সাহসী সিদ্ধান্তে দাপুটে জয়

পাকিস্তানকে টানা তিন টেস্ট হারালো বাংলাদেশ। ছবি: মোশারফ হোসেন
পাঁচটা দিন, পাঁচটা সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত। টেস্ট ক্রিকেটে পাঁচ দিনের এ লড়াই শরীর থেকে যতটা শক্তি নিংড়ে নেয়, তার চেয়েও বেশি চাপ ফেলে স্নায়ুর ওপর। প্রথম দিনে যে সিদ্ধান্তটা মনে হয় সবচেয়ে কার্যকর, চতুর্থ দিনে এসে সেটিই মনে হতে পারে বড় ভুল। বাংলাদেশের অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত সাহসটা দেখিয়েছেন নিজেদের সিদ্ধান্তে অটল থাকার, আস্থা রেখেছেন দলের পরিকল্পনায়, সতীর্থদের সামর্থ্যে। সবকিছু একবিন্দুতে মিলেছে পঞ্চম দিনের শেষ বিকালে। তাতেই প্রথমবারের মতো টেস্টে পাকিস্তানকে হারানো গেছে বাংলাদেশের মাটিতে।
মিরপুরের শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে টেস্ট জয়ের জন্য নিরাপদ পথে হাঁটতেই পারত বাংলাদেশ। স্পিনসহায়ক উইকেট বানিয়ে, একাদশে বাড়তি একজন স্পিনার খেলিয়ে সাড়ে তিন দিনেই খেলা শেষ করার পরীক্ষিত সূত্রে। কিন্তু শান্ত চেয়েছেন ব্যাট আর বলের লড়াইটা হোক সমানে সমান। তাই তো ঘাসে ছাওয়া স্পোর্টিং উইকেটই বেছে নিয়েছেন লড়াইয়ের মঞ্চ হিসেবে। যে উইকেটে শেষ দিনের শেষ বিকালে এসেছে হারজিতের ফয়সালা, পাকিস্তানকে ১০৪ রানে হারিয়ে বাংলাদেশ যখন দুই ম্যাচের সিরিজে ১-০-তে এগিয়ে গেল, তখনো দিনের নির্ধারিত খেলার ২৩ ওভারের বেশি বাকি।
সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে সেটা বাস্তবায়নের দায়িত্বটাও নিতে হয়। অধিনায়ক হিসেবে সেটা করে দেখিয়েছেন শান্ত। প্রথম ইনিংসে ১০১ রানের পর দ্বিতীয় ইনিংসে ৮৭। একটা সময় বাংলাদেশের কোনো ব্যাটসম্যান এই রানটা এক ইনিংসে করলেই তৃপ্ত হয়ে পরের দুটো সিরিজের দলে থাকার ব্যাপারে নিশ্চিন্ত থাকতেন।
১৮৮ রান করার পরও শান্তর রান করার খিদেটা মরেনি, ‘আমার মনে হয় দ্বিতীয় ইনিংসে ইনিংসটা আরও বড় হতে পারত। যেভাবে ব্যাটিং করছিলাম, উইকেটটা অনেক চ্যালেঞ্জিং ছিল, বিশেষ করে প্রথম দুই-তিন ঘণ্টা। দ্বিতীয় ইনিংসে আমি যেভাবে ব্যাটিং করতে চেয়েছি, করতে পেরেছি। তৃতীয় বা চতুর্থ দিনে উইকেট ব্যাটিংয়ের জন্য কঠিন। সব মিলিয়ে ব্যাটিং ভালো হয়েছে, তবে প্রথম ইনিংসটা আরও বড় হতে পারত।’
মুমিনুল হকের ব্যাটে রান এলেও রান তোলার গতিটা ছিল মন্থর, তা নিয়ে বাইরে থেকে টুকটাক সমালোচনা তার কান এড়ায়নি। ম্যাচ জেতার পর এ নিয়ে খানিকটা উষ্মা, ‘একটা জিনিস বুঝতে হবে যে উইকেট, কন্ডিশন এবং প্রতিপক্ষের বোলিং আক্রমণ বোঝাটা গুরুত্বপূর্ণ। গতকাল (চতুর্থ দিন) আমাদের রানও করতে হতো, আবার উইকেটও ধরে রাখতে হতো— না হলে এই দল (পাকিস্তান) আরামে জিতে যেত। কন্ডিশন ও প্রতিপক্ষের শক্তিমত্তা অনুযায়ী আমাদের যে ব্যাটিং করার দরকার ছিল, আমরা ঠিক ওভাবেই করেছি। আজকের (পঞ্চম দিনে) ব্যাটিংটা গতকালের কারণেই একটু আক্রমণাত্মক হতে পেরেছে। ব্যাটসম্যানরা কেন সময় নিয়ে খেলছে বা কেন দ্রুত রান তোলার চেষ্টায় খেলছে— এ বোধটা আমাদের সবার থাকা উচিত।’
খেলার পঞ্চম দিনে মধ্যাহ্নভোজের বিরতির খানিক আগে ইনিংস ঘোষণা করে দেওয়াটাও ছিল শান্তর মাস্টারস্ট্রোক। অধিনায়ক জানতেন, বুমেরাং হয়ে তার দিকেও আসতে পারে ফলটা, তবুও সতীর্থদের ওপর আস্থা হারাননি, ‘ব্যাটিংয়ে আমরা সকাল থেকে স্পষ্ট ছিলাম আমরা কী করতে চাই। আমাদের সত্যিই ইচ্ছা ছিল আরও ১৫-২০টা রান করার, তবে কখনো আমার মনে হয় যে এরকম সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়াটাও জরুরি। আমরা দল হিসেবে আস্তে আস্তে বড় হচ্ছি এবং (র্যাংকিংয়ে) ওপরের দিকে যাচ্ছি। এ সাহসী সিদ্ধান্তটা আমাদের সামনের দিকে অনেক সাহায্য করবে। এ সিদ্ধান্তটা নেওয়ার পেছনে কারণ হলো আমাদের বোলিং আক্রমণ। ভালো পাঁচটা বোলার আছে বলেই এ সাহসগুলো নিতে পারছি। তবে বোলিং ইউনিটে আরও উন্নতির জায়গা আছে। ধারাবাহিকতা বাড়লে ভবিষ্যতে আরও এরকম সিদ্ধান্ত নিতে পারব।’
আরেকটা প্রশ্নের উত্তরে এ প্রসঙ্গে শান্ত বলেছেন, ‘এ টেস্টে আমরা যে ইনিংস ঘোষণা করেছি, সেটা অনেক বড় সিদ্ধান্ত ছিল, যেটা আমাদের দল সাধারণত করে না। এ সিদ্ধান্তটা ভবিষ্যতে আমাদের আরও আত্মবিশ্বাস দেবে যে, এভাবেও ম্যাচ জেতা সম্ভব। এটা টেস্টের সবচেয়ে নতুন একটা দিক।’
প্রথাগত স্পিনসহায়ক উইকেটের বদলে স্পোর্টিং উইকেট বেছে নেওয়া, একাদশে তিন পেসার খেলানো, ঝুঁকি নিয়ে ইনিংস ঘোষণা করা এবং জয়ের জন্য ঝাঁপানো— অধিনায়ক হিসেবে শান্ত এ সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। নিজে রান করে উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন, সতীর্থদের কাছ থেকেও আদায় করে নিয়েছেন সেরাটা। এ সবকিছুর যোগফলেই এসেছে পাকিস্তানের বিপক্ষে ১০৪ রানের জয়, যা আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের এই (২০২৫-২৭) চক্রে বাংলাদেশের প্রথম জয়।






