৭ দ্রষ্টা
আমাদের ঔষধনীতির অন্যতম রূপকার ডা. জাফরুল্লাহ

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী (২৭ ডিসেম্বর ১৯৪১ – ১১ এপ্রিল ২০২৩)
পড়তেন বিলেতের রয়্যাল কলেজ অব সার্জনসে। তার যখন এফআরসিএস চলছে, তখনই শুরু হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ। আর লন্ডনে বসে থাকতে পারলেন না। চূড়ান্ত পর্ব শেষ না করেই লন্ডন থেকে চলে এলেন ভারতে। প্রশিক্ষণ নিলেন আগরতলার মেলাঘরে। এরপর ডা. এম এ মবিনের সঙ্গে মিলে গড়ে তুললেন ৪৮০ শয্যার ‘বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতাল’।
তিনি গরিবের ডাক্তার ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। মুক্তিযুদ্ধের সেই উত্তাল মুহূর্তে, স্বল্প সময়ের মধ্যেই বহু নারীকে তিনি প্রাথমিক চিকিৎসায় প্রশিক্ষিত করেন। অসংখ্য আহত মুক্তিযোদ্ধা সেখানে সেবা পেতে থাকে। তার এই অভূতপূর্ব সেবাপদ্ধতি পরে বিশ্ববিখ্যাত জার্নাল পেপার ‘ল্যানসেট’-এ প্রকাশিত হয়।
স্বাস্থ্য খাতে ডা. জাফরুল্লাহর অবদানের কথা এলে প্রথমে বলতে হয় ঔষধনীতি প্রণয়নে তার ভূমিকার বিষয়ে। যার ওপর দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশের বর্তমান ওষুধশিল্প। ১৯৮২ সালে প্রণীত ঔষধনীতির অন্যতম রূপকার ছিলেন প্রতিভাবান এই চিকিৎসক। ফলে দেশের ওষুধ কোম্পানিগুলো একটি শক্ত ভিত পায় এবং দেশের মানুষ কম দামে ওষুধ পায়।
স্বাধীন বাংলাদেশে ডা. জাফরুল্লাহ গড়ে তোলেন চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠান গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র। গণস্বাস্থ্যের পত্রিকা ‘মাসিক গণস্বাস্থ্য’ সেই ১৯৮০ সাল থেকে প্রকাশিত হয়ে আসছে। সাধারণ জনগণকে সহজ ভাষায় স্বাস্থ্যবিষয়ক বার্তা দিতেই এ পত্রিকা।
তার ঔষধনীতির কারণে দেশের মানুষ এখন কম দামে ওষুধ পাচ্ছে
অনেকেই হয়তো জানেন না, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ ডায়ালাইসিস সেন্টারটি কিন্তু ঢাকায়, তাও আবার গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে। যেখানে স্বল্পমূল্যে ডায়ালাইসিস সেবা দেওয়া হয়। তবে অতিদরিদ্র মানুষদের এ সেবা দেওয়া হয় বিনামূল্যে।
১৯৪১ সালের ২৭ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম জেলার রাউজানে জন্ম নেন এই দেশপ্রেমিক মানুষটি। তার বাবার নাম হুমায়ুন মোর্শেদ চৌধুরী এবং মা হাসিনা বেগম চৌধুরী। বাবা ছিলেন পুলিশ অফিসার আর মা গৃহিণী। ১০ ভাই-বোনের মধ্যে জাফরুল্লাহ চৌধুরী ছিলেন সবার বড়।
জাফরুল্লাহ চৌধুরী পুরান ঢাকার নবকুমার ইনস্টিটিউশন থেকে ম্যাট্রিকুলেশন এবং ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করার পর ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। সেখান থেকে ১৯৬৬ সালে তিনি এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর এফআরসিএস পড়ার জন্য চলে যান লন্ডনে।
মেডিকেল কলেজে পড়ার সময় জাফরুল্লাহ চৌধুরী জড়িয়ে পড়েছিলেন প্রগতিশীল ধারার ছাত্ররাজনীতিতে। তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ ছাত্র সংসদের নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।
জনসম্পৃক্ততা এবং গণমুখী চিকিৎসা ধারণার কারণে বিভিন্ন সময় পেয়েছেন নানা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৭৭ সালে পান স্বাধীনতা পুরস্কার। র্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কার পান ১৯৮৫ সালে । ১৯৯২ সালে পেয়েছিলেন নোবেল প্রাইজের বিকল্প বলে বিবেচিত রাইট লাইভলিহুড অ্যাওয়ার্ড।
ব্যক্তিজীবনে জাফরুল্লাহ ছিলেন সৎ ও পরিশ্রমী। অত্যন্ত সাধাসিধে জীবনযাপন করতেন। ২০২৩ সালের ১১ এপ্রিল তারই প্রতিষ্ঠিত গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে ৮১ বছর বয়সে তিনি মারা যান।






