নবীজির মদিনা: একটি মানবিক সমাজের নকশা

সংগৃহীত ছবি
ইতিহাসের পাতা খুললে মদিনাকে শুধু একটি শহর হিসেবে দেখা যায় না। এটি ছিল এমন এক সমাজের বাস্তব অনুশীলনক্ষেত্র, যেখানে গোত্রের অহংকারের বদলে ভ্রাতৃত্ব, প্রতিশোধের বদলে ন্যায়বিচার, সম্পদের একচেটিয়া দখলদারিত্বের বদলে সামাজিক দায়িত্ব এবং ধর্মীয় বিভেদের বদলে নাগরিক সহাবস্থানের একটি নতুন দৃষ্টান্ত গড়ে উঠেছিল। রাসুলুল্লাহ (সা.) মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করার পর যে সমাজ নির্মাণ করেছিলেন, সেখানে তিনি শুধু মানুষের বিশ্বাস পরিবর্তন করেননি, মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক, অর্থনীতি, নাগরিক দায়িত্ব ও সামাজিক নৈতিকতারও নতুন ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন।
মদিনায় এসে নবীজি (সা.)-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা। মক্কা থেকে আগত মুসলিমরা ঘরবাড়ি, সম্পদ ও জীবিকার বড় অংশ পেছনে ফেলে এসেছিলেন। মদিনার আনসাররা তাদের আপন ভাইয়ের মতো গ্রহণ করেছিলেন। পবিত্র কোরআন আনসারদের এই মানসিকতার প্রশংসা করে বলেছে, ‘তারা নিজেদের প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও অন্যদের নিজেদের ওপর অগ্রাধিকার দিত’ (সুরা হাশর, আয়াত : ৯)। এই ভ্রাতৃত্ব শুধূ আবেগের সম্পর্ক ছিল না। এটি ছিল সামাজিক সংহতি ও পারস্পরিক দায়িত্বের এক বাস্তব ও জীবন্ত কাঠামো।
মদিনার সমাজে ধর্মীয় সহাবস্থানের বিষয়টিও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। হিজরতের পর মদিনায় মুসলিমদের পাশাপাশি ইহুদি ও বিভিন্ন গোত্রের মানুষ বসবাস করত। ঐতিহাসিক সূত্রে মদিনার সনদ নামে পরিচিত দলিলে বিভিন্ন গোষ্ঠীর পারস্পরিক অধিকার ও দায়িত্বের একটি কাঠামো পাওয়া যায়। এর মাধ্যমে নগরজীবনে নিরাপত্তা, পারস্পরিক সহযোগিতা ও দায়িত্বের একটি রাজনৈতিক-সামাজিক কাঠামো প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়েছিল। আধুনিক রাষ্ট্রের সংবিধানের সঙ্গে এটিকে হুবহু এক করে দেখা ঠিক নয়; তবে বহু সম্প্রদায়ের মানুষকে একটি রাজনৈতিক সমাজের কাঠামোয় সংগঠিত করার ক্ষেত্রে এটি ইসলামের প্রাথমিক যুগের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দলিল।
মদিনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল বাজার ও অর্থনৈতিক নৈতিকতা। ইসলাম ব্যবসাকে নিষিদ্ধ করেনি; বরং ব্যবসার সঙ্গে সততা ও ন্যায়কে অবিচ্ছেদ্য করেছে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৮৮) রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রতারণার ব্যাপারে কঠোর সতর্ক করে বলেছেন: ‘যে প্রতারণা করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (মুসলিম, হাদিস : ১০১)। অর্থাৎ মদিনার বাজার শুধু কেনাবেচার স্থান ছিল না; সেটিও ছিল নৈতিকতার পরীক্ষাক্ষেত্র।
এই সমাজব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ন্যায়বিচার। ইসলাম এমন ন্যায়বিচারের শিক্ষা দিয়েছে, যা নিজের স্বার্থ, আত্মীয়তা এমনকি শত্রুতার ঊর্ধ্বে। পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে- ‘কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদের ন্যায়বিচার থেকে বিরত না রাখে। তোমরা ন্যায়বিচার করো; সেটিই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত : ৮) মদিনার সমাজে এই নীতি ছিল অত্যন্ত মৌলিক। সেখানে বিচারের ক্ষেত্র কে কোন মতাবলম্বি, কে কোন অবস্থানে আছে; তা দেখা হতো না। পরিবার, ব্যবসা, প্রতিবেশ, নেতৃত্ব এবং ব্যক্তিগত বিরোধেও বেলায় সকলে সমসুযোগ ভোগ করতেন।
মদিনায় দরিদ্র ও দুর্বল মানুষের অধিকারও সমাজের প্রান্তিক কোনো বিষয় ছিল না। এতিম, মিসকিন, মুসাফির, দরিদ্র ও অসহায় মানুষের প্রতি দায়িত্বকে কোরআন বারবার ঈমান ও নৈতিকতার সঙ্গে যুক্ত করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের দুনিয়ার একটি কষ্ট দূর করে দেয়, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার একটি কষ্ট দূর করবেন।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৬৯৯)। ফলে মদিনার আদর্শ সমাজে দুর্বল মানুষকে করুণার পাত্র হিসেবে নয়, বরং অধিকারসম্পন্ন মানুষ হিসেবে দেখার শিক্ষা পাওয়া যায়।
মদিনার সমাজের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এখানেই যে, নৈতিকতা ব্যক্তিগত ইবাদতের গণ্ডিতে আবদ্ধ নয়। একজন মানুষ নামাজ পড়বেন, কিন্তু ব্যবসায় প্রতারণা করবেন; ইবাদত করবেন, কিন্তু প্রতিবেশীর অধিকার নষ্ট করবেন; ধর্মের কথা বলবেন, কিন্তু ক্ষমতা পেলে অন্যায় করবেন, এমন সমাজ নবীজির আদর্শ সমাজ হতে পারে না। তাঁর প্রতিষ্ঠিত সমাজে আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের সঙ্গে মানুষের অধিকার রক্ষা, ন্যায়বিচার, আমানতদারি, পারস্পরিক সহযোগিতা ও সামাজিক দায়িত্ব একই নৈতিক কাঠামোর অংশ।
আজ আমাদের শহরগুলো বড় হয়েছে, প্রযুক্তি বদলেছে, রাষ্ট্রের কাঠামো জটিল হয়েছে। কিন্তু মানুষের মৌলিক প্রয়োজন বদলায়নি। মানুষ এখনো নিরাপত্তা চায়, ন্যায়বিচার চায়, সম্মান চায়, প্রতারণামুক্ত বাজার চায়, প্রতিবেশীর সহযোগিতা চায় এবং দুর্দিনে পাশে দাঁড়ানোর মতো মানুষ চায়।
নবীজি (সা.)-এর মদিনা আমাদের শেখায়, একটি সুন্দর সমাজ শুধু সুন্দর আইন দিয়ে তৈরি হয় না; প্রয়োজন সুন্দর মানুষ, দায়িত্বশীল নাগরিক এবং নৈতিক নেতৃত্ব। সমাজের পরিবর্তন শুরু হয় মানুষের অন্তর থেকে, কিন্তু তার প্রকাশ ঘটে মানুষের আচরণে।
রবিউল আউয়ালে আমরা নবীজির জীবন নিয়ে অনেক কথা বলেছি। এখন তাঁর প্রতিষ্ঠিত সমাজের দিকে তাকানোর সময়। কারণ সিরাতের প্রকৃত সৌন্দর্য শুধু জানার মধ্যে নয়, তার শিক্ষা দিয়ে নিজেদের সমাজকে নতুন করে দেখার মধ্যেও।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক



