রামেনের দেশ থেকে ক্রিকেটের মঞ্চে

সংগৃহীত ছবি
শহরটিকে সবাই চেয়ে ‘রামেনের শহর’ হিসেবে। জাপানের সবচেয়ে বেশি রামেনের দোকান যে এখানে। তোচিগি প্রিফেকচারের এক লাখ ১০ হাজার বাসিন্দার সেই ছোট্ট শহর সানোতেই এবার নতুন ইতিহাস গড়তে যাচ্ছে জাপান। জাপান পুরুষ দলের বিপক্ষে প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে মাঠে নামবে ক্রিকেট পরাশক্তি ভারত।
অস্থায়ী রূপরেখা, স্থায়ী স্বপ্ন
বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ পরিচিত ক্রিকেটারদের বরণ করে নিতে সানোর আয়োজন চোখে পড়ার মতো। অস্থায়ী ড্রেসিংরুম, অস্থায়ী গ্যালারি আর জাপান ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের আনা অস্থায়ী গোসলের সুবিধা—সব মিলিয়ে সানোকে যেন আর চেনাই যাচ্ছে না! শূন্য থেকে ২ হাজারের আবাসন ব্যবস্থা তৈরি করে যেন তাক লাগিয়ে দিয়েছেন আয়োজকরা।
জাপানে লেগেছে ছুটির হাওয়া। রবিবার, সোমবার ও বুধবার; তিনদিনের এই ছুটির মাঝে মঙ্গলবারকেও ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। টানা ছুটিতে গ্যালারি কানায় কানায় পূর্ণ থাকবে বলেই আশা করা হচ্ছে। জাপানিজ ক্রিকেটের ইতিহাসে যে এটিই সবচেয়ে বড় আয়োজন।
টোকিওর উত্তরের এই ছোট্ট শহরে ভারতীয় দলের পৌঁছানোর গল্পটি বেশ রোমাঞ্চকর। এর পেছনে রয়েছে এশিয়ান গেমস, একজন শ্রীলঙ্কান গ্রাউন্ডসম্যান এবং আকস্মিক কিছু সিদ্ধান্ত।
প্রায় ১৮ মাস আগের কথা। জেসিএ-র টার্ফ ম্যানেজার মহেশ বোপাগে নাগোয়া এশিয়ান গেমসের জন্য খুঁজে পান স্থানীয় কাদা মাটি। সানোর ১০ বছরের পুরোনো পিচ নতুন করে সাজাতে সেই একই মাটি ব্যবহার করা হয়। জেসিএ-র চিফ অপারেশনস অফিসার অ্যালা কার এই সুযোগটিই কাজে লাগান। তিনি বুঝতে পারেন, নাগোয়ার মতো একই পিচে অনুশীলন করতে পূর্ণ সদস্যের দেশগুলো নিশ্চয়ই আগ্রহী হবে।
সেই সুবিধাকে কেন্দ্র করে আইসিসি সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানোর একপর্যায়ে জেসিএ ভারতকে জিজ্ঞেস করে—’আমাদের সাথে একটা ম্যাচ খেলবেন?’
ভারত রাজি হতেই শুরু রূপকথার গল্পের।
'সামুরাই স্পিরিট'
ক্রিকেটে ভারতের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হবে জাপান, এ যেন কল্পনারও বাইরে।
জাপানের হয়ে ৩৬টি টি-টোয়েন্টি খেলা ওয়াতারু মিয়াউচির মতে, শীর্ষ দলের বিরুদ্ধে নিজেদের আসল অবস্থান জেনে নেওয়ার এটাই সেরা সুযোগ। মাকোতো তানিয়ামা, কোহেই কুবোতা ও ইব্রাহিম তাকাহাশিরা ভারতের প্রস্তুতি, কৌশল, চাপ সামলানোর ক্ষমতা এবং মানসিকতা থেকে শেখার জন্য মুখিয়ে আছেন।
নিজেদের ক্রিকেটকে পরের ধাপে নিতে জাপান বেশ তৎপর। লংকান প্রিমিয়ার লিগ, দক্ষিণ আফ্রিকার টাইটানস কিংবা অস্ট্রেলিয়ার ঘরোয়া ক্রিকেটে যেন বেশি বেশি জাপানিজ খেলোয়াড় সুযোগ পায়, সেটাই এখন তার লক্ষ্য।
‘জাপান প্রিমিয়ার লিগ’ (জেপিএল)-এ দিলমুথ করুণারত্নে, জশ ব্রাউনদের মতো তারকাদের উপস্থিতি স্থানীয়দের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিয়েছে অনেকগুণ।
রাজপথ থেকে অলিম্পিক: জাপানে ক্রিকেটের উত্থান
গত কয়েক বছরে জাপানে ক্রিকেটের বিকাশ ঘটেছে চোখ পড়ার মতো। ২০২০ সালের অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের সময় যেখানে নিবন্ধিত খেলোয়াড় ছিল মাত্র ৩,৫০০, বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮,৮০০ তে।
গত কয়েক বছরে প্রায় ২০,০০০ মানুষ ক্রিকেটে অংশ নিয়েছেন। ২০০৮ সালে সানো শহরকে ‘সিটি অব ক্রিকেট’ ঘোষণা করা হয়। সানো স্টেশনের নাম হয়েছে ‘হোম অব জাপান ক্রিকেট’, যেখানে স্থান পেয়েছে ইতিহাস ও ক্রিকেটের প্রদর্শনী। এমনকি জনপ্রিয় অ্যানিমে 'ব্ল্যাক বাটলার'-এর অনুপ্রেরণায় শহরের পাঁচটি ম্যানহোলের ঢাকনায় ক্রিকেট আঁকা হয়েছে।
বর্তমানে জাপানের পুরুষ ও নারী—উভয় কাঠামোরই ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। গড়ে উঠেছে ‘এ’ দল ও অনূর্ধ্ব-১৬ দল। আয়াকা কাতো-স্টাফোর্ডের মতো নারী ক্রিকেটার অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেন হিটে রুকি চুক্তি পেয়েছেন। লস অ্যাঞ্জেলেস ২০২৮ অলিম্পিকে ক্রিকেট যুক্ত হওয়ায় মিলছে কোচিং ও বিশ্লেষকের পূর্ণ সহায়তা।
পেশাদার ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন এখনো খানিকটা দূরে। তবে ধীরে ধীরে সেই পথেই এগিয়ে যাচ্ছে জাপানিজরা। অ্যালা কারের ভাষায়, ‘জাপান স্বপ্ন দেখছে, স্বপ্নগুলো খুব দ্রুত বাস্তবে রূপ নিতে পারে!’
মাঠের লড়াইয়ে যে ভারতের কাছে তেমন একটা পাত্তা পাবে না জাপান, এ সবারই জানা। কিন্তু ঐতিহাসিক এক ম্যাচে ফলাফলটা যে একেবারেই মাথায় আনছেন না জাপানিজরা, সে বলাই বাহুল্য! নিজেদের হার না মানা 'সামুরাই স্পিরিট' দেখাতেই প্রস্তুত জাপানের উদীয়মান ক্রিকেটাররা।
ভারতের বিপক্ষে এই ম্যাচ দিয়ে জাপানের ক্রিকেট পা দেবে নতুন এক অধ্যায়ে। রামেনের শহর সানো হয়ে থাকবে তার সাক্ষী।
সূত্র-ক্রিকইনফো



