তীব্র গরমে স্বাস্থ্যসচেতনতা ও ইসলামের নির্দেশনা

প্রতীকী ছবি
বাংলাদেশ জুড়ে বাড়ছে তাপমাত্রা। প্রখর রোদ, গুমোট আবহাওয়া ও তীব্র দাবদাহে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে জনজীবন। হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে হিটস্ট্রোক, পানিশূন্যতা, ডায়রিয়া ও শ্বাসকষ্টের রোগী। শিশু, বয়স্ক, শ্রমজীবী মানুষ ও দীর্ঘ সময় বাইরে কাজ করা ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান আজ যে স্বাস্থ্যসচেতনতার কথা বলছে, ইসলাম প্রায় চৌদ্দশ বছর আগেই মানুষের জীবনযাপন, পরিচ্ছন্নতা, খাদ্যাভ্যাস ও শারীরিক নিরাপত্তা নিয়ে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছে।
ইসলামে মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্যকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতাআলা বলেছেন, ‘তোমরা নিজেদেরকে ধ্বংসের দিকে নিক্ষেপ করো না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৯৫)
এই আয়াত শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের প্রসঙ্গেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ক্ষতিকর কাজ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ বহন করে। অতিরিক্ত গরমে অসচেতনতা, পর্যাপ্ত পানি পান না করা, রোদে অপ্রয়োজনে চলাফেরা কিংবা শরীরের যত্ন না নেওয়াও এর অন্তর্ভুক্ত।
তীব্র গরমে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো পানিশূন্যতা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্যমতে, দীর্ঘসময় অতিরিক্ত তাপমাত্রায় অবস্থান করলে শরীরের পানি ও লবণের ভারসাম্য নষ্ট হয়, যা হিট ও হিটস্ট্রোকের মতো প্রাণঘাতী পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। ইসলামে পানির গুরুত্ব এতটাই বেশি যে এটিকে জীবনধারণের মৌলিক উপাদান হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। মহান আল্লাহতাআলা বলেন, ‘আমি পানি থেকে সব জীবন্ত বস্তু সৃষ্টি করেছি।’ (সুরা আম্বিয়া, আয়াত : ৩০)
গরমে পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি পান করা শুধু স্বাস্থ্যরক্ষাই নয়, ইসলামের দৃষ্টিতেও একটি গুরুত্বপূর্ণ আমানত রক্ষার অংশ। রাসুলুল্লাহ (সা.) পানি পান করার ক্ষেত্রেও সংযম ও শিষ্টাচার শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি ধীরে ধীরে তিন নিঃশ্বাসে পানি পান করতেন। (মুসলিম, হাদিস : ২০২৮)
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানও একবারে অতিরিক্ত পানি পান না করে ধীরে ধীরে পানি পান করার পরামর্শ দেয়।
ইসলাম পরিচ্ছন্নতাকে ইমানের অংশ হিসেবে ঘোষণা করেছে। গরমের সময় শরীরে ঘাম, ধুলাবালি ও জীবাণুর সংক্রমণ বেড়ে যায়। এ সময় নিয়মিত গোসল, পরিষ্কার কাপড় ব্যবহার ও হাত ধোয়ার গুরুত্ব অনেক বেশি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘পবিত্রতা ইমানের অর্ধেক।’ (মুসলিম, হাদিস : ২২৩)
অজু ও গোসল শুধু ইবাদতের প্রস্তুতি নয়; বরং এটি শরীরকে সতেজ রাখে এবং তাপজনিত অস্বস্তি কমাতেও সাহায্য করে। চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা বলছেন, গরমে শরীর ঠান্ডা রাখতে নিয়মিত পানি দিয়ে মুখমণ্ডল ও হাত ধোয়া কার্যকর ভূমিকা রাখে, যা ইসলামের অজুর ব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
খাদ্যাভ্যাসের ক্ষেত্রেও ইসলাম ভারসাম্যের শিক্ষা দেয়। অতিরিক্ত তৈলাক্ত, ঝাল ও ভারী খাবার গরমে শারীরিক অস্বস্তি বাড়িয়ে দিতে পারে। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমরা খাও ও পান করো, তবে অপচয় করো না।’ (সুরা আরাফ, আয়াত : ৩১)
এই আয়াত শুধু অপচয় নিষিদ্ধ করেনি; বরং খাদ্যে ভারসাম্য ও সংযমের নীতিও শিক্ষা দিয়েছে। আধুনিক পুষ্টিবিদরাও গরমে হালকা খাবার, ফলমূল, পানি ও প্রাকৃতিক তরল বেশি গ্রহণের পরামর্শ দেন।
তীব্র গরমে শ্রমজীবী মানুষের কষ্ট সবচেয়ে বেশি। নির্মাণশ্রমিক, রিকশাচালক, কৃষক, ট্রাফিক পুলিশ ও ডেলিভারিকর্মীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা রোদের মধ্যে কাজ করেন। ইসলাম এ ধরনের মানুষের প্রতি সহমর্মিতা প্রদর্শনের নির্দেশ দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের দুনিয়ার কষ্ট দূর করবে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার কষ্ট দূর করবেন।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৬৯৯)
আজকের সমাজে গরমে পথচারীদের জন্য বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা, শ্রমিকদের বিশ্রামের সুযোগ দেওয়া কিংবা গাছ লাগানোও বড় ধরনের সদকায়ে জারিয়া হতে পারে।
পরিবেশ রক্ষার বিষয়টিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। গবেষকরা বলছেন, নির্বিচারে বৃক্ষনিধন, অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণ ও নগরায়ণের কারণে তাপমাত্রা বাড়ছে। ইসলাম পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার শিক্ষা দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো মুসলিম যদি একটি গাছ রোপণ করে, এরপর মানুষ, পশু বা পাখি তা থেকে উপকৃত হয়, তবে তা তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হবে।’ (বুখারি, হাদিস : ২৩২০)
অর্থাৎ গরম ও জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় বৃক্ষরোপণও ইসলামের দৃষ্টিতে ইবাদতের অংশ হতে পারে।
তীব্র গরম আমাদের শুধু কষ্টই দেয় না, বরং মানুষকে অসহায়ত্বের অনুভূতিও স্মরণ করিয়ে দেয়। মানুষ যত উন্নত প্রযুক্তির মালিক হোক না কেন, প্রকৃতির সামনে সে এখনো দুর্বল। এই বাস্তবতা মানুষকে আল্লাহর দিকে ফিরে আসার আহ্বান জানায়। তাই দাবদাহের এই সময়ে স্বাস্থ্যসচেতনতার পাশাপাশি প্রয়োজন দোয়া, সংযম, পরিচ্ছন্নতা, পরিবেশরক্ষা ও মানবিক দায়িত্ববোধের চর্চা। ইসলাম শুধু আখিরাতের মুক্তির পথই দেখায় না, বরং সুস্থ, ভারসাম্যপূর্ণ ও মানবিক জীবন গঠনেরও পূর্ণাঙ্গ দিকনির্দেশনা দেয়।
লেখক : আলেম ও সাংবাদিক




