(হাদিসের গল্প)
নবীজির দোয়ায় খেজুরে অভাবনীয় বরকত

প্রতীকী ছবি
মদিনার আকাশে সেদিন যেন বিষণ্নতার ছায়া। জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.)-এর পিতা ইন্তেকাল করেছেন। আপনজন হারানোর শোকের সঙ্গে এবার যোগ হয়েছে আরও এক কঠিন দায়িত্ব। তার পিতা রেখে গেছেন ঋণ। ঋণের বোঝা শুধু মৃত ব্যক্তির ওপরই থাকে না, উত্তরাধিকারীদের হৃদয়েও তার ভার এসে পড়ে। জাবির (রা.)-এর পিতার ওপর ছিল প্রায় ত্রিশ ওয়াসাক ঋণ।
সে সময় খেজুর ছিল মদিনার অন্যতম প্রধান সম্পদ। জাবির (রা.) ভাবলেন, বাগানের খেজুর দিয়ে যদি পাওনাদারদের ঋণ পরিশোধ করা যায়, তাহলে হয়তো বাবার দায়মুক্তি হবে। তিনি পাওনাদারদের কাছে প্রস্তাব দিলেন, তারা যেন তার খেজুর গ্রহণ করে তাদের পাওনা বুঝে নেন। কিন্তু হিসাব করে তারা তাতে রাজি হলেন না। খেজুরের পরিমাণ বা মান দিয়ে তাদের পাওনা পুরোপুরি পরিশোধ হবে না বলে তারা তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করলেন।
জাবির (রা.) যেন আরও অসহায় হয়ে পড়লেন। একদিকে বাবাকে হারানোর বেদনা, অন্যদিকে তার রেখে যাওয়া ঋণ। শেষ পর্যন্ত তিনি এমন একজনের দরজায় গেলেন, যাঁর কাছে দুঃখ-কষ্টের কথা বললে মানুষ শুধু সান্ত্বনাই পেত না, বরং সমাধানের পথও খুঁজে পেত। তিনি ছিলেন আল্লাহর রাসুল মুহাম্মদ (সা.)।
জাবির (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে গিয়ে পুরো বিষয়টি জানালেন। নবীজি (সা.) তার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। তারপর এমন একটি নির্দেশ দিলেন, যার মধ্যে ছিল একদিকে বাস্তব সমাধান, অন্যদিকে আল্লাহর ওপর আস্থার শিক্ষা।
তিনি বললেন, খেজুরগুলো সংগ্রহ করে মাচায় রাখো এবং আমাকে খবর দিও।
জাবির (রা.) নির্দেশ অনুযায়ী খেজুর সংগ্রহ করলেন। তারপর রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে সংবাদ দিলেন।
একসময় নবীজি (সা.) সেখানে এলেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন আবু বকর (রা.) ও উমর (রা.)। তিনি খেজুরের স্তূপের কাছে গিয়ে বসলেন। তারপর আল্লাহর কাছে বরকতের দোয়া করলেন।
কী আশ্চর্য দৃশ্য!
একদিকে প্রায় ত্রিশ ওয়াসাক ঋণ। অন্যদিকে সেই ঋণ পরিশোধ করার জন্য রাখা সামান্য খেজুর। সাধারণ হিসাব বলছিল, এই খেজুর দিয়ে সব পাওনা মেটানো সম্ভব নয়। কিন্তু জাবির (রা.)-এর সামনে তখন ছিল এমন এক দোয়া, যা এসেছিল আল্লাহর রাসুলের পবিত্র মুখ থেকে।
দোয়া করার পর নবীজি (সা.) জাবির (রা.)-কে বললেন, তার পাওনাদারদের ডাকতে এবং প্রত্যেকের প্রাপ্য পরিশোধ করে দিতে।
জাবির (রা.) একে একে পাওনাদারদের ডাকতে শুরু করলেন।
একজন এলেন। তার পাওনা দেওয়া হলো।
আরেকজন এলেন। তার পাওনাও পরিশোধ করা হলো।
এভাবে একে একে পিতার সব পাওনাদারের ঋণ পরিশোধ হয়ে গেল।
জাবির (রা.) অবাক হয়ে দেখলেন, যেই খেজুর দিয়ে সব ঋণ পরিশোধ হওয়ার কথা ছিল না, তা দিয়েই তার পিতার সব পাওনা পরিশোধ হয়ে গেছে। শুধু তাই নয়; ঋণ পরিশোধের পরও খেজুর অবশিষ্ট রয়ে গেছে।
হিসাব করে দেখা গেল, অবশিষ্ট রয়েছে তের ওয়াসাক খেজুর। সাত ওয়াসাক ছিল ‘আজওয়া’ খেজুর এবং ছয় ওয়াসাক ছিল অপেক্ষাকৃত নিম্নমানের খেজুর। হাদিসের কোনো কোনো বর্ণনায় পরিমাণের বিন্যাসে সামান্য ভিন্নতা এসেছে। কিন্তু মূল ঘটনা একই: সব ঋণ পরিশোধের পরও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ খেজুর অবশিষ্ট ছিল।
জাবির (রা.)-এর বিস্ময়ের যেন শেষ নেই।
যে খেজুর পাওনাদারদের কাছে যথেষ্ট মনে হয়নি, সেই খেজুরই কীভাবে সব ঋণ পরিশোধ করল?
উত্তরটি ছিল তাঁর চোখের সামনে।
সেটি ছিল আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর দোয়ার বরকত।
এই ঘটনার আরেকটি বর্ণনায় এসেছে, ঋণ পরিশোধের পর জাবির (রা.) নবীজি (সা.)-এর সঙ্গে মাগরিবের সালাত আদায় করেন। সালাত শেষে তিনি নবীজি (সা.)-কে অবশিষ্ট খেজুরের কথা জানালেন। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) হাসলেন এবং বললেন, আবু বকর ও উমর (রা.)-এর কাছে গিয়ে তাদের এই সংবাদ দিতে।
জাবির (রা.) তাদের কাছে গিয়ে যখন ঘটনাটি বললেন, তারা বললেন, আল্লাহর রাসুল (সা.) যখন এ ব্যাপারে যা করার তা করেছেন, তখন এমনটাই হবে, আমরা তা আগেই জানতাম।
কী গভীর ছিল সাহাবিদের বিশ্বাস!
তাদের কাছে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দোয়া ছিল শুধু একজন নেককার মানুষের দোয়া নয়। তারা জানতেন, তিনি আল্লাহর প্রিয় নবী। তাঁর দোয়ার বরকত আল্লাহ যেভাবে চান, সেভাবেই প্রকাশ পেতে পারে।
এই ঘটনা আমাদের সামনে বরকতের এক অনন্য চিত্র তুলে ধরে। বরকত মানে শুধু কোনো জিনিসের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া নয়। বরং অল্প সম্পদে এমন কল্যাণ সৃষ্টি হওয়া, যা সাধারণ হিসাবের বাইরে গিয়ে প্রয়োজন পূরণ করে। জাবির (রা.)-এর খেজুরের ঘটনাটি সেই বরকতেরই এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত।
এখানে আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। নবীজি (সা.) শুধু দোয়া করেননি, জাবির (রা.)-কে বাস্তব পদক্ষেপও নিতে বলেছেন। খেজুর সংগ্রহ করতে বলেছেন, মাচায় রাখতে বলেছেন, পাওনাদারদের ডাকতে বলেছেন এবং তাদের পাওনা পরিশোধ করতে বলেছেন। অর্থাৎ ইসলামে তাওয়াক্কুল মানে হাত গুটিয়ে বসে থাকা নয়। চেষ্টা করতে হয়, ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়, তারপর আল্লাহর ওপর ভরসা করতে হয়।
আর এই ঘটনার সবচেয়ে আবেগময় দিক হলো, জাবির (রা.) তার পিতার ঋণ পরিশোধের চিন্তায় যখন দিশেহারা, তখন নবীজি (সা.) তার পাশে দাঁড়িয়েছেন। তিনি শুধু একটি সমস্যার সমাধান করেননি; একজন শোকাহত সাহাবিকে আশ্বস্ত করেছেন এবং তার পিতার দায়মুক্তির পথ করে দিয়েছেন।
সহিহ বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী, জাবির (রা.)-এর পিতা ত্রিশ ওয়াসাক ঋণ রেখে ইন্তেকাল করেছিলেন এবং নবীজি (সা.)-এর দোয়ার পর সেই খেজুর থেকে তার সব ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব হয়েছিল; এমনকি তের ওয়াসাক খেজুর অবশিষ্টও ছিল। (সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ২৭০৯)
ঘটনাটি তাই শুধু একটি ঋণ পরিশোধের গল্প নয়। এটি আস্থার গল্প। এটি নবীপ্রেমের গল্প। এটি দোয়ার শক্তির গল্প। আর সর্বোপরি, এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা বরকতের গল্প।
মানুষের হিসাব যেখানে থেমে যায়, আল্লাহর রহমতের হিসাব সেখানে শুরু হতে পারে। সেদিন মদিনার একটি খেজুরের মাচা যেন মানুষকে নীরবে একটি চিরন্তন শিক্ষা দিয়ে গিয়েছিল। তা হচ্ছে- সম্পদ কম হতে পারে, সামর্থ্য সীমিত হতে পারে, মানুষের হিসাব ব্যর্থ হতে পারে; কিন্তু আল্লাহর রহমতের দরজা কখনো মানুষের হিসাবের সীমায় আবদ্ধ নয়।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক






