশ্রমিক রেখেছেন তিনি, যে কারণে সাফ ফুটবল জয়ী জাতীয় দলের বেশিরভাগ খেলোয়াড়ের গায়েই আইএম টেন এফসির জার্সি।
ম্যাচে ফেরার চেষ্টা করছেন সাবিনা
ফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষ সেনাবাহিনী দলের বেশিরভাগ খেলোয়াড় হলেন বয়সভিত্তিক পর্যায়ের। তবে বাফুফের ট্রেনিং ক্যাম্পে ছিলেন। সদ্যই কৈশোরে পা দেয়া খেলোয়াড়দের সংখ্যাই বেশি, পেশাদার ফুটবলে তাদের পথচলাও অল্পদিনের। কিন্তু সেনাবাহিনীসুলভ শৃংখলা আর সাহসে তারাই শুরুতে কাঁপিয়ে দিল অভিজ্ঞ আইএমটেন দলকে। শুরুতেই গোল, অল্প সময়েই ২-০ গোলের লিড। গোলরক্ষক রীতিমত চীনের প্রাচীর হয়ে উঠেছেন। তবে ভুটান, মালদ্বীপ বিভিন্ন দেশের পেশাদার লিগে খেলা এবং জাতীয় দলের হয়ে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ জেতা সাবিনা, মাসুরারা ঘুরে দাঁড়ান দ্রুতই। ২-২ সমতায় ফেরে আইএমটেন, এরপর এগিয়ে যায় ৩-২ গোলেও। এসময় সেনাবাহিনী দল ইনডিরেক্ট ফ্রি কিক থেকে গোল করলেও সেই গোল বাতিল হয়ে যায়। পিছিয়ে পড়েও ৫-৩ গোলে ফাইনাল জিতে নেয় আইএম টেন এফসি। জোড়া গোল সাবিনার।
টি-টোয়েন্টি দ্রুতই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে খেলার রোমাঞ্চকর চরিত্র আর অনিশ্চয়তার জন্য। উরুগুয়েতে যে খেলা ১৯৩০ সালে শুরু হয়েছে, তার প্রায় ১০০ বছর পর ২০২৬ সালে এসে বাংলাদেশে সেই খেলার বড় একটা ঘরোয়া আসর হল। বলা যায় দেরিতে হলেও ফুটসালের সম্ভাবনা যাচাই করা গেছে। অংশগ্রহণের পাশাপাশি খেলাটির জনপ্রিয়তাও বেশ। সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসের সন্ধ্যায় নিজেদের দলের খেলা দেখতে মাঠে এসেছিলেন ইমরানের প্রতিষ্ঠান লায়লা গ্রুপ এর অনেকেই, মাঠে থেকে দলকে উৎসাহ দিয়েছেন দুটো ম্যাচেই। সতীর্থদের খেলা দেখতে আর উৎসাহ দিতে এসেছিলেন সেনাবাহিনী'র অন্যান্য ক্রীড়াবিদরাও। মাসুরা, জিলি, সুমাইয়াদের দেখতে তাদের ভক্তরাও এসেছিলেন, ছিলেন তাদের পরিবারের সদস্যরাও।
সুমাইয়া ছুটছেন বলের দখল নিতে
টিকেট কাটার ঝামেলা নেই, ঢোকার জন্য লম্বা লাইনে দাঁড়ানোর ভোগান্তি নেই, স্বল্প সময়ে রোমাঞ্চ আর ভরপুর বিনোদন, সঙ্গে ডিজের রক্তে নাচন ধরানো উদ্দাম মূর্ছনা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছবি আর ভিডিও পোস্টের অবারিত সুযোগ; সব মিলিয়ে দর্শকদের জন্য দারুণ বিনোদন ছিল ফুটসাল লিগের ফাইনাল। দুটো ম্যাচই হয়েছে রোমাঞ্চকর। ফুটবলারদের নৈপুন্য, খেলার রোমাঞ্চের সঙ্গে এত কিছু, তাও বিনে পয়সায়। সঙ্গে বাড়তি পাওনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তারকাখ্যাতি পাওয়াদের কাছ থেকে দেখার হাতছানি। সব মিলিয়ে ফুটসালের ফাইনাল রীতিমত হাউজফুল।
তবে প্রশ্নও আছে। মাসুরা, সাবিনা, কৃষ্ণারা জাতীয় দলে খেলে তৈরি হয়ে এরপর ফুটসালে এসেছেন পিটার বাটলারের দলে জায়গা না পেয়ে। তাহলে কি ফুটসাল একধরণের 'পূনর্বাসন কেন্দ্র', নাকি হয়ে উঠবে স্বতন্ত্র এক ধারা? ছোটদের জন্য দক্ষতা বৃদ্ধি আর প্রতিযোগিতা বাড়াতে ফুটসাল একটা কার্যকর উপায়। লিওনেল মেসি থেকে ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো সবাই একসময় খেলেছেন এই খেলাটা কারণ ছোট জায়গায় বলের নিয়ন্ত্রণ রাখার দক্ষতাটা এখানে গড়ে ওঠে দারুণ ভাবে। তবে ফুটবলে জাতীয় দলে খেলে ফুটসালে আসা, এমন উদাহরণ বৈশ্বিক পর্যায়ে খুব বেশি নেই। অথচ ফুটসাল বাংলাদেশ লিগে, এটাই যেন ছিল সাফল্যের অলিখিত সূত্র।






