শিরীন শারমিনের মুক্তি
আইনি প্রক্রিয়া, নাকি রাজনৈতিক ‘বোঝাপড়া’?
- রিফাইন্ড আ.লীগের শঙ্কা এনসিপির

গত মঙ্গলবার আদালতে সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী। ছবি: সংগৃহীত
সাবেক স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর ত্বরিত মুক্তি জন্ম দিয়েছে কৌতূহল। নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রায় ২০ মাস পর ঘটনাটি কেউ দেখছেন স্বাভাবিক আইনি প্রক্রিয়া হিসেবে, আবার কেউ এর পেছনে খুঁজছেন রাজনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত।
গত ৭ এপ্রিল রাজধানীর ধানমণ্ডির একটি বাসা থেকে ড. শিরীনকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। জুলাই আন্দোলনের সময় সহিংসতা ও হত্যাচেষ্টার মামলায় আটক করা হয় তাকে। আদালতে তুললে রিমান্ড আবেদন নাকচ করে কারাগারে পাঠান বিচারক। তবে অল্প সময়ের ব্যবধানে জামিন মঞ্জুর হলে আজ রোববার সন্ধ্যায় কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পান তিনি।
আদালতে শুনানির সময় আসামিপক্ষ দাবি করেছিল, মামলার এজাহারে ড. শিরীনের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ নেই; তার নাম উল্লেখ থাকলেও অভিযোগের বর্ণনায় স্পষ্ট করা হয়নি কোনো ভূমিকা। পাশাপাশি তার গুরুতর শারীরিক অবস্থার বিষয়টিও বিবেচ্য।
‘দেশের প্রথম এই নারী স্পিকার দীর্ঘদিন ধরে ভুগছেন হৃদরোগসহ নানা জটিলতায়, নিয়মিত চিকিৎসার প্রয়োজন হলেও গত বছরের মাঝামাঝি সময়ের পর থেকে তা সম্ভব হয়নি- বলছিলেন আইনজীবী ইবনুল কাওসার।
চিকিৎসা অব্যাহত না থাকলে ড. শিরীনের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে- যোগ করলেন তার আইনজীবী।
অন্যদিকে আদালতে ড. শিরীনের মুক্তির আবেদনের বিরোধিতা করছিলেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ওমর ফারুক ফারুকী। ‘তিনি তৎকালীন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে সম্পৃক্ত থাকতে পারেন আন্দোলন দমনের ঘটনায়। মামলাটি তদন্তাধীন থাকায় এই পর্যায়ে জামিন দিলে তদন্তে ঘটতে পারে ব্যাঘাত।’
এই প্রেক্ষাপটে ঘটনাটিকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা কবলেন নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারা। দলটির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীবের ভাষ্য, ড . শিরীনকে গ্রেপ্তার ও দ্রুত জামিন দেওয়ার ঘটনাটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনকালে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে যে বোঝাপড়া হয়েছিল তারই অংশ।
হঠাৎ গ্রেপ্তার, পরে দায়মুক্তির মতো পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে, যা ভবিষ্যতে রাজনৈতিক পুনর্বাসনের ইঙ্গিত বহন করে। তাকে ঘিরে একটি ‘রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ’ গঠনের অবস্থা তৈরি হচ্ছে- আশঙ্কা আদীবের।
সাবেক স্পিকার তৎকালীন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হওয়ায় তাকে দায়মুক্তি দেওয়ার সুযোগ নেই উল্লেখের সঙ্গে হতাশা প্রকাশ করলেন এই এনসিপি নেতা। ‘এমন সিদ্ধান্ত অতীতের হত্যা, গুম ও নিপীড়নের শিকারদের প্রতি অবিচার।‘
একই সুরে মন্তব্য করলেন এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব জয়নাল আবেদিন শিশির। ‘ড. শিরীনকে একটি দুর্বল মামলায় আটক করা হয়েছিল এবং শুরু থেকেই ধারণা ছিল যে, দ্রুত মুক্তি দেওয়া হবে তাকে। এ ঘটনার মাধ্যমে আঁতাতের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির।’
তার অভিযোগ, ‘রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ’-এর মাধ্যমে অতীতের বিতর্কিত রাজনীতিকে পুনর্বাসনের চেষ্টা হতে পারে এবং বিচার প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগে দেওয়া উচিত নয় এ ধরনের জামিন।
'ড. শিরীনকে জামিনের উদ্দেশ্যেই আটক করা হয়েছিল। এটি আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিএনপির আঁতাতেরই অংশ। তাকে ঘিরে কোনো পরিকল্পনাও থাকতে পারে’- জোর দিয়েই বললেন দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার।
তবে এসব অভিযোগের পক্ষে সরাসরি কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি এবং সংশ্লিষ্ট বড় দলগুলোর পক্ষ থেকেও এখনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টি রাজনৈতিক বক্তব্য ও পাল্টা বিশ্লেষণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণঅভ্যুত্থানে দেশত্যাগ করার পরদিনই সংসদ ভেঙে দেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। সংবিধান অনুযায়ী, সংসদ ভেঙে দেওয়া হলেও স্পিকারের পদ তাৎক্ষণিকভাবে শূন্য হয় না; তবে সেই সময় পর্যন্ত অপেক্ষা না করে ২৭ দিনের মাথায় পদত্যাগ করেন ড. শিরীন। এরপর দীর্ঘ সময় জনসম্মুখে অনুপস্থিত ছিলেন তিনি।
মামলার বিবরণ বলছে, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই বিকেলে রাজধানীর আজিমপুর বাসস্ট্যান্ডে বিক্ষোভ চলছিল। সেখানে দেশি-বিদেশি অস্ত্র নিয়ে হামলা চলে তাদের ওপর। একটি গুলি লাগে আশরাফুল ওরফে ফাহিমের চোখে। বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নেন তিনি। ওই ঘটনায় গত বছরের ২৫ মে শেখ হাসিনাসহ ১৩০ জনের নাম উল্লেখ এবং অচেনা ১১৫-১২০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন আশরাফুল।
মামলায় আশরাফুলের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সভাপতি ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে বিপ্লব বড়ুয়া, ওবায়দুল কাদের ও আসাদুজ্জামান খান কামালের পরিকল্পনা-নির্দেশে পুলিশ সদস্য এবং অজ্ঞাতপরিচয়ের ব্যক্তিরা গুলি করে ছাত্র-জনতার ওপর। এ মামলায় ড. শিরীন ৩ নম্বর আসামি।
তার বিরুদ্ধে জুলাই আন্দোলনের সময় সংঘটিত হত্যা মামলাসহ পাওয়া গেছে ছয়টি মামলার তথ্য। এর মধ্যে তিনটিতে এরই মধ্যে দাখিল হয়েছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন। অন্য তিনটি তদন্তাধীন বলে জানাল ডিবি।

