কবিদের ফুরফুরে পোশাক-আশাক

কোনো এক ফুরফুরে সকালে দরজায় কড়া নাড়া শুনে খুলতেই দেখি ঝকঝকে চেহারার একজন মানুষ সামনে দাঁড়িয়ে। পরনে বাটিক প্রিন্টের হাফ হাতা শার্ট, কালো ট্রাউজার। তাঁর এক মাথা চুল বসন্তের বাতাসে উড়ছে। কানের দুপাশ দিয়ে নেমেছে মোটা জুলপি, চোখে মোটা ফ্রেমের চমশা, ঠোঁটে কেমন এক বিব্রত হাসি। তিনি বাংলা সাহিত্যের কবি শামসুর রাহমান। বাড়িতে যখনই আসতেন তাঁর প্রথম প্রশ্নটা হতো, ‘তোমার বাবা বাড়িতে আছেন?’
কখনো কখনো তাঁকে সাদা অথবা লাল রঙের পাঞ্জাবিতে দেখা যেত। শীতে পরতেন নীল ব্লেজার আর সঙ্গে টকটকে লাল বর্ণ টাই। আবার ষাট বা সত্তরের দশকে ঢাকায় তীব্র শীতে জড়াতেন হালকা ঘিয়ে রঙের চাদর।
শামসুর রহমানের মতো পোশাকে উজ্জ্বল রঙের আধিপত্য ছিল আরেক কবি ফজল শাহাবুদ্দীনেরও। কোনো কোনো শীতকালে তাঁকে শরীরে ঝাঁঝালো তারুণ্য মাখা জিন্সের জ্যাকেট চড়াতে দেখেছি। জ্যাকেটের দুই কাঁধে লাগানো থাকতো সেনাসদস্যদের পোশাকের মতো ফ্ল্যাপ। কোনো এক শীতের সকালে দেখেছি, কবি যাচ্ছেন মাছ ধরতে; পরনে হান্টিং জ্যাকেট; হাতে হুইল ছিপ। অন্য সময়ে ফজল শাহাবুদ্দীন ঢিলেঢালা মাপের শার্ট আর জিন্সের প্যান্ট পরতেন। কালো রঙের শার্ট পরতেন তিনি কখনো। শখের বসে মাথায় চাপাতেন জিন্সের টুপি। শীতকালে গলায় ঝুলতো লাল রঙের মাফলার। অনেক অনেক বছর আগে ‘দৈনিক বাংলা’ মোড়ে হারুন ডায়েরির অফিসের দরজা-কপাট কেঁপে উঠত তাঁর হাসির শব্দে। আঙুলের ফাঁকে পুড়ে যেত সিগারেট তখন।
এই দুই কবির একেবারে বিপরীত ছিলেন বাংলাদেশের কবিতার আরেক আশ্চর্য সুন্দর কবি আল মাহমুদ। চড়া রঙের জামাকাপড় তাকে কখনো পরিধান করতে দেখা যায়নি। হালকা রঙের শার্ট পরতেন। সাদা অথবা অফ হোয়াইটের প্রাধান্য ছিল বেশি। শার্টের হাতা গুটিয়ে রাখা। টেট্রন অথবা অন্য কাপড়ে তৈরি প্যান্ট পরতেন। পায়ে স্ট্র্যাপ বাঁধা স্যান্ডেল। ফজল শাহাবুদ্দীনের অফিসে তাঁকে দেখা যেত তুমুল আড্ডার ফাঁকে সিগারেট ধরিয়ে ভাবনার অন্য এক পৃথিবীতে মগ্ন হতে।
কবি শহীদ কাদরীকে মনে পড়ে শীতের সন্ধ্যায়। গম্ভীর আর ভারী দৈহিক কাঠামোর মানুষ ছিলেন। মাথায় তারও ঘোর কৃষ্ণবর্ণ চুল তখন। আঙুলের ফাঁকে প্রজ্জ্বলিত সিগারেট। সত্তরের দশকের গোড়ার দিকে পরনে তাঁর সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবি আর চাদর। কখনো কখনো পাইপে গভীর টান দিয়ে ধোঁয়ার কুয়াশায় আচ্ছন্ন হতে দেখেছি কবি শহীদ কাদরীকে। উচ্চস্বরে হাসতেন। কথা বলতেন কিছুটা গম্ভীর স্বরে।
ষাটের কবি রফিক আজাদ নিজেকে একদা কবিতায় ঘোষণা করেছিলেন ‘শক্ত উরুর প্রেমিক’ হিসেবে। রঙচঙে শার্ট, জিন্সের প্যান্ট, ছোট হাতা টি-শার্ট, বুট; সব ধরণের পোশাক এবং জুতায় রফিক আজাদ ছিলেন স্বচ্ছন্দ্য। ঠোঁটের দু‘পাশ থেকে নেমে যাওয়া দীর্ঘ গোঁফ ছিল তাঁর বৈশিষ্ট। একবার আমাকেই বলেছিলেন, ‘পায়জামা-পাঞ্জাবি পড়ে কবি হওয়া যায় না; জিন্সের প্যান্ট শার্ট পরবে।’ শীতে এই শহরে তাঁকে দেখতাম নীল জিন্সের জ্যাকেট আর চাপা প্যান্ট পরে ঘুরে বেড়াতে। কবি রফিক আজাদকে একদা গলায় স্কার্ফ পরিধান করতেও দেখা যেত।
আশির দশকে এসে নানা সূত্রে জড়িয়ে যাবার সুযোগ পেয়েছিলাম ষাটের কবি হেলাল হাফিজের সঙ্গে। পোশাকে পরিপাটি মানুষ। আশির দশকে এসেও সত্তরের ফ্যাশন উঁচু কলারের শার্ট পরতেন। কাঁধে একটা ঝোলা ব্যাগ তখন হেলাল হাফিজের সিগনেচার হয়ে উঠেছিল। পায়ে স্ট্র্যাপ লাগানো স্যান্ডেল। খুব চড়া রঙের জামাকাপড় পরিধান করতেন না। ভীষণ যত্নে পরিচ্ছন্ন পোশাক পরিধান করতেন। বহুদিন তোপখানা রোডে অবলুপ্ত পিনম্যান ডি প্যারিস লন্ড্রিতে সদ্য ধোলাই হয়ে আসা পোশাক পাল্টে নিতে দেখেছি কবিকে। পালিশ করা জুতো ছিল তার সঙ্গী। কাঁধের ব্যাগটাও ছিল পরিচ্ছন্ন। ব্যাগে একটি খয়েরি রঙের ডায়েরিতে মায়াময় হাতে লেখা কবিতার খসড়া ঘুমিয়ে থাকত।
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহকে শার্ট পরিহিত খুব কমই দেখা যেত। বিচিত্র রঙ আর নকশার ফতুয়া আর জিন্সের প্যান্টের দিকে তাঁর ঝোঁক ছিল বেশি। ঝকঝকে চোখের দৃষ্টি, কাঁধে ব্যাগ আর ঠোঁট উপচানো হাসি ছিল তাঁর একান্ত সম্পত্তি। কখনো তাঁকে টি-শার্ট পরিহিত অবস্থায়ও দেখা যেত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। পোশাক-আশাকের ক্ষেত্রে সত্তরের দশকের কবি ত্রিদিব দস্তিদার ছিলেন এক অনন্য চরিত্র। চড়া রঙে ছাপানো শার্ট অথবা টি-শার্ট আর জিন্স প্যান্টে আবৃত কবিকে কেউ কেউ একদা ‘কাউবয়’ কবি হিসেবে চিহ্নিত করত। একগাল দাড়ি আর ভীষণ উচ্চকিত হাসি তাঁর পোশাকের চাইতেও উজ্জ্বল ছিল।
সত্তর দশকের কবি সাবদার সিদ্দিকীর পোশাক ছিল সকলের চাইতে আলাদা। তাকে আশির দশকের শেষ ভাগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখা যেত চটের বস্তা দিয়ে তৈরি বিশেষ এক ধরণের পোশাক পরিহিত অবস্থায়। চোখে মোটা ফ্রেমের কালো সানগ্লাস আর ভাড়া নেয়া একটা বেবি সাইকেল। কবি চলেছেন অপ্রতিরোধ্য। কখনো স্থির হয়ে বসে আছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় লাইব্রেরীর পাশে বিশাল গাছের গোড়ায়, আবার কখনো উত্তেজেত ভঙ্গীতে অনেক কথা বলছেন হাত-পা ছুঁড়ে।
পোশাক কি কবিদের ঔদ্ধত্য? নাকি চরিত্রের ছড়িয়ে পড়া প্রতিফলন? কে জানে তাদের পরিধেয়র মাঝে মনের অপ্রকাশিত বাসনার, অনুচ্চারিত ভাবনার উচ্চারণ থেকে যায় কি না!









