৭ দ্রষ্টা
এ দেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের ভিত্তি তৈরি কাজী জাকেরের হাতে

প্রফেসর কাজী জাকের হোসেন (১ জানুয়ারি ১৯৩১ – ২১ জুন ২০১১)
বাংলাদেশে বন্যপ্রাণী ও পরিবেশবিষয়ক গবেষণার ইতিহাস লিখতে গেলে যে কটি নাম অনিবার্যভাবে সামনে আসে, প্রফেসর কাজী জাকের হোসেন তাদের অগ্রভাগে। তিনি একাধারে শিক্ষক, গবেষক, সংগঠক ও চিন্তক ছিলেন। এই বহুমাত্রিক পরিচয়ের মানুষটি শুধু শ্রেণিকক্ষেই নয়, দেশের প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের প্রশ্নেও রেখে গেছেন গভীর ছাপ।
১৯৩১ সালের ১ জানুয়ারি কুমিল্লার লাঙ্গলকোট উপজেলার পাটওয়ার গ্রামে তার জন্ম। শৈশব কেটেছে প্রকৃতির কাছাকাছি, যেখানে পাখির ডাক, গাছের ছায়া আর মৌসুমি পরিবর্তন ছিল প্রতিদিনের সঙ্গী। এই গ্রামীণ অভিজ্ঞতাই তার মনে প্রকৃতি ও প্রাণিজগতের প্রতি এক গভীর টান সৃষ্টি করে। পরে প্রকৃতি ও প্রাণিজগৎ তার জীবনচর্চার মূল সুর হয়ে ওঠে।
শিক্ষাজীবনে ছিলেন মেধাবী ও অনুসন্ধিৎসু। চাঁদপুর ও ঢাকা কলেজ পেরিয়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাণিবিদ্যায় পড়াশোনা করেন। এরপর পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা এবং পরে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি তাকে একজন বৈশ্বিক মানুষে পরিণত করে। বিদেশের এই অর্জন তাকে বিদেশমুখী করেনি; বরং তিনি ফিরে এসেছেন নিজের মাটিতে, নিজের মানুষের জন্য কাজ করতে।
১৯৫৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দিয়ে তিনি শুরু করেন দীর্ঘ শিক্ষাজীবন। ষাটের দশকেই তিনি উপলব্ধি করেন, বাংলাদেশের মতো জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ দেশে বন্যপ্রাণী নিয়ে আলাদা করে গবেষণা ও শিক্ষার প্রয়োজন। তার উদ্যোগেই ১৯৬৭ সালে বিভাগে চালু হয় ‘বন্যপ্রাণিতত্ত্ব’ শাখা, যা পরে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছড়িয়ে পড়ে। তিনি ৯ বছর বিভাগীয় প্রধান এবং জীববিজ্ঞান অনুষদের ডিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, গড়ে তোলেন গবেষণার একটি শক্ত ভিত্তি।
শুধু প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলাই নয়, তিনি ছিলেন একনিষ্ঠ গবেষকও। প্রাণিবিজ্ঞান ও পরিবেশবিষয়ক প্রায় ২০টি গ্রন্থ এবং শতাধিক গবেষণা নিবন্ধ তার কর্মময় জীবনের সাক্ষ্য বহন করে। তার ছাত্রদের অনেকেই আজ দেশে-বিদেশে প্রতিষ্ঠিত গবেষক। এটিও তার উত্তরাধিকার।
কাজী জাকের হোসেনের অবদান শুধু অ্যাকাডেমিক পরিসরেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ১৯৭৩ সালের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি। একই সঙ্গে বিভিন্ন সংগঠন গড়ে তুলে জনসচেতনতা সৃষ্টির কাজও করেছেন নিরলসভাবে।
এই অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি পেয়েছেন স্বাধীনতা পুরস্কারসহ নানা সম্মাননা। ১৯৯০ সালে জাতিসংঘ পরিবেশ সংস্থা তাকে ‘গ্লোবাল ফাইভ হান্ড্রেড রোল অব অনার’ সম্মানে ভূষিত করে। জীবনের শেষ পর্বে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক হিসেবে স্বীকৃতি পান।
২০১১ সালের ২১ জুন মারা যান তিনি। তবে তার কাজ, চিন্তা এবং গড়ে তোলা প্রজন্ম আজও বেঁচে আছে। বাংলাদেশের প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের যে ভিত্তি আজ আমরা দেখি, তার অনেকটাই নির্মিত হয়েছে কাজী জাকের হোসেনের হাতে।




