বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ
মাতৃদুগ্ধ: ইসলামের নির্দেশনা, বিজ্ঞানের স্বীকৃতি

প্রতীকী ছবি
আজ (১ আগস্ট) থেকে শুরু হয়েছে বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ। প্রতিবছরের মতো এবারও বিশ্বজুড়ে এই সপ্তাহ পালিত হচ্ছে মায়ের দুধের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান আজ জোর দিয়ে বলছে, নবজাতকের জন্য মাতৃদুগ্ধের কোনো বিকল্প নেই। আশ্চর্যের বিষয় হলো, আজ থেকে চৌদ্দশ বছর আগে ইসলামও একই শিক্ষা দিয়েছে। কোরআন শুধু মাতৃদুগ্ধের গুরুত্বই তুলে ধরেনি; বরং শিশুর এই অধিকার, মায়ের মর্যাদা এবং পরিবারের দায়িত্ব সম্পর্কেও সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছে।
ইসলামে সন্তান জন্ম দেওয়া যেমন একটি নিয়ামত, তেমনি তাকে সুস্থভাবে লালন-পালন করাও একটি ইবাদত। সেই লালন-পালনের প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো মাতৃদুগ্ধ পান করানো।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘মায়েরা তাদের সন্তানদের পূর্ণ দুই বছর দুধ পান করাবে, যদি তারা স্তন্যদানকাল পূর্ণ করতে চায়।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২৩৩)
এই আয়াতে ধর্মীয় নির্দেশনার পাশাপাশি শিশুর স্বাস্থ্য ও বিকাশের জন্য একটি প্রাকৃতিক ও বৈজ্ঞানিক নীতিও বর্ণিত হয়েছে। বর্তমান পৃথিবীতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ইউনিসেফও সুপারিশ করে, জন্মের প্রথম ছয় মাস শিশুকে শুধু মায়ের দুধ খাওয়াতে হবে এবং দুই বছর বা তারও বেশি সময় পর্যন্ত অন্যান্য খাবারের পাশাপাশি মাতৃদুগ্ধ চালিয়ে যেতে হবে। অর্থাৎ কোরআনের নির্দেশনা ও আধুনিক বিজ্ঞানের পরামর্শ একই লক্ষ্যেই একমত হয়েছে।
মাতৃদুগ্ধ শিশুর প্রথম ও সর্বোত্তম খাদ্য। জন্মের পর প্রথম যে ঘন হলুদাভ দুধ (কলোস্ট্রাম) বের হয়, চিকিৎসাবিজ্ঞানে সেটিকে শিশুর প্রথম টিকা বলা হয়। এতে এমন সব অ্যান্টিবডি ও রোগপ্রতিরোধী উপাদান রয়েছে, যা নবজাতককে নানা সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে। ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, অপুষ্টি, অ্যালার্জি এমনকি ভবিষ্যতে ডায়াবেটিস ও স্থূলতার ঝুঁকিও কমাতে মাতৃদুগ্ধ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ইসলাম মানুষের কল্যাণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। তাই শিশুর শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি তার মানসিক ও আবেগিক বিকাশেও মাতৃদুগ্ধের গুরুত্ব স্বীকার করেছে। মায়ের বুকের উষ্ণতা, স্পর্শ ও ভালোবাসা শিশুর নিরাপত্তাবোধ গড়ে তোলে, যা তার ভবিষ্যৎ ব্যক্তিত্ব বিকাশে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
মাতৃদুগ্ধের উপকারিতা শুধু শিশুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত স্তন্যদান মায়ের প্রসব-পরবর্তী রক্তক্ষরণ কমাতে সাহায্য করে, জরায়ুকে দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনে এবং স্তন ও ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারের ঝুঁকি হ্রাস করে। এ ছাড়া টাইপ-২ ডায়াবেটিস ও হৃদ্রোগের ঝুঁকিও কমে। অর্থাৎ আল্লাহর বিধানে মা ও সন্তান উভয়ের কল্যাণই নিহিত রয়েছে।
ইসলাম শুধু মাকে নির্দেশ দিয়েই থেমে থাকেনি; বাবার ওপরও দায়িত্ব অর্পণ করেছে। একই আয়াতে মহান আল্লাহ তাআলঅ বলেছেন, ‘সন্তানের পিতার ওপর নিয়ম অনুযায়ী মায়ের খাদ্য ও পোশাকের দায়িত্ব রয়েছে।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২৩৩)
এ থেকে বোঝা যায়, সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ানোর উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করা শুধু মায়ের একার দায়িত্ব নয়; বরং বাবা, পরিবার এবং সমাজেরও দায়িত্ব। একজন মা যেন মানসিক চাপমুক্ত থেকে সন্তানের যত্ন নিতে পারেন, সে পরিবেশ সৃষ্টি করার ব্যাপারেও ইসলাম গুরুত্বারোপ করেছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) শিশুদের প্রতি ছিলেন অত্যন্ত স্নেহশীল। তিনি সন্তানদের আদর করতেন, কোলে নিতেন এবং তাদের প্রতি কোমল আচরণের শিক্ষা দিতেন। এক হাদিসে তিনি বলেছেন, ‘যে দয়া করে না, তার প্রতি দয়া করা হয় না।’ (বুখারি, হাদিস: ৫৯৯৭) শিশুর প্রতি এই দয়া ও মমতার অন্যতম প্রকাশ হলো তার স্বাভাবিক ও নিরাপদ খাদ্যের অধিকার নিশ্চিত করা।
দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা, কর্মক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সহায়তার অভাব, সামাজিক ভুল ধারণা এবং কৃত্রিম দুধের আগ্রাসী প্রচারণার কারণে অনেক মা পূর্ণ সময় মাতৃদুগ্ধ পান করাতে পারেন না। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, পর্যাপ্ত স্তন্যদানের মাধ্যমে প্রতিবছর বিশ্বে লাখ লাখ শিশুর প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব।
এখানে শুধু মায়েদের সচেতন করলেই হবে না। কর্মক্ষেত্রে মাতৃদুগ্ধবান্ধব পরিবেশ, পর্যাপ্ত মাতৃত্বকালীন ছুটি, স্তন্যদান কক্ষ এবং পরিবারের সহযোগিতাও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ ইসলাম এমন একটি সমাজ চায়, যেখানে মা তার সন্তানকে যথাযথভাবে লালন-পালনের সুযোগ পান।
বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ আমাদের সেই দায়িত্বের কথাই নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়। ইসলামের শিক্ষা ও আধুনিক বিজ্ঞানের অভিন্ন বার্তা হলো, মাতৃদুগ্ধ শিশুর জন্মগত অধিকার এবং এটি সুস্থ জাতি গঠনের অন্যতম ভিত্তি। তাই সন্তানকে মাতৃদুগ্ধ পান করানোকে শুধু একটি স্বাস্থ্যবিধি হিসেবে নয়, বরং আল্লাহপ্রদত্ত একটি আমানত ও দায়িত্ব হিসেবে দেখা উচিত।
একটি সুস্থ, মেধাবী ও মানবিক প্রজন্ম গড়ে তুলতে মাতৃদুগ্ধের বিকল্প নেই। ইসলাম বহু আগেই যে পথনির্দেশনা দিয়েছে, আধুনিক বিজ্ঞান আজ তার সত্যতাকেই নতুন ভাষায় পুনরায় তুলে ধরছে। তাই বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহের অঙ্গীকার হোক, প্রতিটি শিশুর মাতৃদুগ্ধ পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসবে।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক




