জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আশা বিশ্বাস করতেন, গানই তার নিঃশ্বাস

আশা ভোঁসলে
‘পিয়া তু আব তো আ যা’, ‘ইয়ে মেরা দিল’, ‘দম মারো দম’ বা ‘ও হাসিনা জুলফোঁয়ালি’-এই গানগুলো শুধু জনপ্রিয়ই নয়, একেকটি সময়ের পরিচয় বহন করে। যে গানগুলো গেয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন সুর সম্রাজ্ঞী আশা ভোঁসলে।
মাত্র ৯ বছর বয়সে গানের জগতে পা রাখা। ১৯৪৩ সালে প্রথম চলচ্চিত্রে গান রেকর্ড। পঞ্চাশের দশকে যখন লতা মঙ্গেশকর হয়ে উঠছেন সুরকারদের প্রথম পছন্দ, তখন আশাকে লড়তে হয়েছে নিজের পরিচয়ের জন্য। এরপর সময়ের সঙ্গে সেই গণ্ডি ভেঙে বেরিয়ে আসেন তিনি। উপহার দেন অসংখ্য জনপ্রিয় ভিন্ন ধারার গান।
আজ রবিবার কিংবদন্তি এই কণ্ঠশিল্পী আশা ভোঁসলে ৯২ বছর বয়সে মুম্বইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃত্যু একটি যুগের অবসান, যে সময়ের কণ্ঠই গড়ে দিয়েছিল এ দেশের সঙ্গীতরুচি।
শনিবার সন্ধ্যা থেকেই উৎকণ্ঠায় ছিল ভারত। হঠাৎ অসুস্থতা এবং পরে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়া- সব মিলিয়ে পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যায়।
আশাজির নাতনি তখন জানিয়েছিলেন, ভোঁসলে তার সুস্থতার জন্য প্রার্থনা চেয়েছিলেন। কিন্তু সব প্রার্থনা বিফল করে না-ফেরার দেশে চলে গেলেন সুরের জাদুকরী।
আশা ভোঁসলের জীবন কেবল গ্ল্যামার আর করতালির ছিল না। তার সাফল্যের আড়ালে লুকিয়ে ছিল গভীর ক্ষত। পরিবারের অমতে মাত্র ১৬ বছর বয়সে নিজের চেয়ে ২০ বছরের বড় গণপতারাও ভোঁসলেকে বিয়ে করেন তিনি।
এই সিদ্ধান্তের কারণে দিদি লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে দীর্ঘ সময় তার মুখ দেখাদেখি ছিল বন্ধ। তবে যে ভালোবাসার টানে ঘর ছেড়েছিলেন, সেই শ্বশুরবাড়িতেই জুটেছিল মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন। দিদি লতার সঙ্গে যোগাযোগ পর্যন্ত রাখতে দেওয়া হতো না তাকে।
চরম অমানবিকতার শিকার হয়েছিলেন তিনি। তৃতীয় সন্তান আনন্দের জন্মের সময় তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল। সেই যন্ত্রণার দিনগুলোতে সন্তানদের নিয়ে মায়ের কাছে ফিরে এসেছিলেন তিনি।
এত কষ্টের পরও আশা কখনো ভেঙে পড়েননি। তিনি বলতেন, সেই বিয়ে না হলে তিনি তার তিন সন্তানকে পেতেন না।
পরবর্তী সময়ে প্রখ্যাত সুরকার আরডি বর্মণের সঙ্গে তার বিয়ে হলেও জীবনের প্রথম দিকের সেই ক্ষত সারাজীবন তার সঙ্গী ছিল। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি বিশ্বাস করতেন, গানই তার নিঃশ্বাস।
৯০ বছর বয়সেও দুবাইতে তিন ঘণ্টা দাঁড়িয়ে লাইভ কনসার্ট করে তিনি বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। তার ঝুলিতে রয়েছে দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার, পদ্মভূষণ, গ্র্যামি মনোনয়নসহ অসংখ্য অর্জন।
তিনি অগণিত কালজয়ী গান গেয়ে শ্রোতাদের করেছেন মুগ্ধ। এর মধ্যে রয়েছে, ‘দিল তো পাগল হ্যায়’, ‘এক পরদেশী মেরা দিল লে গয়া’, ‘তুমসে মিলকে’। বাংলা গানেও তিনি অনবদ্য ছিলেন।
আশা কেবল একজন গায়িকা ছিলেন না, তিনি ছিলেন অদম্য জেদ আর প্রাণশক্তির প্রতীক। তার মৃত্যুতে ভারত হারাল তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ রত্নকে।
গায়িকার নশ্বর দেহ চলে গেলেও, তার কণ্ঠস্বর চিরকাল রয়ে যাবে কয়েক প্রজন্ম ধরে মানুষের হৃদয়ে। বিদায় সুর-সাম্রাজ্ঞী।





