সঠিক পথের দিশা দেওয়াও এক ধরনের সাদাকা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মানুষের জীবনে কিছু কাজ সাধারণ দৃষ্টিতে খুবই সাধারণ মনে হয়ে। যেমন, কাউকে তার গন্তব্যের রাস্তা দেখিয়ে দেওয়া, অপরিচিত কাউকে প্রয়োজনীয় তথ্য জানানো কিংবা বিপদে পড়া কাউকে সঠিক সিদ্ধান্তের দিকে একটু এগিয়ে দেওয়া। কাজগুলো করতে কয়েক মুহূর্তের বেশি সময় লাগে না। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের উপকারে করা এমন ছোট কাজগুলোও সাদাকায় পরিণত হতে পারে। মহানবী (সা.) মানুষের কল্যাণের পরিধিকে এতটাই বিস্তৃত করেছেন যে, একজন মানুষ প্রতিদিনের স্বাভাবিক জীবনযাপন করেও অসংখ্য সাদাকার সুযোগ লাভ করতে পারে। হাদিসে এসেছে-
عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ عَنْ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ كُلُّ سُلَامَى عَلَيْهِ صَدَقَةٌ كُلَّ يَوْمٍ يُعِيْنُ الرَّجُلَ فِيْ دَابَّتِهِ يُحَامِلُهُ عَلَيْهَا أَوْ يَرْفَعُ عَلَيْهَا مَتَاعَهُ صَدَقَةٌ وَالْكَلِمَةُ الطَّيِّبَةُ وَكُلُّ خَطْوَةٍ يَمْشِيْهَا إِلَى الصَّلَاةِ صَدَقَةٌ وَدَلُّ الطَّرِيْقِ صَدَقَةٌ
আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘শরীরের প্রতিটি জোড়ার ওপর প্রতিদিন একটি করে সাদাকা রয়েছে। কোনো ব্যক্তিকে তার সাওয়ারীতে উঠতে সাহায্য করা, অথবা তার মাল-সরঞ্জাম তুলে দেওয়া সাদাকা। উত্তম কথা বলা সাদাকা, সালাতের উদ্দেশ্যে গমনের প্রতিটি পদক্ষেপ সাদাকা এবং কাউকে রাস্তা বাতলিয়ে দেওয়াও সাদাকা।’ (বুখারি, হাদিস: ২৮৯১)
হাদিসটির শেষাংশটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কাউকে সঠিক রাস্তার দিশা দেওয়া কেন সাদাকা হবে? কারণ এর মধ্যে রয়েছে মানুষের প্রয়োজন উপলব্ধি করা এবং তাকে তার গন্তব্যে পৌঁছাতে সহযোগিতা করা। একজন পথিক হয়তো অপরিচিত শহরে এসে দিশেহারা। তাকে কয়েকটি কথা বলে সঠিক রাস্তা দেখিয়ে দেওয়া তার জন্য বড় উপকার। আপনার কাছে কাজটি সামান্য, কিন্তু তার কাছে তা মূল্যবান সহযোগিতা। ইসলামের সৌন্দর্য এখানেই যে, মানুষের জন্য সামান্য উপকারকেও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের আমল হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
তবে ‘পথ দেখানো’ কথাটির একটি ব্যাপকতর তাৎপর্যও রয়েছে। মানুষ শুধু ভৌগোলিক পথেই হারিয়ে যায় না, জীবনের পথেও কখনো কখনো দিশাহীন হয়ে পড়ে। একজন তরুণ ভুল সঙ্গের কারণে বিপথে যেতে পারে, একজন শিক্ষার্থী ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতে পারে, একজন বিপদগ্রস্ত মানুষ সঠিক করণীয় বুঝতে না পারে। এমন পরিস্থিতিতে তাকে কল্যাণকর পরামর্শ দেওয়া, ভালো-মন্দের পার্থক্য বুঝিয়ে দেওয়া এবং সঠিক সিদ্ধান্তের দিকে এগিয়ে যেতে সহযোগিতা করাও এই হাদিসের মানবিক শিক্ষার সঙ্গে গভীরভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
কোরআন মানুষকে সত্য ও কল্যাণের পথে আহ্বান করার নির্দেশ দিয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার কাজে একে অন্যকে সহযোগিতা করো।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত : ২) অর্থাৎ একজন মানুষ যখন অন্যকে কল্যাণের পথে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে, তখন সে কেবল সামাজিক দায়িত্ব পালন করে না, বরং আল্লাহর নির্দেশিত একটি নীতিও বাস্তবায়ন করে।
ইসলামে সাদাকার সৌন্দর্য হলো, এর জন্য সম্পদশালী হওয়া অপরিহার্য নয়। কারও হাতে অর্থ না থাকলেও তার কাছে সময় আছে, জ্ঞান আছে, অভিজ্ঞতা আছে, একটি সহানুভূতিশীল মন আছে। সে কাউকে পথ দেখাতে পারে, ভালো কথা বলতে পারে, কারও বোঝা বহন করতে পারে কিংবা বিপদে পাশে দাঁড়াতে পারে। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমার ভাইয়ের মুখে তোমার হাসিও তোমার জন্য সাদাকা।’ (তিরমিজি, হাদিস : ১৯৫৬)
তাই সাদাকার সুযোগ আমাদের চারপাশেই ছড়িয়ে আছে। প্রয়োজন শুধু অন্যের প্রয়োজনকে অনুভব করার মানসিকতা। একটি ছোট্ট পথনির্দেশ হয়তো কাউকে তার গন্তব্যে পৌঁছে দেবে, আর একটি সঠিক পরামর্শ হয়তো বদলে দিতে পারে কারও জীবনের গতিপথ। মানুষের পথ সহজ করে দেওয়া, তার গন্তব্যে পৌঁছাতে সহযোগিতা করা এবং সম্ভব হলে তাকে কল্যাণের পথে এগিয়ে দেওয়া, এসবই হতে পারে আমাদের প্রতিদিনের সাদাকা।
মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে আমল করার তাওফিক দান করুন।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক







