ক্যাম্পেইন শুরু
সন্তানের বাহুতে টিকার সুই, মায়ের চোখে প্রশান্তি

গ্রাফিক্স: আগামীর সময়
সকালে যখন সূর্যের আলোটা সবে চড়া হতে শুরু করেছে, তখনই রাজধানী ঢাকায় নগর ভবনের অডিটরিয়ামে কোলে শিশু নিয়ে ভিড় জমাতে শুরু করেন মায়েরা। যে ভিড়ের মধ্যে ২৭ মাস বয়সী ছোট্ট আরিয়ানের মা সুলতানা বেগমের চোখেমুখে ফুটে উঠে অদ্ভুত এক অস্থিরতা। কয়েক সপ্তাহ ধরে টেলিভিশন চ্যানেলের খবর আর পাড়া-প্রতিবেশীর মুখে দেশে হামের সংক্রমণের তীব্রতা বাড়ার কথা শুনে তার রাতের ঘুম হারাম হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু যখন স্বাস্থ্যকর্মীর হাতের ছোট্ট সিরিঞ্জের সুঁইটা আরিয়ানের বাহুতে বিঁধে গেল, তখন ব্যথায় আরিয়ান কাঁদলেও সুলতানার মুখে যেন খেলে গেল এক টুকরো বিজয়ের হাসি।
আরিয়ানের মা তুলে ধরলেন ঘোর দুশ্চিন্তা আর আতঙ্ক ভর করা কয়েক দিনের চিত্র। ‘কয়েক দিন ধরে সারাক্ষণ ভয়ে থাকতাম। খবরে দেখছিলাম প্রতিদিন শত শত শিশু হামে আক্রান্ত হচ্ছে। আজ টিকাটা দেওয়ার পর মনে হচ্ছে বুক থেকে মস্ত বড় একটা পাথর নেমে গেল। এখন মনে হচ্ছে আমার কলিজার টুকরাটা নিরাপদ থাকবে।’
সাম্প্রতিক সময়ে দেশে হামের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় অভিভাবকদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল চরম উদ্বেগ। ঘরে ঘরে জ্বর আর গায়ে লালচে দানার আতঙ্ক। ছোট শিশুদের সামান্য কাশি হলেই মা-বাবারা আঁতকে উঠছিলেন—এই বুঝি মহামারী হানা দিল! এই দমবন্ধ করা পরিস্থিতির মধ্যেই আজ রবিবার সকালে নগর ভবনের অডিটরিয়ামে শুরু হয় ‘হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন-২০২৬’। উদ্বোধন অনুষ্ঠান শেষে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের দেওয়া হয় হামের টিকা। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেনের হাত ধরে শুরু হওয়া এই কার্যক্রম যেন দুশ্চিন্তায় নীল হওয়া অভিভাবকদের জন্য এক পশলা স্বস্তির বৃষ্টি।
অভিভাবকদের উৎকণ্ঠা ও দুর্ভোগের গল্প
সাড়ে ৩ বছর বয়সী সিয়ামকে টিকা দেওয়ার জন্য নিয়ে এসেছিলেন তার বাবা। তিনিও কয়েকটা দিন পার করেছেন বিস্তর আতঙ্ক নিয়ে। বললেন, ‘কয়েকটা দিন আমরা কী ভয়ে কাটিয়েছি বোঝাতে পারব না। বাচ্চাদের বাইরে নিয়ে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলাম। আশপাশে যখন দেখি অন্য শিশুরা অসুস্থ হচ্ছে, তখন বাবা হিসেবে নিজেকে খুব অসহায় লাগছিল। সরকারের এই উদ্যোগটা সময়মতো না হলে আমাদের দুর্ভোগের সীমা থাকত না।’
টিকাদান কেন্দ্রে কোনো কোনো মায়ের চোখে দেখা গেল জল। অবশ্য সেই জল শুধু টিকার ব্যথার জন্য নয়, বরং সন্তানকে একটি সুরক্ষিত জীবনের নিশ্চয়তা দেওয়ার পরম তৃপ্তির। এক মা বলছিলেন, ‘বাচ্চাকে নিয়ে সকালে লাইনে দাঁড়িয়েছিলাম। সুন্দরভাবে টিকা দেওয়া হয়েছে। এখন মনে হচ্ছে একটা বড় দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি পেলাম।’
অনুষ্ঠানে উপস্থিত স্বাস্থ্য ও পরিবারের কল্যাণ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই গণটিকাদান কর্মসূচি শিশুদের সংক্রামক রোগ থেকে সুরক্ষা দিতে ঢাল হিসেবে কাজ করবে। তবে অভিভাবকদের দাবি আরও জোরালো—শুধু হাম নয়, সব ধরনের মরণব্যাধি থেকে শিশুদের বাঁচাতে নিয়মিত এবং সহজলভ্য টিকাদান কর্মসূচি যেন অব্যাহত থাকে।
উদ্বোধন অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ছাড়াও রেলপথ ও সড়ক পরিবহন প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস এবং ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
তারা সবাই একটি বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছেন—‘টিকা নিন, শিশুকে নিরাপদ রাখুন।’
বিকেলের দিকে যখন অডিটরিয়াম খালি হতে শুরু করেছে, তখনো দেখা গেল অনেক মা তাদের শিশুকে জড়িয়ে ধরে বাড়ি ফিরছেন। তাদের হাঁটাচলায় ছিল না কোনো তাড়া, দেখা যায়নি কোনো অস্থিরতা। কারণ, তারা জানেন তাদের সন্তান আজ থেকে এক অদৃশ্য বর্মে সুরক্ষিত।
হাম-রুবেলা নিয়ন্ত্রণে আসার কথা জানালেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী
দেশে হাম-রুবেলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার কথা জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন। তার ভাষ্য, এখন প্রতিটি শিশুকে এই টিকার আওতায় আনাই তার সরকারের লক্ষ্য। আজ সকালে নগর ভবনের অডিটরিয়ামে হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
‘হঠাৎ করেই হামের সংক্রমণ একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছিল। একটি মৃত্যুকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করলে গভীর রাতেও জরুরি পদক্ষেপ নিতে হয়। দ্রুত একটি আইসিইউ চালুর মাধ্যমে এই সংক্রমণ মোকাবিলার কার্যক্রম শুরু করা হয়’— যোগ করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
তিনি জানান, সরকারের পাশাপাশি ইউনিসেফ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও গ্যাভির সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বর্তমানে হামের সংক্রমণ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে। সংক্রমণের গতি বর্তমানে নিম্নমুখী।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, ৫ এপ্রিল থেকে দেশের ১৮ জেলা ও ৩০ উপজেলায় টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। আজ থেকে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এই কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়েছে। বিশেষ করে, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ, ময়মনসিংহ এবং বরিশাল সিটি করপোরেশনে ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের শতভাগ টিকার আওতায় আনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
এ সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, সিটি করপোরেশনের অভিজ্ঞ জনবলকে কাজে লাগিয়ে প্রতি অলিগলিতে টিকাদান কার্যক্রম পৌঁছে দিতে হবে। জনগণের মধ্যে এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে।
একই সঙ্গে আসন্ন ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে সতর্ক করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন, শিগগিরই ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে পারে। তাই এখন থেকেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। বাসাবাড়ির আশপাশে জমে থাকা পানি অপসারণ, পুরনো টায়ার, কমোড বা নারকেলের খোসায় পানি জমে না থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করতে জনগণকে সচেতন করার ওপর জোর দেন তিনি।
মশা নিধনে ব্যবহৃত ওষুধের মান নিয়েও গুরুত্বারোপ করে বলেন, সঠিক মাত্রায় ওষুধের মিশ্রণ নিশ্চিত করতে হবে, না হলে কার্যকরভাবে মশা নিধন সম্ভব হবে না।
অনুষ্ঠান শেষে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুরক্ষায় টিকাদান কার্যক্রমে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান।

