পেস বোলিংই বাংলাদেশের নতুন পরিচয়

মোস্তাফিজদের আরও শাণিত করেছেন শন টেইট। ছবি: সংগৃহীত
নিউজিল্যান্ডের ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক টম ল্যাথাম বাংলাদেশে আসার আগে বলেছিলেন, ‘আমরা জানি যে স্পিন বোলিং খেলাটা এখানে বড় ভূমিকা রাখবে এবং পরিবেশটা নিউজিল্যান্ডের তুলনায় ভিন্ন হবে’। পরিবেশটা নিউজিল্যান্ডের চাইতে আলাদাই, আরামদায়ক আবহাওয়া থেকে গ্রীষ্মের কাঠফাটা গরম। এই গরমে বাংলাদেশের পেসাররাও যে বল হাতে আগুন ঝরাবেন, সেটা ল্যাথাম কেন, কেউই আঁচ করতে পারেনি। এই সাফল্যের কৃতিত্ব পেস বোলিং কোচ শন টেইট থেকে শুরু করে ট্রেনার এমনকি প্রধান কিউরেটর টনি হেমিংয়েরও খানিকটা পাওনা।
গত অক্টোবরে ওয়েস্ট ইন্ডিজ যখন খেলতে এল ঢাকায়, মিরপুরের উইকেটের সঙ্গে তখন স্পিনারদের মিতালি। প্রথম ম্যাচটাও তাও পেসাররা কয়েক ওভার বল করেছিলেন, দ্বিতীয় ওয়ানডেতে ৫০ ওভারই স্পিনারদের দিয়ে করিয়েছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। বাংলাদেশও স্পিন করেছিল ৪২ ওভার!
পরের ওয়ানডে সিরিজ এই বছরের মার্চে। মাস পাঁচেকের ব্যবধানেই মিরপুরের উইকেটের চরিত্র বদল। টার্ফ ম্যানেজমেন্টের প্রধান টনি হেমিং আর মিরপুরের শেরে বাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামের কিউরেটর বদিউল আলম খোকন মিলে ‘ধানক্ষেত’ খেতাব পেয়ে যাওয়া উইকেটে দিয়েছেন গতির ছোঁয়া। কালচে মাটির সেই উইকেটকে বিদায় করে তাতে দিয়েছেন ঘাসের সবুজ আভা।
নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ৩ ম্যাচে ৮ উইকেট নিয়েছেন নাহিদ রানা। ছবি: সংগৃহীত
প্রথম ওয়ানডেতেই নাহিদ রানার ৫ উইকেট শিকার আর শেষ ওয়ানডেতে তানজিদ হাসান তামিমের সেঞ্চুরিতে বাংলাদেশ প্রমাণ করেছে, ২২ গজে ব্যাট বলের ভারসাম্য থাকলে স্পিন নির্ভরতা কমিয়ে আনা যায়। সেই সিরিজে বাংলাদেশের ৩ পেসার মিলে নিয়েছিলেন ১৯ উইকেট। নাহিদের শিকার ৮, তাসকিনের ৬ আর মোস্তাফিজের ৫। পাকিস্তানকে ৩ ম্যাচেই অলআউট করেছিল বাংলাদেশ, ৩০ উইকেটের ভেতর ১৯টাই পেসারদের, শতকরা হিসেবে ৬৩.৩৩% উইকেট নেন ৩ পেসার মিলেই।
নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজের প্রথম ম্যাচে উইকেট খানিকটা হতাশ করে বাংলাদেশকে। ২১ রানের হারের পর সাইফ হাসান এসে বলেছিলেন, ‘একটা ধারণা ছিল কী রকম উইকেট হতে পারে, কিন্তু আজকে একটু বেশি অসমান (বাউন্স) হয়েছে।’ তবে সেই উইকেটেও ১৬ মাস পর ওয়ানডেতে ফিরে চমৎকার বোলিং করেছিলেন শরিফুল ইসলাম। সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচটা খেলা হয়েছে ভিন্ন উইকেটে, সেখানে নাহিদের বৈশাখি ঝড় এর পাশাপাশি তাসকিন-শরিফুলও পেয়েছেন সাফল্য, আর শেষ ম্যাচটায় একাদশে সুযোগ পেয়েই নিজের ভেলকি দেখিয়েছেন মোস্তাফিজুর রহমান। প্রায় ৬ বছর পর ওয়ানডে ম্যাচে পেলেন ৫ উইকেট।
নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজে প্রতিপক্ষের ২৮ উইকেট নিয়েছেন বাংলাদেশের বোলাররা, দুইবার অলআউট ও প্রথম ম্যাচে ৮ উইকেট। নাহিদ রানার ৮ উইকেটের সঙ্গে মোস্তাফিজ-শরিফুল, দুই বামহাতি পেসার নিয়েছেন ৫টি করে উইকেট। তাসকিন নিয়েছেন ৩ উইকেট। সঙ্গে সিমিং অলরাউন্ডার সৌম্য সরকারও একটি উইকেট নেয়ায় ২৮ উইকেটের ২৩টিই গেছে পেসারদের পকেটে। শতকরা হিসেবে ৮২% উইকেটই নিয়েছেন পেসাররা।
বাংলাদেশ দলের পেস বোলিং কোচ ও সাবেক অস্ট্রেলিয়ান পেসার শন টেইট একটি সাক্ষাৎকারে বলেছেন যে বাংলাদেশের বোলিংয়ের মূল শক্তি এখন পেস বোলিং, তবে লোকে সেটা মানতে নারাজ। ইএসপিএনক্রিকইনফোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে টেইট বলেছেন, ‘আমার মনে হয় বাংলাদেশ ক্রিকেটে এমন একটি সংস্কৃতি রয়েছে যেখানে তারা এখনও এই ধারণাটি মেনে নিতে পারেনি যে ফাস্ট বোলিংই তাদের শক্তির জায়গা। সত্যি বলতে কী, বর্তমানে আমাদের শক্তি ঠিক কোনটি তা অনেকেই জানেন। তবে বাংলাদেশ ক্রিকেট এটা মেনে নেওয়ার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত কি না, তা নিয়ে আমি নিশ্চিত নই’।
শরিফুল-তাসকিনরা এখন আরও পরিণত। ছবি: সংগৃহীত
যদিও বাংলাদেশের নবনিযুক্ত প্রধান নির্বাচক ও সাবেক অধিনায়ক হাবিবুল বাশার মনে করেন, বাংলাদেশ দলের পেস বোলিং বিভাগটা নিয়েই তার দুশ্চিন্তা সবচেয়ে কম, ‘আমরা খুব ভাগ্যবান যে এখানে রোটেশন করলেও সমস্যা হয় না। এই ডিপার্টমেন্ট বেশ সমৃদ্ধ। বাইরে যারা আছেন তারা ভেতরে যারা আছেন তাদের মতোই ভালো। ইনজুরি ম্যানেজমেন্টের কিছু ব্যাপার থাকবে কারণ ওয়ার্কলোডের কিছু ব্যাপার আছে। আমাদের বাইরে যারা আছে তারা বেশ ভালো। হাসান মাহমুদ, তানজিম সাকিব বাইরে বসে আছে। তারাও খুব ভালো বোলার। কম্পেয়ার করলে খুব বেশি পার্থক্য খুঁজে পাবেন না। যারা দলের বাইরে তারা যথেষ্ট অভিজ্ঞ’।
টেইটও এই কথাটাই বলেছেন একটু অন্যভাবে, ‘আমার মনে হয় একজন কোচ হিসেবে—আপনি ব্যাটিং কোচ হোন বা বোলিং কোচ—আপনার সময়ের একটা বড় অংশ ব্যয় হয় লাইনে থাকা পরবর্তী খেলোয়াড়টির পেছনে। প্রকৃতপক্ষে, কোচ হিসেবে আপনার অর্ধেক কাজই হলো এটি’।
বাংলাদেশ দলে পেস বোলিং বিভাগে যত সহজে একজনের বিকল্প খুঁজে পাওয়া যাবে, ঠিক ততটাই কঠিন অফ ফর্মে থাকা কোন ব্যাটসম্যানের বদলে তার থেকে ভাল কাউকে খুঁজে পাওয়া। আফিফ হোসেনের বদলে সৌম্য সরকারকে দলে নেয়ার পর রীতিমতো দলের ব্যাটিং লাইন-আপই বদলে ফেলতে হল তাকে তিনে খেলাতে গিয়ে। কিন্তু সৌম্য সেই আস্থার প্রতিদান দিতে পারলেন কোথায়?
একটা সময় বাংলাদেশ মানেই ছিল বোলিংয়ে বামহাতি স্পিনারের ছড়াছড়ি। ২০০৭ বিশ্বকাপে সাকিব আল হাসান, আব্দুর রাজ্জাক আর মোহাম্মদ রফিকের ত্রয়ী; টেস্টে দীর্ঘদিন সাকিব ও তাইজুল ইসলাম বল করেছেন দুই প্রান্তে। নতুন বলটাও জুটত না পেসারের হাতে, সাকিব তো আফগানিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট একাদশ সাজিয়েছিলেন পেসার ছাড়াই।
সেখান থেকে পেস বোলিংয়ে চোখে পড়ার মত উত্থান, এই যাত্রাটায় অ্যালান ডোনাল্ড থেকে ওটিস গিবসন এবং এখন শন টেইট; অবদান আছে প্রত্যেকেরই। সেই সঙ্গে দলের বর্তমান ট্রেনার ইফতি, কিংবা বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে তানজিম সাকিব- শরিফুলদের নিয়ে কাজ করা রিচার্ড স্টোনিয়েরের অবদানটাও কম নয়। তারা পেসারদের শরীরটাকে গড়ে না দিলে বৈশাখের এই তীব্রগরমে কোনরকম চোট ছাড়াই পেসাররা ৩টা ম্যাচ খেলতে পারতেন না!



