ভূতেরও রাজনীতি আছে

লেখক শিবব্রত বর্মন। ফাইল ছবি
কী কারণে যেন কিছু দিন ধরে ভূত-প্রেত নিয়ে চারিদিকে বেশ চর্চা চলছে। ৩১ অক্টোবর গেল হ্যালোইন উৎসব। এবার বেশ ঘটা দেখলাম। তার রেশ কাটার আগেই বাঙলার ভূত-প্রেত নিয়ে চারিদিকে জোর আলোচনা, লেখালেখি। ব্যাপার কী? খোঁজ নিয়ে শুনি ভূত চতুর্দশীর প্রস্তুতি চলছে মহাসমারোহে।
ফেসবুক সমাজে সবাই উপলক্ষের জন্য মুখিয়ে থাকে। ঢোলের বাড়ির জন্য অপেক্ষা। তবে এর আগে ভূত চতুর্দশী নিয়ে এত আদিখ্যেতা দেখেছি বলে মনে পড়ে না।
তবে ভূতের কথা যখন উঠেছেই, আর আজ তিথিটাও মিলে গেছে, আমারও হাত খানিক নিশপিশ করছে, তবে ভূত নিয়েই কিছু বলি।
ভূত-প্রেত নিয়ে আমার মধ্যে উদ্দীপনা সংক্রমিত করেছেন আমার পশ্চিমঙ্গের কবিবন্ধু অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায়। আমার চোখে তিনি রীতিমতো ভূত বিশেষজ্ঞ। ভূতপ্রেত নিয়ে তার একটি বই আছে: ‘অতঃকিম, ভূত?’ বাংলা ভাষায় ভূত বিষয়ে এত চৌকস, সরস ও পাণ্ডিত্যপূর্ণ আলোচনা আর আছে কিনা সন্দেহ।
আমি অবশ্য আজ ভূত নিয়ে কথা বলব না। কথা বলব বাঙালির ভূতস্কেপের দুই সবেধন নারী সদস্যকে নিয়ে: পেত্নী এবং শাঁকচুন্নি। এটা কীভাবে হলো যে বাংলার ভূতস্তান এমন পুরুষশাসিত হয়ে থাকল? মরার পরেও মেয়েদের এমন সংরক্ষিত আসনেই থাকতে হবে?
আশার বিষয়, বাংলার ভূতসমাজের এ দুই নারী সদস্য ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
পেত্নী আর শাঁকচুন্নির নাম পাশাপাশি উচ্চারণ করা হলেও ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, এদের মধ্যে বিস্তর ফারাক। একজন বিবাহিত আর আরেকজন অবিবাহিত নারী-ভূত। আর এদের পেছনে আছে প্রচ্ছন্ন রাজনীতি।
পেত্নী শব্দটির উৎস সংস্কৃত 'প্রেতিনী' বলে মনে করা হয়। প্রেতের স্ত্রীলিঙ্গবাচক রূপ। প্রচলিত লোকবিশ্বাসে অবিবাহিত অবস্থায় মারা যাওয়া, অথবা অকালমৃত, অপঘাতে নিহত কিংবা জীবনের অপূর্ণ বাসনা নিয়ে মারা যাওয়া নারী পেত্নী হয়ে ফিরে আসতে পারেন। কিছু অঞ্চলের গল্পে সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে বা গর্ভাবস্থায় মারা যাওয়া নারীর আত্মাকেও পেত্নী হিসেবে কল্পনা করা হয়। তার বাস সাধারণত তেঁতুল, শ্যাওড়া কিংবা অন্য কোনো নির্জন গাছের ডালে। কখনো পুকুরপাড়ে, কখনো জনমানবহীন রাস্তায় তার দেখা মেলে। লম্বা চুল, সাদা শাড়ি, উল্টো পা—এসব তার পরিচিত বৈশিষ্ট্য।
অন্যদিকে শাঁকচুন্নি বিবাহিত নারীর ভূত। তারা শাক চুরি করে না মোটেও। নামটার ব্যুৎপত্তি জানলে ভুলটা ভাঙবে। শাঁকচুন্নি নামের সঙ্গে শাঁখার সম্পর্ক রয়েছে। মূল শব্দটা শাঁখচূর্ণি। অর্থাৎ শাঁখা বা শঙ্খের তৈরি চুড়ি পরিহিতা নারী। শাঁখা বাঙালি হিন্দু বিবাহিত নারীর বৈবাহিক পরিচয়ের অন্যতম চিহ্ন। সেই শাঁখা পরেই শাঁকচুন্নির আবির্ভাব। অনেক গল্পে তার পরনে থাকে লালপেড়ে শাড়ি, হাতে শাঁখা-পলা, সিঁথিতে সিঁদুর। কোনো কোনো গল্পে তিনি এমন এক নারী, যিনি স্বামীর অত্যাচারে বা দুর্ভাগ্যজনক কোনো ঘটনায় অল্প বয়সে মারা গেছেন। মৃত্যুর পরও তার সংসারের আকাঙ্ক্ষা মেটে না। কখনো তিনি অন্য কোনো বিবাহিত নারীর শরীরে ভর করেন, কখনো তার সংসার দখল করার চেষ্টা করেন।
পেত্নী ও শাঁকচুন্নির এই পার্থক্যের মধ্যে লুকিয়ে আছে বাঙালি সমাজের বিবাহকেন্দ্রিক নারী-পরিচয়ের রাজনীতি। পেত্নী যেন সেই নারী, যিনি বিয়ের সামাজিক স্বীকৃতি পাওয়ার আগেই জীবন হারিয়েছেন। আর শাঁকচুন্নি সেই নারী, যিনি বিয়ে করেছেন, কিন্তু সংসারজীবনের পূর্ণতা পাননি। একজনের পরিচয় নির্ধারিত হচ্ছে বিবাহ না হওয়ার মধ্য দিয়ে, অন্যজনের পরিচয় বিবাহের চিহ্নের মধ্য দিয়ে।
বাঙালি সমাজ নারীর পরিচয়কে যেভাবে বিযের সঙ্গে যুক্ত করে রেখেছে, ভূতের গল্পেও তার প্রতিফলন পাওয়া যায়। পুরুষের ভূতের বৈবাহিক অবস্থান নিয়ে কারো মাথাব্যথা নেই। কিন্তু নারী ভূতকে চেনার জন্য তার ম্যারিটাল স্টেটাস জরুরি।
এখানে আরও একটি বিষয় লক্ষণীয়। যে নারী জীবিত অবস্থায় স্বামীর অত্যাচার সহ্য করেছেন, অথবা সামাজিক নিয়মের কারণে নিজের ইচ্ছা পূরণ করতে পারেননি, মৃত্যুর পর তার আত্মা প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ফিরে আসে। এই গল্পগুলোকে আমরা যদি নারীর চাপা পড়ে থাকা ক্ষোভের সাংস্কৃতিক প্রকাশ হিসেবেও পড়ি, খুব কি কষ্টকল্পনা হয়ে যাবে? হয়ত পেত্নী ও শাঁকচুন্নিদেরকে ভূতের চেয়েও ভয়ংকর করে দেখানোর মধ্য দিয়ে নারীর আকাঙ্ক্ষা ও স্বাধীনতাকে বিপজ্জনক হিসেবে দেখানোর প্রবণতাও কাজ করে।
শাঁকচুন্নি কী বলতে চায়? এ কি এটাই বলতে চায় না যে, যে-সংসার নারীকে জীবিত অবস্থায় পূর্ণতা দেয়নি, মৃত্যুর পরও সে সেই সংসারের জন্য ফিরে আসতে পারে? সে তো মায়ার টানেই ফিরে আসতে চায়। কিন্তু সমাজ তার এই প্রত্যাবর্তনকে মুক্তির গল্প হিসেবে না দেখে ভয়ের বস্তুতে পরিণত করে কেন?
মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়ার লোককথায় পন্তিয়ানাক বা কুন্তিলানাক নামে দুই নারী ভূতের দেখা মেলে। এরা সাধারণত সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মারা যাওয়া নারীর আত্মা। সাদা পোশাক, লম্বা চুল আর ভীতিকর চেহারা তাদের। এই ভূতকে ঘিরে প্রচলিত গল্পে মাতৃত্ব, নারীর শরীর, যৌনতা এবং পুরুষতান্ত্রিক সমাজের নানা উদ্বেগ কাজ করে। ওদিকে জাপানি লোককথা ও নাটকে এমন অনেক নারী-ভূতের দেখা মেলে, যারা প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন, স্বামীর দ্বারা প্রতারিত হয়েছেন কিংবা অপঘাতে মারা গেছেন। তাদের আত্মা ফিরে আসে প্রতিশোধ নিতে।
ভূতপ্রেতের গল্পকে নিছক ভয় পাওয়ার উপকরণ হিসেবে দেখলে এর সাংস্কৃতিক গুরুত্ব আড়ালে থেকে যায়। ভূত আসলে সেইসব মানুষের প্রতিনিধি, যাদের জীবদ্দশায় কথা বলার সুযোগ ছিল না। যে নারী নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা গেছে, যে মানুষ সামাজিক অবিচারের কারণে অসম্মানজনক মৃত্যুবরণ করেছে, যে মৃত মানুষের যথাযথ সৎকার হয়নি কিংবা যে জনগোষ্ঠীর ইতিহাস মূলধারার ইতিহাসে জায়গা পায়নি, তাদের সবাইকে নানা রূপক ও প্রতীকে ভূতের গল্পে ফিরে আসতে দেখা যায়।
সেদিক থেকে দেখলে ভূত এক ধরনের সাংস্কৃতিক স্মৃতি। কিন্তু শুধু স্মৃতি নয়, স্মৃতির ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠারও লড়াই। কে ভূত হবে, কে দেবতা হবে, কে শহীদ হবে, আর কে অপদেবতা হিসেবে চিহ্নিত হবে, এগুলো কে ঠিক করে দেয়? এসব নিয়ে আমরা যখন মাথা ঘামাব, তখন আসলে আমরা ক্ষমতার সম্পর্ক নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছি। আমরা রাজনীতি নিয়ে কথা বলছি।



