আশা ভোঁসলের কণ্ঠে জাদু ছড়ানো অমর সব গান

যে কণ্ঠ কখনো দুষ্টুমিতে মেতে উঠত, কখনো বিরহে হাহাকার করত, আবার কখনো প্রেমের আকুলতায় মন ভরিয়ে দিত সেই জাদুকরী কণ্ঠ আজ স্তব্ধ। উপমহাদেশের সংগীতজগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র আশা ভোঁসলের মৃত্যুতে একটি যুগের অবসান হলো। তিনি শুধু একজন গায়িকা ছিলেন না, তিনি ছিলেন কোটি মানুষের আবেগ ও অনুভূতির নাম।
আশা ভোঁসলে তার দীর্ঘ ক্যারিয়ারে হাজার হাজার গান গেয়েছেন। ক্যাবারে থেকে গজল- সবখানেই ছিল তার অবাধ বিচরণ। তার গাওয়া সেরা কিছু গানের মধ্য দিয়েই ভক্তরা তাকে খুঁজে ফিরছেন আজ। চলুন দেখে নেওয়া যাক তার চিরস্মরণীয় কিছু কাজ :
পিয়া তু আব তো আজা (কারাভান, ১৯৭১)
হিন্দি সিনেমায় সাহসী গায়কীর এক অনন্য উদাহরণ এই গানটি। আশার সেই চঞ্চল ও আবেদনময়ী কণ্ঠ গানটিকে আইকনিক করে তুলেছিল। বিশেষ করে ‘মোনিকা, ও মাই ডার্লিং’ অংশটি আজও তরুণদের মুখে মুখে ফেরে।
দম মারো দম (হরে রামা হরে কৃষ্ণা, ১৯৭১)
এটি ছিল সত্তর দশকের তরুণ প্রজন্মের কাছে এক বিদ্রোহের গান। তার কণ্ঠের এক অদ্ভুত সম্মোহনী শক্তি গানটিকে আজও সমান জনপ্রিয় করে রেখেছে।
ইন আঁখোঁ কি মস্তি (উমরাও জান, ১৯৮১)
চটুল গানের পাশাপাশি তিনি যে ধ্রুপদি গজলেও সমান পারদর্শী ছিলেন, তার প্রমাণ এই গানটি। প্রতিটি সুরে তিনি আভিজাত্য আর বিষাদ ফুটিয়ে তুলেছিলেন পরম মমতায়।
মেরা কুছ সামান (ইজাজত, ১৯৮৭)
গুলজারের জটিল কথার এই গানটিকে আশা ভোঁসলে যেন এক জীবন্ত স্মৃতিতে রূপ দিয়েছিলেন। খুব সাধারণ মিউজিকের এই গানটি তার কণ্ঠের জাদুতে অসাধারণ হয়ে উঠেছিল।
চুরা লিয়া হ্যায় তুমনে (ইয়াদোঁ কি বারাত, ১৯৭৩)
একেবারে খাঁটি রোমান্টিক গান বলতে যা বোঝায়, এটি ছিল তাই। ক্যাফে বা আড্ডায় এই গানটি ছাড়া আজও রোমান্স জমে ওঠে না।
রঙ্গিলা রে (রঙ্গিলা, ১৯৯৫)
নব্বইয়ের দশকেও যে তিনি নিজেকে নতুনভাবে তুলে ধরতে পারেন, তার প্রমাণ ছিল এই গানটি। নতুন প্রজন্মের কাছে তিনি এই গানের মাধ্যমেই আবারও জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন।
রাধা ক্যায়সে না জালে (লগান, ২০০১)
এই সেমি-ক্লাসিক্যাল গানে কৃষ্ণের প্রতি রাধার সেই অভিমান আর দুষ্টুমি আশা ভোঁসলে ছাড়া আর কেউ এত নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারতেন না।
আইয়িয়ে মেহেরবান (হাওড়া ব্রিজ, ১৯৫৮)
আশা ভোঁসলের শুরুর দিকের ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা কাজ এটি। সাদা-কালো সিনেমার সেই জমানায় আভিজাত্য আর মায়াবী আকর্ষণের এক অনন্য উদাহরণ হয়ে আছে এই গানটি। কয়েক দশক পার হয়ে গেলেও গানটি আজও ভীষণ আধুনিক আর স্টাইলিশ মনে হয়।
ও হাসিনা জুলফন ওয়ালি (তিসরি মঞ্জিল, ১৯৬৬)
দ্রুত ছন্দ আর বৈদ্যুতিক গতির এই গানে তিনি নিজের বহুমুখিতার প্রমাণ দিয়েছেন। এমন দুরন্ত তালের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অনায়াসে গেয়ে যাওয়া স্রেফ তার পক্ষেই সম্ভব ছিল। সুরের ওপর তার দখল কতটা পোক্ত, তা এই গানটি শুনলেই বোঝা যায়।
আশা ভোঁসলে কোনো নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ছিলেন না, তিনি ছিলেন সব সময়ের জন্য। তিনি গান গেয়েছেন প্রেমিকদের জন্য, বিদ্রোহীদের জন্য, আবার যারা স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসে তাদের জন্য। সিনেমার চরিত্রদের তিনি কণ্ঠ দিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু আসলে তিনি আমাদের না বলা কথাগুলোকেই সুর দিয়েছিলেন।
রাস্তার জ্যামে বসে থাকা কোনো ট্যাক্সিতে, কোনো জমকালো বিয়ে বাড়িতে কিংবা একলা ঘরে নস্টালজিক মুহূর্তে আশা ভোঁসলে ফিরে আসবেন বারবার।
কারণ কিংবদন্তিরা কখনো বিদায় নেন না, তারা অমর হয়ে থাকেন প্রতিটি সুরের মূর্ছনায়।





