রাসুলপ্রেমের দাবি ও আমাদের জীবন

সংগৃহীত ছবি
ভালোবাসা মানুষের হৃদয়ের এমন এক অনুভূতি, যার সত্যতা কথার চেয়ে কাজে বেশি প্রকাশ পায়। আমরা যাকে ভালোবাসি; তার কথা মন দিয়ে শুনি, তার পছন্দকে গুরুত্ব দিই এবং তার দেখানো পথ অনুসরণ করার চেষ্টা করি। তাই মহানবী (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসাও কেবল আবেগের বিষয় নয়। তাঁর নাম শুনে হৃদয় নরম হওয়া, দরুদ পড়ে চোখ ভিজে যাওয়া কিংবা ভালোবাসার কথা বলা নিঃসন্দেহে ঈমানি আবেগের প্রকাশ। কিন্তু সেই ভালোবাসার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো তাঁর দেখানো পথে চলা, তাঁর সুন্নাহকে জীবনের আদর্শ করে নেওয়া এবং তাঁর নির্দেশকে নিজের প্রবৃত্তির ওপর প্রাধান্য দেওয়া।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসার মর্যাদা বোঝার জন্য এর চেয়ে বড় প্রমাণ আর কী হতে পারে যে, আল্লাহ তাআলা নিজেই তাঁর প্রিয় নবীর মর্যাদা ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর ওপর সালাত পাঠ করেন। হে মুমিনগণ! তোমরাও তাঁর ওপর সালাত পাঠ কর এবং তাঁকে উত্তমরূপে সালাম জানাও।’ (সুরা আহযাব, আয়াত : ৫৬) এই আয়াতে মুমিনদের রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি দরুদ ও সালাম পাঠের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাঁর প্রতি সম্মান ও ভালোবাসা যে ঈমানি জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, এ আয়াত তারই গভীর ইঙ্গিত বহন করে।
তবে রাসুলপ্রেমের আসল পরীক্ষা আবেগের মুহূর্তে নয়; জীবনের সিদ্ধান্তের সময়। নিজের ইচ্ছা একদিকে আর রাসুলের শিক্ষা অন্যদিকে হলে একজন মুমিন কোনটিকে বেছে নেবে? পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রাসুলের আনুগত্য করল, সে তো আল্লাহরই আনুগত্য করল।” (সুরা নিসা, আয়াত : ৮০)। অর্থাৎ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আনুগত্য আল্লাহর আনুগত্যেরই অংশ। তাঁর দেখানো পথ থেকে সরে গিয়ে শুধু ভালোবাসার দাবি করা তাই ভালোবাসার পূর্ণ প্রকাশ হতে পারে না।
এ কারণেই আল্লাহ তাআলা নিজের ভালোবাসা লাভের দাবিকেও রাসুলের অনুসরণের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তিনি কোরআনুল কারীমে বলেছেন, ‘বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসো, তবে আমার অনুসরণ করো; আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করে দেবেন। আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ৩১)। আয়াতটি যেন ভালোবাসার একটি মাপকাঠি নির্ধারণ করে দিয়েছে। আল্লাহকে ভালোবাসি বলা সহজ, কিন্তু সেই ভালোবাসার সত্যতা প্রমাণ করতে হলে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অনুসরণ করতে হবে। তাঁর সুন্নাহ তখন কিছু আনুষ্ঠানিক আমলের মধ্যে সীমিত রাখলে চলবে না, বরং তা হয়ে উঠতে হবে জীবনযাপনের পদ্ধতি।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা যে ঈমানের পূর্ণতার সঙ্গে সম্পর্কিত, তিনি নিজেই তা স্পষ্ট করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা, তার সন্তান এবং সব মানুষের চেয়ে বেশি প্রিয় হই।’ (বুখারি, হাদিস : ১৫)। এই ভালোবাসার অর্থ মানুষের স্বাভাবিক সম্পর্ক ও ভালোবাসাকে অস্বীকার করা নয়। বরং যখন আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের নির্দেশের সঙ্গে ব্যক্তিগত ইচ্ছার সংঘাত হয়, তখন মুমিন আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের নির্দেশকেই অগ্রাধিকার দেবে। এটাই রাসুলপ্রেমের ঈমানি মানদণ্ড।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন ছিল পবিত্র কোরআনের বাস্তব ব্যাখ্যা। তিনি কীভাবে ইবাদত করেছেন, মানুষের সঙ্গে কেমন আচরণ করেছেন, পরিবারকে কীভাবে ভালোবেসেছেন, দুর্বল ও অসহায় মানুষের পাশে কীভাবে দাঁড়িয়েছেন, শত্রুর প্রতিও কীভাবে ন্যায় ও সংযম বজায় রেখেছেন, তাঁর সমগ্র জীবনই মুসলমানের জন্য অনুসরণীয় আদর্শ। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।’ (সুরা আহযাব, আয়াত : ২১) তাই রাসুলপ্রেমের অর্থ কেবল তাঁর জন্ম, জীবন ও চরিত্রের আলোচনা করা নয়; বরং তাঁর চরিত্রের আলো নিজের জীবনে ধারণ করা।
তিনি সত্যবাদিতাকে ভালোবাসতেন, তাই তাঁর উম্মতের মুখে মিথ্যা মানায় না। তিনি আমানত রক্ষা করেছেন, তাই তাঁর অনুসারীর জীবনে বিশ্বাসঘাতকতার স্থান থাকতে পারে না। তিনি মানুষের প্রতি দয়া করেছেন, তাই রাসুলপ্রেমিক হৃদয় নিষ্ঠুর হতে পারে না। তিনি ক্ষমার শিক্ষা দিয়েছেন, তাই প্রতিশোধের সুযোগ পেলেই প্রতিশোধ নেওয়াকে ভালোবাসার প্রমাণ বলা যায় না। তিনি পরিবার, প্রতিবেশী, এতিম, দরিদ্র ও দুর্বল মানুষের অধিকারকে গুরুত্ব দিয়েছেন, তাই তাঁর সুন্নাহ অনুসরণের দাবি মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধে প্রকাশ পাওয়ার কথা।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসার সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক প্রতিদানও রয়েছে আখিরাতে। এক সাহাবি যখন বললেন, তার অনেক নফল আমল নেই, তবে তিনি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে ভালোবাসেন, তখন রাসুলুল্লাহ (ছা.) বললেন, ‘তুমি যাকে ভালোবাসো, তুমি তার সঙ্গেই থাকবে।’ (বুখারি, হাদিস : ৩৬৮৮)। সাহাবায়ে কেরামের কাছে এই বাণী ছিল অপরিসীম আনন্দের সংবাদ। কারণ সত্যিকারের ভালোবাসা মানুষকে প্রিয়জনের সান্নিধ্যের দিকে নিয়ে যায়।
তাই রাসুলপ্রেমের নমুনা পেশ করতে গেলে সবার আগে প্রয়োজন ভালোবাসার ভাষাকে জীবনের ভাষায় পরিণত করা। তাঁর নামের প্রতি সম্মান যেমন থাকবে, তেমনি তাঁর সুন্নাহর প্রতিও সম্মান থাকবে। তাঁর প্রশংসা যেমন থাকবে, তেমনি তাঁর আদর্শ অনুসরণের চেষ্টা থাকবে। দরুদ যেমন থাকবে, তেমনি তাঁর চরিত্রের অনুকরণও থাকবে। কারণ রাসুলুল্লাহ (ছা.)-কে ভালোবাসা মানে শুধু তাঁকে ভালোবাসার কথা বলা নয়; তাঁর দেখানো পথে নিজের জীবনকে পরিচালিত করা। হৃদয়ে যে ভালোবাসা সত্য, তার পদচিহ্ন জীবনের পথেই দেখা যায়। আর রাসুলপ্রেমের সবচেয়ে সুন্দর পদচিহ্ন হলো তাঁর সুন্নাহর অনুসরণ।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক







