‘সীন’ করে রেখে দেওয়া: ইসলামে যোগাযোগের নৈতিকতা

প্রতীকী ছবি
একসময় চিঠির উত্তর আসতে ও উত্তর যেতে কয়েক দিন লাগত। কখনো তো কয়েক সপ্তাহও লেগে যেত। তারপরও অপেক্ষার সেই সময়টুকু মানুষ মেনে নিত। আর এখন বার্তা পৌঁছাতে লাগে কয়েক সেকেন্ড। কিন্তু উত্তর পাওয়ার অপেক্ষাটি কখনো কখনো দীর্ঘই থেকে যাচ্ছে। মোবাইলের পর্দায় ভেসে ওঠে নোটিফিকেশন। বোঝা যায় বার্তাটি পড়া হয়েছে। অথচ কোনো উত্তর নেই। এই একটি ‘seen/ সীন’ কখনো কখনো অভিমান, উৎকণ্ঠা কিংবা সম্পর্কের দূরত্বের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
প্রশ্ন হলো, কাউকে বার্তা পাঠানোর পর উত্তর পাওয়া কি তার অধিকার? প্রতিটি বার্তার জবাব দেওয়া কি ইসলামে বাধ্যতামূলক?
সরল উত্তর হলো অবশ্যই নয়। একজন মানুষ ব্যস্ত থাকতে পারেন, তাৎক্ষণিক উত্তর দেওয়ার মতো অবস্থায় নাও থাকতে পারেন। কোনো বার্তার উত্তর দেওয়ার প্রয়োজনও না থাকতে পারে। তাই ‘সীন’ করে রেখে দিলেই কাউকে গুনাহগার বলা যায় না। কিন্তু ইসলাম যোগাযোগকে যে নৈতিকতার আওতায় এনেছে, সেখানে অকারণ উপেক্ষা, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ কিংবা অন্যকে কষ্ট দেওয়ার উদ্দেশ্যে নীরবতা অবশ্যই ভিন্ন বিষয়।
পবিত্র কোরআন মানুষের কথাবার্তার জন্য একটি মৌলিক নীতি দিয়েছে, ‘তোমরা সোজা-সঠিক কথা বলো’ (সুরা আহজাব, আয়াত : ৭০)। অন্যত্র বলা হয়েছে, ‘আমার বান্দাদের বলে দিন, তারা যেন এমন কথা বলে যা সর্বোত্তম’ (সুরা বনীইসরাঈল, আযাত : ৫৩)। অর্থাৎ শুধু সত্য কথা বলাই যথেষ্ট নয়, কথাটি হতে হবে সুন্দর ও কল্যাণকরও।
সালামের ক্ষেত্রে ইসলামের নির্দেশনা আরও স্পষ্ট। মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘যখন তোমাদের অভিবাদন করা হয়, তখন তোমরা তার চেয়ে উত্তম অভিবাদন করো অথবা অনুরূপ জবাব দাও’। (সুরা নিসা, আয়াত : ৮৬) রাসুলুল্লাহ (সা.) সালামের জবাব দেওয়াকে মুসলমানের ওপর অপর মুসলমানের অধিকারের অন্তর্ভুক্ত করেছেন (বুখারি, হাদিস: ১২৪০)। ফলে কেউ সালাম দিয়ে বার্তা পাঠালে তা দেখে অকারণে জবাব না দেওয়া ইসলামী সৌজন্যের পরিপন্থী তাজ।
যোগাযোগের নৈতিকতা শুধু শব্দের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের অনুভূতির প্রতিও ইসলাম সংবেদনশীল। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মুসলমান সে-ই, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ থাকে’ (বুখারি, হাদিস : ১০)। আজকের ডিজিটাল জীবনে হাতের জায়গা নিয়েছে আঙুল। জায়গা নিয়েছে ভার্চোয়াল স্ক্রিণ। জায়গা নিয়েছে ইনবক্স। যেখানে একটি মন্তব্য, একটি স্ক্রিনশট, একটি ফরওয়ার্ড, এমনকি কখনো ইচ্ছাকৃত নীরবতাও অন্যের কষ্টের কারণ হতে পারে। কখনো কখনো একটি সালামের জবাব না দেওয়া, একটি রিপ্লে না দেওয়ায় অপর পক্ষের জন্য খুবই কষ্টের কারণ হয়ে যেতে পারে। তাই ব্যক্তি, অবস্থা ও বিষয়ের গুরুত্ব বুঝে আচরণ করা আমাদের সকলের দায়িত্ব।
তবে এর অর্থ এই নয় যে প্রতিটি বার্তার উত্তর দিতে হবে সঙ্গে সঙ্গে। মানুষের ব্যক্তিগত সময় ও পরিসরেরও মূল্য আছে। বরং উত্তর দেওয়ার সুযোগ না থাকলে সংক্ষিপ্তভাবে জানিয়ে দেওয়া যেতে পারে, ‘এখন ব্যস্ত আছি, পরে কথা বলব।’ এতে উত্তরদাতার ব্যস্ততাও রক্ষা হয়, অন্যের অযথা অপেক্ষাও কমে।
আবার কিছু ক্ষেত্রে নীরবতাই উত্তম। কেউ যদি অশালীনতা, গিবত বা অনর্থক বিতর্কে টেনে নিতে চান, সেখানে উত্তর না দেওয়াই বিচক্ষণতা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিবসে বিশ্বাস করে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা নীরব থাকে’। (বুখারি, হাদিস : ৬০১৮)
ডিজিটাল যোগাযোগের আরেকটি বড় নৈতিকতা হলো যাচাই। কোরআন সতর্ক করে বলেছে, ‘কোনো ফাসিক তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে এলে তোমরা তা যাচাই করে নাও’। (সুরা হুজুরাত, আয়াত : ৬)। তাই কোনো বার্তা পড়ে সঙ্গে সঙ্গে ফরওয়ার্ড করে দেওয়া যেমন দায়িত্বশীলতা নয়, তেমনি প্রতিটি বার্তার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াও জরুরি নয়।
প্রযুক্তি আমাদের দূরত্ব কমিয়েছে, কিন্তু হৃদয়ের দূরত্ব কমাতে পারেনি। তাই ‘সীন’ নিয়ে ইসলামের শিক্ষা আসলে কোনো অ্যাপের ব্যবহারবিধি নয়; এটি মানুষের সঙ্গে আচরণের নীতি। সব বার্তার উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়, সব কথার উত্তর দেওয়াও প্রয়োজন নেই। কিন্তু যেখানে একটি ছোট্ট জবাব কারও দুশ্চিন্তা কমাতে পারে, একটি সালামের উত্তর সম্পর্ককে সুন্দর করতে পারে কিংবা একটি সংক্ষিপ্ত বার্তা দায়িত্ববোধের পরিচয় দিতে পারে, সেখানে অকারণ নীরবতার চেয়ে সুন্দর যোগাযোগই একজন মুমিনের জন্য উত্তম।
লেখক : আলেম ও সাংবাদিক





