৩৬ জুলাই
পাপনের পতন থেকে তামিমের তারিফ

৬ আগস্ট ২০২৪। আগের দিন শেখ হাসিনা পালিয়েছেন, দেশে কোনো সরকার নেই। খানিকটা বেলা গড়াতেই বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে হাজির দীর্ঘদিন ধরে দৃশ্যপটের বাইরে থাকা কিছু মানুষ। তাদের সঙ্গে কিছু অনুচর, ২৪ ঘণ্টা আগেও যারা সরকারপক্ষের ঘনিষ্ঠ তারাই এখন তীব্র সমালোচক হয়ে স্লোগানমুখর।
জুলাই বিপ্লবের পর দেশের ক্ষমতা কাঠামোয় পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তার সরাসরি প্রভাব পড়েছে ক্রিকেট প্রশাসনে। দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা কিংবা সবচেয়ে ধনী ক্রীড়া সংস্থা বিসিবিকে যে নামেই ডাকা হোক না কেন, সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিষ্ঠানটিকে কবজায় রাখার প্রচেষ্টা নির্বাচিত কিংবা অনির্বাচিত, সব আমলেই দেখা গেছে। শুধু বিসিবি যখন ছিল পল্টনে জাতীয় স্টেডিয়ামের এক-দুই কামরার অফিস, যেখানে বিদ্যুৎ বিল না দেওয়ায় মোমবাতির আলোয় কাজ করেছেন অনেকে, যখন বিসিবির পরিবহন পুলের একমাত্র যান হচ্ছে পিয়নের জন্য একখানা সাইকেল, তখন রাজনীতিবিদরা বিসিবিকে দুয়োরানির মতোই দূরে ঠেলেছেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের কারণে বিসিবির কোষাগার যত ফুলে-ফেঁপে উঠেছে, ততই এই সোনার ডিম পাড়া হাঁসের দিকে নজর পড়েছে রাষ্ট্রের শীর্ষ মহলের।
বিসিবির বর্তমান পর্ষদে অনেক মন্ত্রী-এমপি সন্তানদের উপস্থিতি দেখে সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ বলেছেন, ‘বাপের দোয়া ক্রিকেট বোর্ড।’ অথচ বিসিবি তো তারও বহু আগে থেকেই চলেছে বাপের দোয়ায়! নাজমুল হাসান পাপন যখন ২০১৩ সালে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ মনোনীত পরিচালক হয়ে পর্ষদে এসে সভাপতি নির্বাচিত হন, তখন দেশের রাষ্ট্রপতি তার বাবা জিল্লুর রহমান। পাপন ছিলেন বেক্সিমকো ফার্মার প্রধান নির্বাহী ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বেক্সিমকো গ্রুপের পরিচালক শায়ান এফ রহমানও বিসিবির পরিচালক হয়েছেন।
৫ আগস্টের পর তৎকালীন ক্রীড়ামন্ত্রী পাপনও বিদেশে পালিয়ে যান এবং অজ্ঞাত স্থান থেকেই পদত্যাগপত্র পাঠান। ২১ আগস্ট সচিবালয়ে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে বিসিবির পরিচালনা পর্ষদের জরুরি সভায় বিসিবি সভাপতি নির্বাচিত হন ফারুক আহমেদ। প্রথম কোনো সাবেক ক্রিকেটারকে দেখা যায় বিসিবি সভাপতির চেয়ারে। অতীতে সাবের হোসেন চৌধুরী, আ হ ম মুস্তফা কামাল কিংবা পাপন— প্রত্যেকেই ছিলেন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে। জুলাই বিপ্লবের পর বিসিবি চলে গেল ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের কবজায়, উল্টে গেল পাশার দান।
ফারুক এসে পাপনের বোর্ডের অবশিষ্টদের নিয়েই পথ চলেছেন। তাকেও সরিয়ে দেওয়া হলো ২৯ মে ২০২৫ তারিখে, সরকারের অঙ্গুলিহেলনে। বলা ভালো, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার ইশারায়। তার প্রেস সচিব মাহফুজ তো ফারুককে বলেই ফেললেন, ‘আপনি কীভাবে বিসিবি প্রেসিডেন্ট হয়েছেন, তা আমাদের জানা আছে।’
ফারুকের গদি নড়ে যায় বিসিবি পরিচালকদের আনা অনাস্থা প্রস্তাবে। যদিও অনেকেই পরে বলেছেন, অনাস্থা প্রস্তাবে তাদের সই নেওয়া হয়েছে স্ক্যানের মাধ্যমে। ফারুক গেলেন, আমিনুল ইসলাম বুলবুল এলেন। অস্ট্রেলিয়া থেকে জমি বিক্রি করতে ঢাকায় এসে হয়ে গেলেন বিসিবি সভাপতি, বললেন টি-টোয়েন্টি ইনিংস খেলতে এসেছেন। এরপর বাংলাদেশের ক্রিকেটের প্রেমে পড়ে ইনিংসটা বড় করতে চাইলেন, কীভাবে নির্বাচন করতে হয়, সেসব না জেনেও হয়ে গেলেন নির্বাচিত সভাপতি। প্রহসনের নির্বাচনে সভাপতি হয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে যাওয়াটা আটকে দিলেন। ওদিকে ঢাকার ক্লাব সংগঠকদের বড় একটা অংশ বুলবুলের অধীনে বিসিবি আয়োজিত কোনো লিগে খেলতে অস্বীকৃতি জানানোয় চলল ওয়াকওভারের হিড়িক।
জাতীয় নির্বাচনের পর বিসিবির আগের কমিটি ভেঙে দিল জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ। পূর্বাচলের মাঠ দেখতে গিয়েছিলেন বুলবুল, বিসিবি কার্যালয়ে ফিরতে ফিরতে জানলেন গদি নড়ে গেছে। সেদিন সন্ধ্যায় প্রজ্ঞাপন জারি হওয়ার আগেই সভাপতির চেয়ারে বসে গেলেন তামিম ইকবাল। প্রথমে অ্যাডহক কমিটি, তারপর নির্বাচিত পর্ষদের সভাপতি। কিছু মানুষের পদত্যাগের নাটক, ফের ক্ষমতার চেয়ারে আসা। গত দুই বছরে এসবই হয়েছে ক্রিকেট প্রশাসনে। মাঠের খেলার চেয়ে যেখানে রাজনীতির চেয়ার বদলের খেলাই হয়েছে বেশি। তবে শেষ পর্যন্ত সবার মুখেই তামিমের তারিফ, কারণ দায়িত্ব নিয়ে শুরুতেই সব ক্রিকেটারের বেতন যে বাড়িয়েছেন!




