অস্ট্রেলিয়াকে হারাতে পারলে কী কী হয়?
- ২৩ বছরের অবজ্ঞা-উপেক্ষার জবাব হয়
- ক্রিকেটের রথী-মহারথীদের আলোচনার বিষয় হয়
- ইংলিশদের সুযোগ হারানোর আক্ষেপও বেড়ে যায়
- বাংলাদেশকে শ্রদ্ধা দেখানোর কথাও বলে অজিরা

সংগৃহীত ছবি
ডারউইন টেস্ট জয়কে বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত বলেছেন, দেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সাফল্য। কিন্তু কেন? এমন তো নয়, অস্ট্রেলিয়াকে আগে কখনো টেস্টে হারাতে পারেনি বাংলাদেশ? অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অস্ট্রেলিয়াকে হারানো কেন এত মাহাত্ম্যপূর্ণ?
মুশফিকুর রহিমের নেতৃত্বে ২০১৭ সালে মিরপুরে অস্ট্রেলিয়াকে ২০ রানে হারিয়েছিল, সেই দলে অস্ট্রেলিয়ার বর্তমান দলের স্টিভেন স্মিথ, জশ হ্যাজেলউড, প্যাট কামিন্স, নাথান লায়নরা ছিলেন। ২০০৫ সালে কার্ডিফে অস্ট্রেলিয়াকে প্রথমবার ওয়ানডেতে হারিয়েছিল বাংলাদেশ, রিকি পন্টিংয়ের নেতৃত্বে মাঠে নামা সেই দলটায় অস্ট্রেলিয়ার সর্বকালের সেরাদের কয়েকজন ছিলেন। ১৯৯৯ থেকে ২০০৭— এ তিনটি ওয়ানডে বিশ্বকাপ জেতা অস্ট্রেলিয়া ছিল অশ্বমেধের ঘোড়া, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের শুরুর সময়ে সেই দলকে হারিয়ে দেওয়ার কৃতিত্ব কি কম? অবশ্যই নয়, তবে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অস্ট্রেলিয়াকে হারানো স্রেফ একটা ক্রিকেট ম্যাচে জয় নয়। ২৩ বছরের বঞ্চনার জবাব, উপেক্ষার উত্তর।
২০০০ সালে টেস্ট মর্যাদা পায় বাংলাদেশ, ২০০৩ সালে অস্ট্রেলিয়া সফরের সুযোগ আসে আর অস্ট্রেলিয়াও বাংলাদেশে আসে ২০০৬ সালে। অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট গ্রীষ্মের সূচির বাইরে, ডারউইন ও কেয়ার্নসে দুটি টেস্ট খেলেছিল বাংলাদেশ, খুব স্বাভাবিকভাবেই টেস্ট ক্রিকেটের পথচলায় তৃতীয় বছরে পা রাখা একটা দলের পক্ষে সম্ভব হয়নি স্টিভ ওয়াহদের বিপক্ষে দারুণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তোলা। তিন বছর পর বাংলাদেশ সফরে আসে অস্ট্রেলিয়া, শাহরিয়ার নাফীসের সেঞ্চুরি আর মোহাম্মদ রফিকের ৫ উইকেটে ফতুল্লায় অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম ইনিংসে লিড নিয়েও পরের ইনিংসে ব্যাটিং ব্যর্থতা আর রিকি পন্টিংয়ের অসাধারণ এক সেঞ্চুরিতে ম্যাচটি ৩ উইকেটে হেরে যায় বাংলাদেশ।
এরপর চট্টগ্রাম টেস্টে জেসন গিলেস্পির ডাবল সেঞ্চুরি, এটাই বাংলাদেশ দল সম্পর্কে অস্ট্রেলিয়ানদের মনে তৈরি করে নেতিবাচক মানসিকতা। গিলেস্পির মতো বোলার যাদের বিপক্ষে ডাবল সেঞ্চুরি করে ফেলে, তাও নাইটওয়াচম্যান হিসেবে নেমে, তারা আর কী খেলবে! যে কারণে বছর দুই পর,বাংলাদেশের অস্ট্রেলিয়া সফরের সূচি থাকলেও হাস্যকর কারণে সেটি বাতিল করে দেয় অস্ট্রেলিয়া। সে সময় ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার প্রধান নির্বাহী জেমস সাদারল্যান্ড জানিয়েছিলেন, বেইজিং অলিম্পিকের সঙ্গে বাংলাদেশের সফরসূচি সাংঘর্ষিক, সেই সময় কোনো সম্প্রচারক পাওয়া যাবে না। তাই সিরিজ দুই বছর পিছিয়ে ২০১০ সালে নেওয়া হয়।
তবে ২০১০ সালেও বাংলাদেশ যায়নি অস্ট্রেলিয়া সফরে। ২০১৮ সালেও অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার কথা ছিল বাংলাদেশের, তবে সেবার ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া স্পষ্টভাবেই জানিয়ে দেয় যে, বাংলাদেশের সঙ্গে সিরিজ আয়োজন তাদের জন্য আর্থিকভাবে অলাভজনক। তখন তাদের ঘরোয়া ফুটবলের মৌসুম, কেউ খেলা দেখাবে না, তাই বাংলাদেশকে তারা আমন্ত্রণ জানাবে না।
শুধু তাই নয়, বারকয়েক বাংলাদেশ সফরে আসাও পিছিয়েছিল অস্ট্রেলিয়া। কখনো অজুহাত ব্যস্ত সূচি, কখনো নিরাপত্তা। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ অনূর্ধ-১৯ বিশ্বকাপের স্বাগতিক, নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে দল পাঠায়নি অস্ট্রেলিয়া। ২০১৫ সালে নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে বাংলাদেশ সফর বাতিল করে অস্ট্রেলিয়া, যদিও একই বছরে মাস দেড়েকের ব্যবধানে ফিফা বিশ্বকাপের বাছাই পর্বের ম্যাচ খেলতে ঢাকায় আসে অস্ট্রেলিয়ার ফুটবল দল। ২০১৭ সালে যদিও বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন স্মিথ-ওয়ার্নাররা, দুই টেস্টের সিরিজের একটিতে হেরেছিলেন ২০ রানে। তবে মিরপুরের পুরনো চেহারায় সেই উইকেটে জেতা অনেকটাই নকল করে পরীক্ষা পাসের মতো, সনদ মেলে তবে সম্মান মেলে না।
২০২১ সালে পঁাচ ম্যাচের টি-টোয়েন্টি খেলতে অস্ট্রেলিয়া আসতে রাজি হয় বাংলাদেশে, তবে তিন শর্তে। তখন করোনাকাল, খেলা আয়োজন করা হচ্ছে জৈব নিরাপত্তার বলয়ে। অস্ট্রেলিয়া দলকে বিমানবন্দরের টারম্যাক থেকেই সরাসরি হোটেলে আনা হবে, সেই হোটেলে দুই দলের খেলোয়াড়-কর্মকর্তা ছাড়া কোনো অতিথি থাকবে না আর খেলা হবে একটাই ভেন্যুতে। সব শর্ত মানার পর অস্ট্রেলিয়া যে দল পাঠাল, তাতে ডেভিড ওয়ার্নার, প্যাট কামিন্স, গ্লেন ম্যাক্সওয়েলসহ নিয়মিত দলের ছয়জন নেই! তারা বাংলাদেশ সফর থেকে অব্যাহতি চেয়েছেন বাবল ফ্যাটিগ আর আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আগে বিশ্রামের জন্য।সবশেষ কিছুদিন আগেও অস্ট্রেলিয়ার যে দলটি ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি সিরিজ খেলে গেল বাংলাদেশে, সেখানেও নিয়মিত ক্রিকেটাররা অনুপস্থিত। বছরের পর বছর ধরে এ অবজ্ঞা আর উপেক্ষার জবাবই যেন বাংলাদেশ দিল ডারউইনে সাড়ে তিন দিনে পূর্ণশক্তির অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে।
পুকুরে ঢিল ছুড়লে যে তরঙ্গ সৃষ্টি হয়, তাকে ইংরেজিতে বলে রিপল ইফেক্ট। বাংলায় যাকে বলা যায় সুদূরপ্রসারী প্রভাব। শুধু দুই দলের খেলোয়াড় বা খেলার সঙ্গে সম্পৃক্তরাই নয়, বাংলাদেশের কাছে অস্ট্রেলিয়ার ৯ উইকেটে হার ছিল গত ২৪ ঘণ্টায় ক্রিকেটের রথী-মহারথীদের আলোচনার প্রধান বিষয়। ইয়ান বিশপ থেকে ওয়াসিম আকরাম, রিকি পন্টিং থেকে স্টুয়ার্ট ব্রড, অনেকেই বিভিন্ন মাধ্যমে বাংলাদেশের এই দাপট দেখানো জয়ে অস্ট্রেলিয়ার খারাপ খেলার চেয়ে কৃতিত্ব দিচ্ছেন বাংলাদেশকে।
ফর দ্য লাভ অব ক্রিকেট নামের এক অনুষ্ঠানের সহ-প্রযোজক জস বাটলার ও স্টুয়ার্ট ব্রড। ইংল্যান্ডের ক্রিকেট দলের অনেকেই আসেন এ অনুষ্ঠানে অতিথি হয়ে। স্টিভেন ফিন ও ব্রড আলোচনায় এসে আলাপ করছিলেন ইংল্যান্ডের আক্ষেপ নিয়ে, যে সবশেষ অ্যাশেজে অস্ট্রেলিয়াকে বাগে পেয়েও কীভাবে সুযোগ হাতছাড়া করেছে তাদের একসময়ের সতীর্থরা। বিশেষ করে অ্যাডিলেডে অ্যালেক্স ক্যারিকে সেঞ্চুরি করতে দেওয়া; যে ভুলটা করেনি বাংলাদেশ। একমুহূর্তের জন্যও ফাঁস আলগা করেনি। ব্রড প্রশংসা করেছেন বাংলাদেশের দীর্ঘ সময় প্রথম ইনিংসে ব্যাট করার। সেই সঙ্গে হাসান মাহমুদের নিখুঁত লাইন এবং লেন্থের, ট্রাভিস হেডকে নিয়ে পরিকল্পনার।
উসমান খাজা অবসর নিয়েছেন অ্যাশেজ খেলে, তার অবসরের পর এটিই অস্ট্রেলিয়ার প্রথম টেস্ট। ইনস্টাগ্রামে এক ভিডিও বার্তায় উসমান খাজা বলেছেন, “বাংলাদেশ হারিয়ে দিয়েছে অস্ট্রেলিয়াকে। বেশ কিছু শিরোনাম, বেশ কিছু গণমাধ্যমে দেখছি, লোকে বলছে যে, এ হার অস্ট্রেলিয়ার জন্য অপমানজনক, অসম্মানের। দেখুন, টেস্ট ক্রিকেটে দুই দলই জেতার জন্য নামে, খেলার সৌন্দর্যটাই এখানে। আমি জানি বিশ্বের এক নম্বর দল হিসেবে আমাদের (অস্ট্রেলিয়া) জয়ই ছিল প্রত্যাশিত, তবে দয়া করে বাংলাদেশকেও সম্মান দিন। তারা সব জায়গায় আমাদের হারিয়ে দিয়েছে। একদম শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত, তাদের জন্যও একটু প্রশংসা রাখুন। বলুন, ‘ভালো খেলেছ, পরের ম্যাচে দেখা হবে’।”
খাজা যোগ করেন ‘আমি বুঝতে পারি না লোকজন কেন বাংলাদেশের প্রতি শ্রদ্ধা দেখাচ্ছে না। আমি শুধু বলতে চাই, অস্ট্রেলিয়া অবশ্যই একটা ভালো দল, তবে বাংলাদেশ দুর্দান্ত খেলেই তাদের হারিয়েছে।’
২০২৪ সালে ব্রিসবেনে অস্ট্রেলিয়াকে ৮ রানে হারিয়েছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ, শামার জোসেফ নামের এক তরুণের অসাধারণ বোলিং নৈপুণ্যে। এরপর কমেন্ট্রি বক্সে দেখা গেল এক অদ্ভুত দৃশ্য। ব্রায়ান চার্লস লারা কাঁদছেন, কার্ল হুপার কাঁদছেন। লারা এক তরুণ ফ্যানের মতো গিয়ে শামার জোসেফের ইন্টারভিউ নিলেন। কারণ, ১৯৯৭ সালের পর প্রথম ওয়েস্ট ইন্ডিজ টেস্ট জিতল অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে। ২৭ বছর, কয়েকটা প্রজন্মের খেলোয়াড়ের খেলোয়াড়ি জীবনই শেষ হয়ে গেছে এ সময়ে। সেখানে বাংলাদেশ, ২৩ বছর পর খেলতে গেল অস্ট্রেলিয়ায়। প্রথম টেস্টেই জিতল, ৯ উইকেটে। প্রতিটি সেশনে দাপট দেখিয়ে, ঠিক যেভাবে অস্ট্রেলিয়া ধ্বংস করে তাদের প্রতিপক্ষকে। জয়ের পর সবাই একদম স্বাভাবিক। মাঠের ভেতর কোনো বাড়তি উত্তেজনা নেই, কোনো উদযাপনের আতিশয্য নেই। যেন এ জয় রোজকার ব্যাপার।
অস্ট্রেলিয়ায় খেলতে আসার আগে সতীর্থদের নিয়ে একটি বৈঠক করেছিলেন শান্ত। ম্যাচ শেষে ড্রেসিংরুমেও বলেছেন, ‘এ সিরিজ শুরুর আগে আমরা বসেছিলাম। একটি জিনিস আমি সবার কাছে চেয়েছিলাম যে, যেটি আমরা মুখে বলি কিন্তু কাজে করি না। প্রত্যেক ক্রিকেটার মাঠে যে ক্যারেক্টার শো করেছে, সেটি অধিনায়ক হিসেবে আমার জন্য দেখা খুব রোমাঞ্চকর ছিল। আমি খুবই গর্বিত। তবে আগামীতে, এ ধরনের মিটিং আর করতে চাই না আমরা। এ কাজগুলো নিয়মিত ধারাবাহিকভাবে করতে চাই আমরা। মুখে নয়, কাজে করে দেখাব।’
দীর্ঘদিনের বঞ্চনা আর উপেক্ষার জবাব এভাবেই দিলেন শান্তরা। ব্যাটের ভাষায়, প্রতিপক্ষ যে ভাষাটা সবচেয়ে ভালো বোঝে এবং জানে।









