যাঁকে ভালোবাসা ছাড়া মুমিন হওয়া যায় না

প্রতীকী ছবি
ভালোবাসা মানুষের হৃদয়ের সবচেয়ে গভীর অনুভূতিগুলোর একটি। মানুষ যাকে ভালোবাসে, তার কথা মনে রাখে, তার পছন্দকে নিজের পছন্দের ওপর স্থান দেয় এবং তার সন্তুষ্টিকে নিজের জন্য মূল্যবান মনে করে। কিন্তু ঈমানের সঙ্গে ভালোবাসার সম্পর্ক আরও গভীর। ইসলামে কিছু ভালোবাসা; যেগুলো ঈমানেরও দাবি। আর সেই ভালোবাসার সর্বোচ্চ মানবিক কেন্দ্র হলেন মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)। তিনি নিজেই বলেছেন—
لاَ يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ، حَتّى أَكُونَ أَحَبّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَوَلَدِهِ وَالنّاسِ أَجْمَعِينَ
‘তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হবে না, যতক্ষণ আমি তার কাছে তার পিতা, তার সন্তান এবং সকল মানুষের চেয়ে অধিক প্রিয় না হই।’ (বুখারি, হাদিস: ১৫; মুসলিম, হাদিস: ৪৪)
এ হাদিসে ভালোবাসার একটি অসাধারণ মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে। এখানে নবীজি (সা.)-কে ভালোবাসার কথা শুধু অনুভূতির অর্থে বলা হয়নি। বরং তাঁর প্রতি এমন ভালোবাসা কাম্য, যা মানুষের জীবনের সিদ্ধান্ত, মূল্যবোধ ও আচরণকে প্রভাবিত করে।
কেন তাঁকে এত ভালোবাসতে হবে? কারণ তিনি আল্লাহর রাসুল, যাঁর মাধ্যমে আমরা কোরআনের শিক্ষা পেয়েছি, আল্লাহর ইবাদতের পদ্ধতি জেনেছি এবং হক-বাতিলের পার্থক্য বুঝেছি। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রাসুলের আনুগত্য করল, সে তো আল্লাহরই আনুগত্য করল।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ৮০)
রাসুল (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর প্রমাণ হলো তাঁর অনুসরণ। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাস, তবে আমার অনুসরণ করো; তাহলে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের গুনাহ ক্ষমা করবেন।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ৩১)
অর্থাৎ আল্লাহর ভালোবাসা পাওয়ার পথও রাসুল (সা.)-এর অনুসরণের সঙ্গে যুক্ত। মুখে ভালোবাসার দাবি করা সহজ; কিন্তু তাঁর সুন্নাহকে জীবনের আদর্শ বানানোই সেই ভালোবাসার সত্যতা প্রমাণ করে।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনের দিকে তাকালে তাঁর প্রতি ভালোবাসার কারণ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি উম্মতের জন্য কেঁদেছেন, তাদের হেদায়াতের জন্য ব্যাকুল হয়েছেন এবং নিজের জীবনের স্বস্তির চেয়ে মানুষের কল্যাণকে প্রাধান্য দিয়েছেন। পবিত্র কোরআন তাঁর এই মমতার কথা তুলে ধরে বলেছে, ‘নিশ্চয়ই তোমাদের কাছে তোমাদের মধ্য থেকেই একজন রাসুল এসেছেন; তোমাদের দুঃখ-কষ্ট তাঁর কাছে অত্যন্ত কষ্টদায়ক, তিনি তোমাদের কল্যাণকামী এবং মুমিনদের প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা তাওবা, আয়াত: ১২৮)
তাঁর ভালোবাসার গভীরতা বোঝা যায় সাহাবিদের জীবনেও। বুখারির একটি বর্ণায় দেখা্ যায় যে,
‘আবদুল্লাহ ইবনু হিশাম (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা একবার নবী (সা.)-এর সঙ্গে ছিলাম। তিনি তখন উমর ইবনে খাত্তাব (রা.)-এর হাত ধরেছিলেন। উমর (রা.) তাঁকে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমার জান ছাড়া আপনি আমার কাছে সব কিছু চেয়ে অধিক প্রিয়। তখন নবী (সা.) বললেন: না, যাঁর হাতে আমার প্রাণ ঐ সত্তার কসম! তোমার কাছে আমি যেন তোমার প্রাণের চেয়েও প্রিয় হই। তখন উমার (রা.) তাঁকে বললেন, আল্লাহর কসম! এখন আপনি আমার কাছে আমার প্রাণের চেয়েও বেশি প্রিয়। নবী (সা.) বললেন: হে উমর! এখন (তুমি সত্যিকার ঈমানদার হলে)। (বুখারি, হাদিস: ৬৬৩২)
এ ভালোবাসা শুধু আবেগের ছিল না। সাহাবিদের জীবন ছিল তাঁর আনুগত্যের বাস্তব প্রতিচ্ছবি। তাঁরা তাঁর একটি নির্দেশের সামনে নিজেদের মতামত, অভ্যাস ও ব্যক্তিগত পছন্দকে বিসর্জন দিতে প্রস্তুত ছিলেন। কারণ তাঁরা জানতেন, রাসুলের ভালোবাসা মানে তাঁর পথকে ভালোবাসা।
রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, ‘তিনটি বিষয় যার মধ্যে থাকবে, সে ঈমানের স্বাদ লাভ করবে: এক. আল্লাহ্ ও তাঁর রাসুল তার নিকট অন্য সকল কিছু হতে অধিক প্রিয় হওয়া; দুই. কাউকে একমাত্র আল্লাহর জন্যই ভালবাসা; তিন. কুফরীতে প্রত্যাবর্তনকে আগুনে নিক্ষিপ্ত হবার মত অপছন্দ করা।’ (বুখারি, হাদিস: ১৬; মুসলিম, হাদিস: ৪৩)
আজ আমাদের নিজেদের প্রশ্ন করা দরকার—আমরা কি সত্যিই তাঁকে ভালোবাসি? তাঁর নাম শুনলে কি অন্তর নরম হয়ে আসে? তাঁর সুন্নাহ কি আমাদের জীবনে জায়গা করে নিয়েছে? তাঁর চরিত্র কি আমাদের আচরণের আদর্শ? আমরা কি তাঁর শেখানো ক্ষমা, দয়া, বিনয়, সত্যবাদিতা ও মানবিকতা ধারণ করতে চেষ্টা করি?
রাসুল (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা মানে শুধু তাঁর জন্মদিনে আবেগ প্রকাশ করা নয়; তাঁর প্রতি দরুদ পড়া, তাঁর জীবন জানা, তাঁর সুন্নাহ অনুসরণ করা, তাঁর আদর্শকে ভালোবাসা এবং তাঁর আনীত দ্বীনের ওপর অবিচল থাকা। কোরআন মুমিনদের শিক্ষা দিয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর প্রতি সালাত প্রেরণ করেন। হে মুমিনগণ! তোমরাও তাঁর প্রতি সালাত ও সালাম প্রেরণ করো।’ (সুরা আহযাব, আয়াত: ৫৬)
পৃথিবীতে কত মানুষ আসে, আবার চলে যায়। সময় তাদের স্মৃতিকে মুছে দেয়। কিন্তু মুহাম্মদ (সা.) এমন এক নাম, যা মুমিনের হৃদয়ে শুধু ইতিহাস হয়ে বেঁচে থাকে না; বেঁচে থাকে ভালোবাসা হয়ে, অনুসরণ হয়ে, অশ্রু হয়ে, দরুদ হয়ে।
তাঁকে ভালোবাসা ঈমানের অলংকার নয় শুধু, ঈমানের দাবি। তাঁর প্রতি ভালোবাসা যত গভীর হবে, তাঁর সুন্নাহর প্রতি আনুগত্য তত দৃঢ় হবে এবং তাঁর চরিত্র নিজের জীবনে ধারণ করার আকাঙ্ক্ষাও তত প্রবল হবে। তাই একজন মুমিনের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর পরিচয় হতে পারে—সে এমন একজন মানুষকে ভালোবাসে, যিনি তাঁর উম্মতের জন্য সারাজীবন কেঁদেছেন, দোয়া করেছেন এবং কল্যাণ চেয়েছেন।
আল্লাহ আমাদের অন্তরে তাঁর প্রিয় হাবিব মুহাম্মদ (সা.)-এর সত্যিকারের ভালোবাসা দান করুন। তাঁর সুন্নাহকে ভালোবাসার, অনুসরণ করার এবং তাঁর আদর্শের ওপর জীবন গড়ার তাওফিক দিন। আর কিয়ামতের দিন তাঁর শাফাআতের ছায়ায় আমাদের স্থান দিন। আমিন।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক






