প্রযুক্তির ভিড়ে ঐতিহ্যের হারিয়ে যাওয়া সেই হালখাতা!

ছবিঃ আগামীর সময়
প্রাচীন বাংলা নববর্ষ উদ্যাপনের সঙ্গে হালখাতার প্রথা নিবিড়ভাবে জড়িত। সেই সময় চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে কৃষকরা তাদের খাজনা, মাশুল ও শুল্ক পরিশোধ করতেন। পরদিন পহেলা বৈশাখে জমিদার বা ভূমির মালিকরা প্রজাদের মিষ্টান্ন দিয়ে আপ্যায়ন করতেন। পরবর্তীতে এই রীতি ব্যবসায়িক অঙ্গনে বিস্তার লাভ করে এবং হালখাতা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রথায় পরিণত হয়।
চট্টগ্রামের ব্যবসা-বাণিজ্যের হৃদপিণ্ড খাতুনগঞ্জ-চাক্তাই-আছদগঞ্জে হালখাতার জৌলুস চোখে পড়তো। সকাল থেকেই খাতুনগঞ্জের সরু গলিগুলোতে ধূপের সুগন্ধ আর গোলাপজলের ঝাপটা। লাল সালু কাপড়ে মোড়ানো মোটা খাতাগুলো সারিবদ্ধভাবে সাজানো থাকতো মালিকের চেয়ারের পাশে। কাঠের ক্যাশ বাক্সের পাশে নতুন সাদা পোশাকে বসে থাকতেন প্রবীণ ব্যবসায়ী। মুখে থাকতো হাসি।
দূর-দূরান্ত থেকে ক্রেতারা আসতো নতুনরুপে সাজানো এসব দোকানে। পুরোনো দেনা মিটিয়ে দেয়ার পর মুখে মিষ্টি তুলে দিতো ব্যবসায়ীরা। দেশগ্রামের খুচরা ব্যবসায়ীর সাথে পাইকারি ব্যবসায়ীদের সেদিন হতো মেলবন্ধন। চৈত্র সংক্রান্তি-পহেলা বৈশাখ-হালখাতা ঘিরে চট্টগ্রামের ব্যবসায়িক পাড়ায় ছিল উৎসবমুখর আবহ। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সেই জৌলুস আজমরো মরো অবস্থা।
বর্তমানে খাতুনগঞ্জের কাঠের সেই গদিতে বসে থাকা ব্যবসায়ীর বৈশাখ ঘিরে নতুন কাপড়ে বসার তাড়া নেই। চৈত্র সংক্রান্তি ঘিরে বাৎসরিক লেনদেন হয় না বললেই চলে। বাংলা সাল গণনা এখন দখল করেছে ইংরেজি নববর্ষ। কাঠের গদি আধুনিক রূপ পেয়েছে। আর সেই লাল খাতা স্থান করে নিয়েছে কম্পিউটার, ট্যাব। মিষ্টির খাওয়ানোর রেওয়াজ থমকে গেছে হোয়াটসঅ্যাপের ‘শুভেচ্ছা বার্তায়’। প্রযুক্তির জোয়ারে হারালো চট্টগ্রামের হাজার বছরের প্রাণোচ্ছল ঐতিহ্য ‘হালখাতা’।
হালখাতার গোড়াপত্তন: ইতিহাসের পাতা থেকে:
হালখাতা মূলত মোগল সম্রাট আকবরের সময়কাল থেকে শুরু হওয়া এক ব্যবসায়িক সংস্কৃতি। সম্রাট যখন ‘ফসলি সন’ প্রবর্তন করেন, তখন থেকেই কৃষিভিত্তিক এই জনপদে খাজনা আদায় ও হিসাব চুকানোর নতুন বছর শুরু হতো। চট্টগ্রামের ব্যবসায়িক ইতিহাসে হালখাতা যুক্ত হয় মূলত বন্দরকেন্দ্রিক বাণিজ্যের প্রসারের সাথে। চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের আড়তদাররা পুরো বছর বাকিতে লেনদেন করতেন এবং বছরের শেষ দিনে সেই হিসাব চুকিয়ে নতুন খাতা বা ‘হালখাতা’ খুলতেন। এটি কেবল হিসাব মেলানো ছিল না, ছিল পারষ্পরিক বিশ্বাসের অন্যরকম এক বোঝাপড়া।
জৌলুসের সেই সোনালী দিন
এক সময় হালখাতা ছিল চট্টগ্রামের সামাজিক সংহতির এক অনন্য উদাহরণ। পহেলা বৈশাখের অন্তত এক সপ্তাহ আগে থেকেই আড়তগুলোতে চলত ধোয়ামোছা ও চুনকাম। রঙিন কাগজের শিকল আর ফুল দিয়ে সাজানো হতো গদি। ব্যবসায়ীরা তাদের কার্ডে লিখতেন— ‘পুরানো বছরের সকল হিসাব চুকাইয়া নতুন বছরে পদার্পণ উপলক্ষে শুভ হালখাতা’। সেদিন কোনো তাগাদা থাকতো না, থাকতো কেবল আপ্যায়ন। চাক্তাইয়ের আড়তগুলোতে বড় বড় কড়াইয়ে রান্না হতো মেজবানি মাংস, থাকতো বেলা বিস্কুট আর ছানার মিষ্টি। ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে যে আত্মীয়তার বন্ধন সেদিন গড়ে উঠত, তা সারা বছরের ব্যবসায়িক সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে কাজ করত।
খাতুনগঞ্জের হামিদউল্লাহ মার্কেটের ব্যবসায়ী নেতা আবসার উদ্দিন বলছিলেন, নব্বইয়ের দশকের শেষভাগ থেকে হালখাতার সেই জৌলুসে ভাটা পড়তে শুরু করে। মুক্তবাজার অর্থনীতি এবং করপোরেট সংস্কৃতির প্রবেশে ব্যবসার ধরণ পাল্টে যায়। চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী পারিবারিক ব্যবসার উত্তরসূরীরা যখন বড় বড় শিল্প গ্রুপে পরিণত হলো, তখন ব্যক্তিগত সম্পর্কের চেয়ে ‘প্রফেশনালিজম’ মুখ্য হয়ে ওঠে। ফলে উৎসবের সেই রঙ ফিকে হতে শুরু করে।
হালখাতার ঐতিহ্য হারিয়ে যাওয়ার পেছনে প্রধানত প্রযুক্তি, নতুন প্রজন্মের ব্যবসার হালধরা এবং বিশ্বাসের সংকট-এই তিনটি কারণ মনে করেন তরুণ প্রজন্মের ব্যবসায়ী অসীম কুমার দাশ। তার বাবা অমর দাশ ছিলেন খাতুনগঞ্জের মসলাজাতীয় পণ্যের নামকরা ব্যবসায়ী। কিন্তু অসীম কুমার দাশ বাবার কাছ থেকে শেখা ব্যবসায় আধুনিক প্রযুক্তি যোগ করেন। তিনি বলছিলেন, লেনদেনের হিসাব রাখা হয় ইআরপি সফটওয়্যার কিংবা অ্যাকাউন্টিং অ্যাপে। হাল খাতার জায়গায় দখল নিয়েছে এক্সেল শিট। লেনদেন এখন নগদ টাকার বদলে হচ্ছে অনলাইন ব্যাংকিং বা এমএফএস (বিকাশ/নগদ) মাধ্যমে। ব্যবসায়ীদের নতুন প্রজন্ম এখন উচ্চশিক্ষিত এবং তারা আধুনিক কর্পোরেট কালচারে অভ্যস্ত। তাদের কাছে হালখাতা একটি পুরণো ধারনা। সেই সাথে হালখাতা উঠে যাওয়ার পেছনে লেনদেন বিশ্বাসের সংকট প্রাধান্য পেয়েছে। আগে ব্যবসা হতো মুখে মুখে, বিশ্বাসের ওপর। এখন লিখিত চুক্তি এবং ব্যাংকিং গ্যারান্টি ছাড়া লেনদেন হয় না। ফলে পাওনা আদায়ের সেই পারিবারিক আবহটি এখন আর নেই।
এত ঝড়ের মাঝেও চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ, আছদগঞ্জ, চাক্তাইয়ের কিছু ব্যবসায়ী হালখাতার ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন। বিশেষ করে জুয়েলারি এবং পুরনো হার্ডওয়্যার মার্কেটে এখনো রেওয়াজ রয়েছে ঘটা করে হালখাতা করার।
হাজারি লেনের স্বর্ণের কারিগররা এবং বড় বড় জুয়েলারি শোরুমগুলো এখনো পহেলা বৈশাখে লাল খাতা খোলে। তারা মনে করেন, স্বর্ণের ব্যবসা বিশ্বাসের ওপর টিকে থাকে আর হালখাতা সেই বিশ্বাসের ধারক। এছাড়া চাক্তাইয়ের কিছু চাল ও তেলের আড়তদাররা পূর্বপুরুষের স্মৃতি রক্ষার্থে আজও প্রতীকীভাবে এই অনুষ্ঠান পালন করেন।
চাল ব্যবসায়ী নেতা ওমর আজম বলছেন, ‘হালখাতার ঐতিহ্য এখনো অনেকেই ধরে রেখেছেন। ঘটা করে উৎসব হিসেবে পালন করেন কিন্তু সেটা শুধুই নিয়ম পালনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। হালখাতা নির্ভর ব্যবসা এখন আর নেই বললেই চলে।’
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, চট্টগ্রামের এই শতাব্দীপ্রাচীন বাণিজ্যিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে দৃশ্যমান কোনো সরকারি উদ্যোগ এখনো নেই। বিসিক বা সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে এই লোকজ সংস্কৃতিকে ব্র্যান্ডিং করার কোনো পরিকল্পনা নেওয়া হয়নি। ফলে চট্টগ্রামের মাটি-ঐতিহ্যের সাথে মিশে থাকা গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস থেকে আগামী প্রজন্ম ভুলে যাবে।

