হরমুজ প্রণালির জন্য একটি আঞ্চলিক সমঝোতা জরুরি

সংগৃহীত ছবি
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেওয়ায় উপসাগরীয় অঞ্চলে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। তার ঘোষণার পর শুধু সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যেই নয়, বরং নাবিক সমাজ এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
এর পাশাপাশি ইরানও জানিয়েছে, তারা হরমুজ প্রণালি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত রাখবে। তবে শর্ত হলো, জাহাজগুলোকে তাদের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে।
কিন্তু হরমুজ প্রণালি নিয়ে ভবিষ্যৎ এখনও অনিশ্চিত। এই যুদ্ধবিরতি স্থায়ী শান্তির দিকে যাবে, নাকি আবারও উত্তেজনা বাড়বে, তা বলা কঠিন। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—ইরানের প্রণালি বন্ধের ফলে যে বৈশ্বিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা দেখিয়ে দিয়েছে এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি, কার্যকর ও আইনি ভিত্তিসম্পন্ন সমাধান অত্যন্ত জরুরি।
ইরান ও তার আরব প্রতিবেশীদের জন্য এই বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই প্রণালিই তাদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রধান পথ এবং নিজেদের জনগণের জন্য প্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহের অন্যতম মাধ্যম। তাই যুদ্ধের ক্ষয়-ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার পাশাপাশি তাদের আন্তর্জাতিক আস্থা পুনর্গঠনও অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তি
সৌভাগ্যজনকভাবে, এই সমস্যার সমাধানে সম্পূর্ণ নতুন কোনো কাঠামো তৈরি করার প্রয়োজন নেই। জাতিসংঘের নেতৃত্বে ইতোমধ্যেই বহু আন্তর্জাতিক আইন ও চুক্তি গড়ে উঠেছে। যার মধ্যে সমুদ্র আইন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে সমুদ্র আইন সম্পর্কিত জাতিসংঘ সনদ অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক প্রণালি দিয়ে সব জাহাজ ও উড়োজাহাজের অবাধ চলাচলের অধিকার রয়েছে, যাকে ‘ট্রানজিট প্যাসেজ’ বলা হয়। এই অধিকার কোনো রাষ্ট্র ইচ্ছামতো বাধাগ্রস্ত করতে পারে না এবং হরমুজ প্রণালির ক্ষেত্রেও এর কোনো ব্যতিক্রম নেই।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোনো দেশ যদি কোনো চুক্তি স্বাক্ষর করে কিন্তু অনুমোদন না-ও করে, তবুও সেই চুক্তির উদ্দেশ্য নষ্ট করে এমন কোনো কাজ করা তাদের জন্য গ্রহণযোগ্য নয়। এটিও আন্তর্জাতিক আইনের একটি স্বীকৃত নীতি।
প্রণালি বন্ধ করার ‘অধিকার’ নেই
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল একটি নির্দিষ্ট ট্রাফিক ব্যবস্থার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত, যা ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের মাধ্যমে নির্ধারিত। এই নিয়ম অনুযায়ী নির্দিষ্ট লেনে জাহাজ চলাচল বাধ্যতামূলক।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই পথের একটি বড় অংশ ওমানের জলসীমার মধ্যে পড়ে। ফলে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সেখানে অবাধ চলাচল নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক।
ইরানের এ এলাকায় সরাসরি নিয়ন্ত্রণ নেই এবং তাদের কোনোভাবেই এই চলাচলে বাধা দেওয়ার অধিকার নেই।
প্রণালির পশ্চিমাংশে কিছু এলাকা রয়েছে, যা ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে বিরোধপূর্ণ। তবে এই বিরোধ থাকলেও আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়ার কোনো অধিকার ইরানের নেই।
এছাড়া আন্তর্জাতিক প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের ওপর কর বা শুল্ক আরোপ করাও আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। এটি ‘ট্রানজিট প্যাসেজ’ এবং ‘ইনোসেন্ট প্যাসেজ’ উভয় নীতির সঙ্গেই সাংঘর্ষিক।
সমাধানের পথ, সংলাপ ও কূটনীতি
বিশ্বের প্রায় অর্ধেক জ্বালানি সমুদ্রপথে পরিবাহিত হয়। যার একটি বড় অংশ এই ধরনের সংকীর্ণ প্রণালি দিয়ে যায়। তাই এই পথগুলোর নিরাপত্তা শুধু আঞ্চলিক নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে জরুরি হলো—সংলাপ, কূটনীতি এবং আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিতে একটি স্থায়ী সমাধান খুঁজে বের করা। এ ক্ষেত্রে জাতিসংঘ একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করতে পারে।
যে কোনো প্রক্রিয়া গ্রহণ করা হোক না কেন, তা অবশ্যই বিদ্যমান আন্তর্জাতিক আইন ও সব সংশ্লিষ্ট দেশের অধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের ভিত্তিতে হতে হবে।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে বর্তমান সংকট আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক লাভের জন্য নেওয়া পদক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদে সবার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। বরং এই সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান হলে তা শুধু সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর জন্য নয়, বরং পুরো বিশ্বের জন্যই কল্যাণ বয়ে আনবে।
আমাদের সবারই প্রয়োজন একটি নিরাপদ, স্থিতিশীল এবং শান্তিপূর্ণ হরমুজ প্রণালি। আইন ও বাস্তবতার ভিত্তিতে এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব এবং এখন সেটিই সময়ের দাবি।
লেখক: দোহাভিত্তিক স্বাধীন পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট হোল্ডিংয়ের সিইও

