ধারাবাহিক সাফল্যের জন্য মান বাড়ানো জরুরি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মাঝে মাঝে হঠাৎ ঝলসে উঠলেও অধিকাংশ সময়েই আমাদের ক্রিকেটের অগ্রগতি মন্থর হয়ে পড়ে। রাজনীতির ছায়া থেকে সরে না দাঁড়ালে, ঘরোয়া ক্রিকেটকে আরও প্রতিযোগিতামূলক না করলে আমাদের সাফল্যকে ধারাবাহিক রাখা মুশকিল হবে। ক্রিকেট প্রশাসনকেও চলতে হবে সঠিক পথে
২৫ বছর আগের সঙ্গে এখনকার তুলনা করলে প্রথমেই যেটা বলতে হয় যে, সুযোগ-সুবিধা বেড়েছে অনেক। ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট লিগের প্রচলনের কারণে অর্থের প্রবাহ বেড়েছে, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডও আর্থিকভাবে অনেক হয়েছে সবল। প্রথমবার বিশ্বকাপে খেলার ২৫ বছরেরও বেশি সময় পর খুব স্বাভাবিকভাবেই একটা দেশের ক্রিকেট কাঠামোতে এসব পরিবর্তন আসাটা কাঙ্ক্ষিত, ভবিষ্যতে হয়তো সুযোগ-সুবিধা আরও বাড়বে, খেলাটা হবে আরও জনপ্রিয়। কিন্তু গত দেড়-দুই বছরে বাংলাদেশের ক্রিকেটে যা দেখছি, এভাবেই যদি সব চলতে থাকে, তাহলে দেশের ক্রিকেট এখান থেকে আর এগিয়ে যাবে কি না, তা নিয়েও সন্দেহ আছে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কেনিয়া ২০০৩ বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে খেলেছিল কিন্তু এখন ক্রিকেটের বৈশ্বিক আসরগুলোয় কোনো অস্তিত্ব নেই। একসময় জিম্বাবুয়েও অনেক ভালো দল ছিল, ওয়ানডেতে তারা বড় দলগুলোকে প্রায়ই হারাত কিংবা তাদের বিপক্ষে বড় দলগুলোকেও জিততে অনেক লড়াই-সংগ্রাম করতে হতো। এখন তারা নিচের সারিতে। অন্যদিকে নিউজিল্যান্ড মাঝারি মানের দল ছিল, এখন তাদের বিশ্বের সেরা তিন-চারটা দলের মধ্যে একটা ধরতেই হবে। আইসিসির বৈশ্বিক আসরগুলোতে তারা নিয়মিত ফাইনালে খেলে। এই যে উত্থান আর পতন; এসব অনেকটাই নির্ভর করে সেসব দেশের ক্রিকেট প্রশাসন কীভাবে পরিচালনা করা হচ্ছে তার ওপর। যে দেশ নিজে থেকে বিশ্বকাপে খেলতে যায় না, তাদের জন্য ক্রিকেটে ভালো করা কঠিন। দেশের ক্রিকেট প্রশাসনে বিভাজন স্পষ্ট। ক্লাব ক্রিকেটে ক্রিকেটেরই লোক, একপক্ষ খেলাতে চায় আর একপক্ষ খেলতে চায় না; এরকম হলে তো ক্রিকেটের অগ্রগতি হবে না। যারা বিশ্বকাপ কখনো খেলেনি, তারা বুঝতে পারে একটা বিশ্বকাপ কত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ১৯৮৬ সাল থেকে আইসিসি ট্রফি খেলছে; আমি ১৯৯০, ১৯৯৪ আর ১৯৯৭— এ তিন আসরেই আইসিসি ট্রফি খেলেছি। বিশ্বকাপে খেলার জন্য আমরা যে কতটা কষ্ট করেছি, সেটা এখনকার ক্রিকেটাররা চিন্তাও করতে পারবে না। ১৯৯০ সালে নিয়ম ছিল শুধু চ্যাম্পিয়ন দলটাই বিশ্বকাপে যাবে, সেবার আমরা সেমিফাইনালে হেরে যাই জিম্বাবুয়ের কাছে। এরপর আবার সুযোগ এলো ১৯৯৪ সালে, সেবার তিনটা দলকে বিশ্বকাপে সুযোগ দেওয়া হবে। খুবই ভালো একটা দল নিয়ে সেখানেও আমরা পারলাম না বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে। এরপর আল্লাহর রহমতে আমরা ১৯৯৭ সালে বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করলাম। সেই জায়গা থেকে আজকের তারিখে যদি দেখি, বাংলাদেশের ক্রিকেটে সুযোগ-সুবিধা বেড়েছে অনেক। স্টেডিয়াম বেড়েছে, বিদেশি কোচ এখন অনেক, বয়সভিত্তিক পর্যায়ে ক্রিকেট অনেকটা গভীরে ছড়িয়েছে। এসবের ফলে মাঝের একটা সময় আমাদের বেশ খানিকটা উন্নতি হয়েছিল, ওয়ানডে র্যাংকিংয়ে ছয় নম্বরে উঠেছিল বাংলাদেশ কিন্তু গত কয়েক বছরে আমরা আবার বেশ কয়েক ধাপ নেমে গেছি ।
ক্রিকেট ঘিরে গত কয়েক বছরে যা ঘটেছে, সেসব আসলে কখনো আশা করিনি। প্রকৃত অর্থে ক্রিকেট নিয়ে যারা কাজ করেন, তাদের জায়গায় চলে আসছে ভুঁইফোড় লোকজন ও রাজনৈতিক পরিচয়ধারীরা। ক্রিকেটাররাও ঝুঁকে পড়ছেন রাজনীতির দিকে।
আমি যখন আইসিসি ট্রফি জিতে আসি, তখন আমারও জনপ্রিয়তা ছিল তুঙ্গে। আমি চাইলে যেকোনো রাজনৈতিক দলের টিকিট নিয়ে সংসদ সদস্য হতে পারতাম। কিন্তু আমি রাজনীতিতে যোগ দিইনি। এখন দেখি কে যোগ দেবে— এসব নিয়ে নিজেদের মধ্যেই হচ্ছে কাড়াকাড়ি। এর ফলে সার্বিকভাবে ক্রিকেটারদের গ্রহণযোগ্যতা কমছে। আগে বেশিরভাগ বিজ্ঞাপনেই মডেল হিসেবে ক্রিকেট তারকাদের দেখা যেত, এখন সেই সংখ্যাটা খুবই কম।
টেস্ট বা ওয়ানডেতে শক্তিশালী দলটাই জিতবে, টি-টোয়েন্টিতে সম্ভাবনাটা দুই দলের জন্যই সমান। যে কারণে ছোট দলগুলো টি-টোয়েন্টি বেশি খেলতে চায়। আগামীতে হয়তো টি-টেন আসবে, ১০ বলে কে কত রান করবে এরকম সংস্করণও চলে আসতে পারে
ক্রিকেট হয়তো আগামীতে আরও জনপ্রিয় হবে, আরও বেশি দেশ খেলবে। বিশেষ করে টি-টোয়েন্টির হাত ধরে ক্রিকেটের যে বৈশ্বিক বিস্তার শুরু হয়েছে, তার প্রভাবে অনেক দেশই ক্রিকেটটা খেলতে শুরু করেছে। ইতালি ফুটবলে বাদ পড়ে চলে এসেছে ক্রিকেট বিশ্বকাপে! নেপাল দক্ষিণ এশিয়ার আরেকটা উঠতি দল। তাদের এ উত্থানে কিন্তু বাংলাদেশ সত্যিকারের চাপে পড়ে গেছে। আফগানিস্তান এরই মধ্যে বাংলাদেশকে ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টিতে পেছনে ফেলেছে, টেস্টেও একবার হারিয়ে দিয়েছে। বিশ্বকাপে গিয়ে আমরা র্যাংকিংয়ে ওপরের দিকে থাকা দলগুলোকে হারাতে পারছি না, উল্টো হেরে যাচ্ছি নিচে থাকা দলের কাছে। এর ফলে আমরা র্যাংকিংয়ে পিছিয়ে যাচ্ছি ক্রমাগত। এ জায়গা থেকে উন্নতি করার জন্য ঘরোয়া ক্রিকেটকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করা, মান বাড়ানো ছাড়া কোনো উপায় নেই।
বাংলাদেশ যে বিশ্বকাপ খেলতে অস্বীকৃতি জানাল, তার অন্যতম একটা কারণ আমার কাছে মনে হয় কিছু মানুষের ব্যক্তিগত স্বার্থ। একটা বিশ্বকাপ অনেক ক্রিকেটারের স্বপ্ন, দেশের মানুষের প্রত্যাশার একটা বিরাট জায়গা। বিশ্বকাপ হলো অন্যান্য দেশের সামনে নিজেদের উন্নতি তুলে ধরার একটা বড় সুযোগ। অল্প কয়েকজনের স্বার্থসিদ্ধির জন্য বাংলাদেশের বিশ্বকাপ খেলা হলো না। সফল হলে কেউ কোনো কিছু এত সহজে ছেড়ে দেয় না আর ব্যর্থ হলে থাকে না আগ্রহ। গত কয়েকটা আইসিসি আসরে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স খুবই খারাপ। ২০১৫ সালে বাংলাদেশ কোয়ার্টার ফাইনাল খেলেছে। এর পর থেকে কিন্তু টানা খারাপই করে গেছে বড় আসরে। বিশেষ করে ২০২৩ সালে খুব ভালো প্রস্তুতি, ওয়ানডে সুপার লিগে ওপরের দিকে থেকে বিশ্বকাপে সুযোগ পাওয়া, ঘরের পাশে ভারতে খেলা যেখানকার আবহাওয়া অনেকটা আমাদেরই মতো; সেখানে গিয়ে ভালো করার বড় সম্ভাবনা ছিল। সেখানে গিয়ে অনেক কারণে, কিছুটা কয়েকজন ব্যক্তির নিজস্ব মতবিরোধের কারণেই বাংলাদেশের পক্ষে ভালো করা সম্ভব হয়নি। এ দায়টা মাত্র অল্প কয়েকজনের। একটা দেশের সঙ্গে এরকমটা হওয়া উচিত নয়, এক-দুজনের জন্য সবাইকে ভুগতে হবে। এসব পৃথিবীর অন্য কোথাও ঘটে না। ২০২৩ সালের বিশ্বকাপটায় কেন আমরা এত বাজে খেললাম, সেটা নিয়েও তদন্ত করা দরকার। দুই-তিন বছর ধরে কষ্ট করার পর কার কারণে বাজে খেললাম, কারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সেটা জানা দরকার। বাংলাদেশ দল তো কোনো ব্যক্তিবিশেষের নয়, বাংলাদেশ দল সবার। সবশেষ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপটাও যে বাংলাদেশ খেলল না, সেটাও মাত্র দুই-তিনজনের জন্য। এসব যদি চলতে থাকে, তাহলে কী করে উন্নতিটা হবে?
ক্রিকেটের বাণিজ্যিক স্বার্থটা এখন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। টেস্ট ক্রিকেট অনেকেই খেলতে চাচ্ছে না, অথচ এটাই ক্রিকেটের সত্যিকারের সৌন্দর্য। ওয়ানডে জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে, টি-টোয়েন্টি জনপ্রিয় হচ্ছে। কারণ, টেস্ট বা ওয়ানডেতে দুটো দল মুখোমুখি হলে বেশিরভাগ সময়ে শক্তিশালী দলটাই জিতবে, টি-টোয়েন্টিতে সম্ভাবনাটা দুই দলের জন্যই সমান। যে কারণে ছোট দলগুলো টি-টোয়েন্টি বেশি খেলতে চায়। আগামীতে হয়তো টি-টেন আসবে, ১০ বলে কে কত রান করবে এরকম সংস্করণও চলে আসতে পারে। তবে টেস্ট ক্রিকেট থেকে যাবে বলেই আমার মনে হয়। খেলা হিসেবে ক্রিকেট আরও অনেক জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারে বিশ্বে।
প্রায় শূন্য থেকে শুরু করার পর বাংলাদেশের ক্রিকেট এখন একটা শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তির ওপর আছে দাঁড়িয়ে। এ আর্থিক ভিত্তিটা এসেছে আইসিসি আসরগুলোতে ভালো করার কারণে। বাংলাদেশের ক্রিকেট নিয়ে মানুষের আগ্রহ বাড়ায়, যা স্পন্সরদের আগ্রহী করেছে। এখন সেই আগ্রহটা পড়তির দিকে। আগামীর ক্রিকেটারদের জন্য এখনকার ক্রিকেটাররা কী রেখে যাচ্ছে, সেটাও অনেক গুরুত্বপূর্ণ। মাঠে খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স ও বোর্ডে ক্রিকেট প্রশাসনে সম্পৃক্তদের নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত— দুই জায়গায় উন্নতি প্রয়োজন। সেটা না হলে ক্রিকেট থেকে কেনিয়ার মতো হারিয়ে যেতে পারে বাংলাদেশও।
লেখক: জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক





