জয়ের গল্প জুড়ে তিন নায়ক

সংগৃহীত ছবি
রবিবারের ডারউইন যেন বাংলাদেশের জন্য হঠাৎ পাওয়া এক টুকরো স্বপ্ন। প্রায় ফাঁকা মারারা ওভালে গুটিকয়েক বাংলাদেশি দর্শকের গলা ফাটানো উল্লাস, আর মাঠে ইতিহাস লেখা একদল ক্রিকেটার। চার দিনের লড়াই শেষে স্কোরবোর্ডে যখন দেখা গেল, বাংলাদেশ ৯ উইকেটে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়েছে— যে জয়ে বদলে গেছে বাংলাদেশের ক্রিকেটের গল্পও।
শেষ ইনিংসে বাংলাদেশের জয়ের জন্য দরকার ছিল মাত্র ৫৭ রান। মুমিনুল হক সেই রান পূর্ণ করলেন স্থানীয় সময় দুপুর ২টা ৩৬ মিনিটে পয়েন্ট দিয়ে চার মেরে। স্কোরবোর্ডে তখন লেখা— বাংলাদেশ ৪২৬ ও ৫৭/১, অস্ট্রেলিয়া ১৯৮ ও ২৮৪। বাংলাদেশ ৯ উইকেটে জয়ী।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম টেস্ট জয় বাংলাদেশের। তাও মাত্র তৃতীয় চেষ্টায়। অথচ এই বাংলাদেশকে নিয়ে ম্যাচের আগে এমন স্বপ্ন দেখার সাহস খুব কম মানুষেরই ছিল। আশার চেয়ে লজ্জার হারের আশঙ্কাই ছিল বেশি। কিন্তু টেস্ট ক্রিকেট কখনো কখনো হিসাব মুছে দেয়। ডারউইনে বাংলাদেশ সেটিই করল।
এ জয়কে শুধু একটি স্কোরকার্ডে আটকে রাখলে ভুল হবে। ৯ উইকেটের ব্যবধানের চেয়েও বড় এই জয়ের গল্প জুড়ে তিনটি নাম— হাসান মাহমুদ, তানজিদ হাসান তামিম ও মেহেদী হাসান মিরাজ।
শুরুতেই হাসানের ঝড়
শুরুতে টস জিতে উইকেট পড়তে ভুল করা অস্ট্রেলিয়া বোলিংয়ের পরিবর্তে নেয় ব্যাটিং। আর সেখানেই দৃশ্যপটে হাসান মাহমুদ। কাউন্টি ক্রিকেটে বোলিংয়ের অভিজ্ঞতা পুরোটা ঢেলে দিলেন ডারউইনে। সাফল্যও পেলেন হাতেনাতে। ৬ উইকেট ৫৫ রানে। স্টিভ স্মিথের ৭১ ছাড়া অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসে বড় কোনো প্রতিরোধই তৈরি হতে দেননি হাসান। অস্ট্রেলিয়া থেমে যায় মাত্র ১৯৮ রানে।
এ জায়গাটিই ছিল ম্যাচের প্রথম বড় বাঁক। হাসানের বোলিংয়েই ২০০’র আগে গুটিয়ে যাওয়া অজিদের মনে সন্দেহ ঢুকে যায়— এই টেস্টটা হয়তো তাদের নয়। দ্বিতীয় ইনিংসে আরও ৩ উইকেট নিয়ে হাসান বুঝিয়ে দেন প্রথম ইনিংসের সাফল্য বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ম্যাচে মোট ৯ উইকেট। শেষ পর্যন্ত ম্যাচসেরাও হয়েছেন এই পেসার।
এরপর তানজিদের ব্যাট
অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংয়ে হাসানের আঘাতের পর বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের সামনে ছিল বিশাল পরীক্ষা। সেই চাপটা নিজের কাঁধে নেন তানজিদ হাসান। তার টেস্ট ক্যারিয়ার মাত্র দুই ইনিংসের। তার সামনে মিচেল স্টার্ক, জশ হ্যাজেলউড, প্যাট কামিন্সরা। তানজিদ ভয় পেলেন না। নিজের ছন্দ ধরে আধুনিক ব্যাটিং করে এগোলেন। তারপর পৌঁছে গেলেন তিন অঙ্কে, ১০১ রান। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের প্রথম সেঞ্চুরি। তার সঙ্গে নাজমুল হোসেন শান্তর ৮৪ রানের ইনিংসও বাংলাদেশকে এগিয়ে নেয়। দুজনের ৯৩ রানের জুটি বড় স্কোরের পথ দেখায়।
মিরাজের অলরাউন্ড নৈপুণ্য
বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসে মিরাজ শেষদিকে একাই লড়লেন। তার ৬৫ রানের ইনিংসে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্টে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দলীয় স্কোর পেয়ে যায় বাংলাদেশ। মিরাজের লড়াইটা ছিল চ্যালেঞ্জিং। শেষদিকে টেলএন্ডারদের নিয়ে উপহার দিয়েছেন দুটি ৪৭ রানের জুটি। সঙ্গ দিয়েছিলেন হাসান মাহমুদ ও তাসকিন আহমেদ; দুজনের ব্যাট থেকেই আসে ১৪ রান। বাংলাদেশের স্কোর ৪২৬। অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসের চেয়ে ২২৮ রান বেশি।
অস্ট্রেলিয়া দ্বিতীয় ইনিংসে লড়াইয়ে ফিরতে চেয়েছিল। ক্যামেরন গ্রিন সেই লড়াইয়ের সবচেয়ে বড় নাম। প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ব্যাট করে ১০৪ রান করলেন তিনি। ব্যাট হাতে দলকে নিরাপদ অবস্থানে তুলে দেওয়া মিরাজ এবার বল হাতে অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরোধের সুরটা কেটে দিলেন ক্যারিয়ারে ১৫তম বার ইনিংসে ৫ উইকেট নিয়ে।
প্রস্তুতি ম্যাচের ৫৪ থেকে ৪২৬
মাত্র কয়েক দিন আগে যে দল ৫৪ রানে অলআউট হয়েছিল, সেই দলই অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম ইনিংসে ৪২৬ রান করেছে। অস্ট্রেলিয়াকে দুই ইনিংসেই ৩০০ রানের নিচে অলআউট করেছে।
এ জয় তাই বাংলাদেশের টেস্ট মানসিকতা পরিবর্তনের জয়। এ সাফল্যে তাকিয়ে অনেকদূর এগোতে পারবে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে বাংলাদেশ বড় দলের বিপক্ষে ভালো খেলতে পারে, কিন্তু ধারাবাহিকতা রাখতে পারে না— ডারউইনে নিজেদের নিয়ে এই ধারণায় চ্যালেঞ্জ করেছে বাংলাদেশ দল। কোনো এক সেশন জিতে নয়, কোনো একটি দিন জিতে নয়, টানা চার দিনে ছোট লড়াই জয়ের ধারাবাহিকতায় অস্ট্রেলিয়া-বধ বাস্তব করেছে এই বাংলাদেশ দল, তিন নায়কের অসাধারণ পারফরম্যান্সে।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম টেস্ট জয় তাই শুধু একটি জয় নয়। এটি বাংলাদেশের ক্রিকেটে একটি নতুন বিশ্বাসের জন্ম। বড় দলকে হারানোর সামর্থ্য বাংলাদেশের আছে। এখন সেই সামর্থ্যকে অভ্যাসে পরিণত করার পালা।






