মহানবী (সা.)-এর ওপর দরূদ পাঠের অনুপম উপকারিতা

প্রতীকী ছবি
মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর দরূদ ও সালাম পাঠ মুমিনের ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও আনুগত্যের এক অনন্য প্রকাশ। আল্লাহ তাআলা নিজেই তাঁর প্রিয় নবীর ওপর দরূদ পাঠ করেন এবং মুমিনদেরও তাঁর ওপর দরূদ ও সালাম পাঠের নির্দেশ দিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতারা নবীর ওপর দরূদ পাঠ করেন। হে মুমিনগণ! তোমরাও তাঁর ওপর দরূদ পাঠ করো এবং যথাযথভাবে সালাম পেশ করো।’ (সুরা আহযাব, আয়াত : ৫৬)
এ আয়াত প্রমাণ করে, দরূদ শুধু নফল আমলের পাশাপাশি নবীপ্রেম ও ঈমানি চেতনারও গুরুত্বপূর্ণ এক বহিঃপ্রকাশ।
দরূদ পাঠের সবচেয়ে বড় উপকারিতার একটি হলো, এর বিনিময়ে আল্লাহ বান্দার ওপর বিশেষ রহমত নাজিল করেন। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দরূদ পাঠ করে, আল্লাহ তার ওপর দশবার রহমত নাজিল করেন।’ (মুসলিম, হাদিস : ৪০৮) অর্থাৎ একজন বান্দা যখন আন্তরিকতার সঙ্গে একবার ‘আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদ’ বলে, আল্লাহর পক্ষ থেকে তার জন্য দশগুণ রহমতের ঘোষণা রয়েছে। একজন মুমিনের জন্য এর চেয়ে বড় সৌভাগ্য আর কী হতে পারে!
দরূদ গুনাহ মোচন ও মর্যাদা বৃদ্ধিরও কারণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দরূদ পাঠ করে, আল্লাহ তার ওপর দশটি রহমত নাজিল করেন, তার দশটি গুনাহ মুছে দেন এবং তার জন্য দশটি মর্যাদা বৃদ্ধি করেন।’ (নাসাঈ, হাদিস : ১২৯৭) তাই দরূদ এমন একটি আমল, যার মাধ্যমে একই সঙ্গে আল্লাহর রহমত, গুনাহের ক্ষমা এবং মর্যাদা বৃদ্ধির আশা করা যায়।
দরূদ পাঠ দোয়া কবুলের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। মহানবী (সা.) এক ব্যক্তিকে দোয়া করতে শুনে বলেন, সে তাড়াহুড়ো করেছে। এরপর তিনি শিক্ষা দেন, প্রথমে আল্লাহর প্রশংসা করবে, তারপর নবীর ওপর দরূদ পাঠ করবে, এরপর নিজের প্রয়োজনের কথা বলবে। (আবু দাউদ, হাদিস : ১৪৮১; তিরমিজি, হাদিস : ৩৪৭৭) এতে বোঝা যায়, দোয়ার আগে ও পরে দরূদ পাঠ করা দোয়ার গুরুত্বপূর্ণ আদব। এতে দোয়া কবুলের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়।
দরূদ পাঠের আরেকটি অসাধারণ ফজিলত হলো, কিয়ামতের দিন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সবচেয়ে নিকটবর্তী হওয়ার সুযোগ। তিনি বলেছেন, ‘কিয়ামতের দিন আমার সবচেয়ে নিকটবর্তী হবে সে ব্যক্তি, যে আমার ওপর সবচেয়ে বেশি দরূদ পাঠ করেছে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ৪৮৪) দুনিয়ার সামান্য সময়ের একটি আমল যদি আখিরাতে প্রিয় নবীর সান্নিধ্যের কারণ হয়, তাহলে একজন মুমিনের জীবনে দরূদের গুরুত্ব কত গভীর, তা সহজেই উপলব্ধি করা যায়।
শুক্রবার দরূদ পাঠের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের সর্বোত্তম দিনগুলোর একটি হলো জুমার দিন। সুতরাং এ দিনে তোমরা আমার ওপর বেশি বেশি দরূদ পাঠ করো। তোমাদের দরূদ আমার কাছে পেশ করা হয়।’ সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, আমাদের দরূদ আপনার কাছে কীভাবে পেশ করা হবে, যখন আপনি ইন্তেকাল করবেন? তিনি বললেন, ‘আল্লাহ নবীদের দেহ মাটির জন্য হারাম করে দিয়েছেন।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ১০৪৭)
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নাম উচ্চারিত হওয়ার পর তাঁর ওপর দরূদ পাঠ করা একজন মুসলিমের কর্তব্যবোধ ও ভালোবাসার পরিচয়। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ‘কৃপণ সেই ব্যক্তি, যার কাছে আমার নাম উল্লেখ করা হলো অথচ সে আমার ওপর দরূদ পাঠ করল না।’ (তিরমিজি, হাদিস : ৩৫৪৬) অর্থাৎ নবীর নাম শুনেও দরূদ না পড়া একজন মুমিনের জন্য অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের বিষয়।
দরূদ ও সালাম মানুষের হৃদয়ে নবীপ্রেম জাগ্রত করে এবং তাঁর আদর্শ স্মরণ করিয়ে দেয়। কারণ প্রকৃত দরূদ শুধু মুখের উচ্চারণে সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি মানুষকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণ, তাঁর চরিত্র ধারণ এবং তাঁর নির্দেশের প্রতি আনুগত্যের দিকে নিয়ে যায়। প্রতিদিনের জীবনে বেশি বেশি দরূদ পাঠ করলে মুমিনের হৃদয়ে নবী (সা.)-এর স্মরণ জীবন্ত থাকে, তাঁর প্রতি ভালোবাসা গভীর হয় এবং সুন্নাহর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় হয়।
তাই দরূদকে শুধু বিশেষ কোনো সময়ের আমল হিসেবে সীমাবদ্ধ না রেখে নামাজের পর, দোয়ার সময়, জুমার দিনে, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নাম শুনলে এবং অবসর সময়ে নিয়মিত পাঠ করা উচিত। একবার দরূদ পাঠে দশটি রহমত, দশটি গুনাহ মোচন ও দশটি মর্যাদা বৃদ্ধির যে সুসংবাদ রয়েছে, তা মুমিনের জন্য অফুরন্ত আশার দ্বার খুলে দেয়। দরূদের প্রতিটি উচ্চারণ যেন নবীপ্রেমের একটি ফুল, যা দুনিয়ায় হৃদয়কে সজীব করে এবং আখিরাতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সান্নিধ্যের প্রত্যাশাকে আরও গভীর করে।
মাহন আল্লাহ আমাদের সকলকে মহানবী (সা.) শানে বেশি বেশি দরূদ পাঠ ও নবীজির সুন্নাহ অনুসরণ, তাঁর চরিত্র ধারণ এবং তাঁর নির্দেশের প্রতি আনুগত্যের তাওফিক দান করুন।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক






